দর্পণ || শ্রদ্ধাঞ্জলি || অমিতাভ মীর




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

অমিতাভ মীর

প্রকৃত নাম: মীর মোমিন-উল হক। পিতা: মীর আবুল হোসেন, মাতা: সালেহা খাতুন। জন্ম ১৪ আগস্ট'৬২ খ্রি. প্রাণের শহর ঢাকার মতিঝিলে। বর্তমানে পৈতৃক নিবাস চুয়াডাঙ্গা শহরে বসবাসরত প্রেম ও দ্রোহপ্রিয় মানুষ এবং বর্ণবাদ ও শ্রেণী বৈষম্য বিরোধী কবি ও লেখক ’অমিতাভ মীর’।

২০১৫ সালে ‘চুয়াডাঙ্গা জেলা লেখক সংঘ’ এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুধী সমাবেশে কবিকে ‘দ্রোহের কবি’ আখ্যা দিয়ে সম্বর্ধিত করেছে।

এছাড়াও কবি ভারতে তার কলম বিস্তারে সমপরিমাণ সক্ষম ছিলেন। আন্তর্জাতিক স্তরে সামগ্রিক কলম বিচরণ ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গীয় সাহিত্য দর্পণের পরিচালক তথা উপদেষ্টা বাংলাদেশ শাখা,  হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

এছাড়াও দেশে বিদেশে তিনি নানা পুরস্কার, সম্মাননায় ভূষিত । সাহিত্যে তাঁর বিস্তার ও কর্মকান্ড স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। 

জন্মসূত্রে বাংলাদেশী হলেও নিজেকে বিশ্বসংস্কৃতির মানুষ ও বিশ্বনাগরিক ভাবতে পছন্দ করেন। ধর্ম, বর্ণ, ভাষাগত সকল বিভেদের উর্ধ্বে গিয়ে এই প্রগতিশীল কবি নিজেকে একজন মানুষ ভাবতেই ভালোবাসেন। কবির বিশ্বাসে মনুষ্যত্বই মানুষের একমাত্র পরিচয়।

দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে ২২-১১-২০২১ তারিখ,  রাত ৩টা ৩০মিনিটে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান।

কবির এই অকাল প্রয়াণে আমরা শোকস্তব্ধ । বঙ্গীয় সাহিত্য দর্পণের পক্ষ থেকে  তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।


।। কবিতা গুচ্ছ ।।

বোধের মুক্তি 


মৃত্যুভয়ে ভীত ব্যাক্তিটি হঠাৎ প্রচণ্ড সাহসী হয়ে ওঠে-

এগিয়ে যায় মৃত্যুর মুখোমুখি হতে,

সে তো জানেই মৃত্যু অবধারিত, শাশ্বত;

মর্ত্যে আগমন ঘটলেই পাড়ি দিতে হবে অনন্তের পথে-

তাহলে কিসের ভয়? কেনই বা ভয়?


এমন দৃষ্টান্ত কোথায়- পালাতে পেরেছে কেউ মৃত্যুর হাত থেকে? 

মহামানব, প্রতাপশালী, রথী-মহারথী, অতি অভাজন,

আয়ু শেষে হলেই দিয়েছে ধরাধাম পাড়ি, দিচ্ছে, দেবে।

প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম, কোথাও নেই ছাড়;

অতঃপর করি মর্ত্যলোক ছাড়ার নিঃশঙ্ক আয়োজন।


শূন্য খেয়া পারের কাণ্ডারী নেই 

মনের দর্পণে এক এক করে ভেসে ওঠে -

হাতে পাপ, মনে পাপ, অন্তর-বাইরে পাপ,

আচারে পাপ, বিচারে পাপ, বচনে পাপ, চলনে পাপ,

কর্মে পাপ, ধর্মে পাপ, পাপ সীমাহীন;

শূন্য পুণ্যের ঝাঁপি খেয়াপার দুস্তর পারাবার। 


অনুতাপের দহনে ঘটলো বোধের মুক্তি;

ক্ষমা প্রাপ্তি ছাড়া মুক্তি নেই, মুক্তি নেই। 

ক্ষমা করো, ক্ষমা করো রাহমানির রাহিম,

তোমার চরণে হলাম প্রণত হে, মহামহিম। 

★★★★★★★

ফিরে এসো চেতনায় 


আমরা চলেছি সবে দূর অজানায় 

জানি না তো এই পথের শেষ কোথায়!

কত আলোড়ন শত ধারা বাহাদুরি,

অতিন্দ্রীয় ডাক এলে শেষ জারিজুরি। 


অসংযত লোভের জিভ লম্বা ভীষণ, 

অন্যের জমি লুটেছো মানোনি বারণ,

খাস জমি, খাল-বিল-নদী, অর্থ-কড়ি;

যখন যা পেয়েছো খেয়েছো পেট ভরি।


দখল - দুষণে কর পরিবেশ নষ্ট,

অরণ্য সাবাড়ে ধরণীর যত কষ্ট।

দুষণের ফলে করোনার আগমন,

উদর পূর্তির ফল নিশ্চিত মরণ।


দেখে-শুনে এখনো হয়নি ওরে হুঁস,

বিবেকের দ্বার খোল, ওরে ও বেহুঁশ! 

লোভের লাগাম টানো এসো সোজা পথে,

মন্দে কর্মফল বৃথা নাহি কোন মতে।


কর্মের বিচারে ফল, সাধু জনে বলে,

'ভালো কর্মে ভালো ফল', মন্দে মন্দ ফলে।

অপকর্ম ছেড়ে ফিরে এসো চেতনায়,

শান্ত হলে ধরা, ফুল ফোটে বাগিচায়।

★★★★★★★

জলহীন জলাধার 


ভাটির নদীতে জল নেই উজানেতে যত লুটপাট,

একফোঁটা জল চাইলেও মেলে না ঘটে খরা মৌসুমে।

একতরফা টানে হিস্যার যত জল বেঁধে আটঘাট,

কিউসেক জল চুক্তির পাতায় থাকে রাষ্ট্রসভা ঘুমে।


চুক্তির ধারায় পক্ষপাত উজানের স্বার্থে গড়া,

ভাটি কেন দেবে ছাড় আন্তর্জাতিক জলধারায়?

জলচুক্তিতে খরায় জল মেলে না তো একঘড়া,

বাঁধ খোলা জল তেড়ে আসে ডোবাতে দেশ বর্ষায়।


পানিচুক্তিতে ভাটির পক্ষে বিশেষজ্ঞজন কারা?

উজানের পক্ষে যত ছাড় দেয়াতে ব্যতিব্যস্ত কেন তারা?

নাকের ডগায় মুলো ঝোলানো দেখতে পাচ্ছি বেশ,

কশেরুকা এতটা নোয়ালে ধ্বংস হয়ে যাবে দেশ!


স্বার্থ বুঝে সব সামলে নিলে, দিলে একতরফা ছাড়,

দেশপ্রেম আর হৃদয়ে থাকে না স্বার্থের অগ্রাধিকার। 

দেশের বেহাল দশা আজ এই বাজিকরের খেলায়,

লাগাম টানো হে, স্বার্থপর; দাও দেশের দিকে খেয়াল।


অযথা উন্নয়নের ডামাডোল এবার থামাও দয়া করে,

বাঁধের বিরুদ্ধে গড়ে তোল বাঁধ দেশের সব নদীতে,

আমরাও উজানের জল টানবো, ছাড়বো মহানন্দে;

দেশপ্রেমের হেম প্রভায় কৌটিল্যের চূর্ণ হবে দর্প।

★★★★★★★

সকলি জানো তুমি হে অন্তর্যামী


মম অন্তরে বাহিরে যাহা কিছু আছে,

সকলি জানো তুমি হে, অন্তর্যামী!

আমার মনের কালিমা দূর কর হে-

ওগো শেষ বিচার দিনের স্বামী। 


পাপ-পুন্যের দোলায় দুলে-

পূণ্যকে দিয়েছি ঠেলে মনের খেয়ালে!

করুণা চেয়ে হলাম অবনত,

তোমার চরণে লুটাই দিবস যামী। 


এত দিন যারে রাখলাম আপনার করে,

সহসা কাঁদিয়ে সে যায় দিগন্তে সরে!

মায়া ভুলে ফিরিয়া চলি তোমারি পানে-

মুখ ফিরিয়ে নিওনা হে, জগৎ-স্বামী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ