পোস্ট বার দেখা হয়েছে
প্ল্যানচেট
সুজিত চক্রবর্তী
তখন স্কুলে পড়তাম। এখদিন সান্টুদা বলল , সে নাকি প্ল্যানচেট করার কৌশল শিখে ফেলেছে । শুধু হাতে কলমে পরীক্ষা বাকী । এক শনিবার সন্ধ্যা বেলা পাঁচ জন বসে গেলাম প্ল্যানচেট করার জন্য। একজন মৃত মানুষের আত্মার সাথে যোগাযোগ করা প্ল্যানচেটের উদ্দেশ্য। সান্টুদা বলেছে সাম্প্রতিক কালে মৃত্যু হয়েছে এমন আত্মা হলে কাজটা সহজ হয়।
বড়দির বন্ধু শুভ্রাদি কিছুদিন আগে মারা গেছিল। তাকেই , মানে তার আত্মাকে ডাকা
হবে এইরকম ভেবে ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে আমরা শুভ্রাদির মুখটা স্মরণ করে ধ্যানে বসলাম।
বৃষ্টি নামল অঝোরে। ভয়ের সাথে উত্তেজনা মিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি করল । বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কেটে গেল। মনে মনে ভাবছি, এসব বুজরুকি । ভূত বলে আসলে কিছু নেই। কথা বলা নিষেধ। তাই মুখ বুজে বসে আছি
সবাই ।
এমন সময়ে হঠাৎ কোথা থেকে ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করল । জানলা দরজা সব বন্ধ। ভেবে পেলাম না হাওয়া কোথা থেকে আসবে ! ভোলা সম্ভবত আর থাকতে না পেরে চাপা স্বরে বলে উঠল, " এস্ " ! বুঝলাম ভোলা শুভ্রাদির নামের প্রথম অক্ষর উচ্চারণ করছে !
সান্টুদা আগেই বলে রেখেছিল যে আত্মা উপস্থিত হলে আমাদের প্রশ্নের উত্তর হয় সে উচ্চারণ করে জানাবে অথবা লিখে দেবে। সেইমতো কাগজ কলম আগে থেকেই রাখা ছিল।
প্রশ্ন ছিল ," শুভ্রাদি , তোমার মৃত্যুর কারণ কি ? " একটা কথা এখানে বলা দরকার যে মারা যাবার আট মাস আগে শুভ্রাদির বিয়ে হয়েছিল । এবং , অনেকেই সন্দেহ করছিল যে কিছু একটা গন্ডগোল আছে এই অল্প বয়সী মেয়েটির অকাল মৃত্যুকে ঘিরে।
পিন পতনের শব্দ স্পষ্ট শোনা যায় ঘর
তখন এতটাই নিস্তব্ধ ! কিন্তু , না উচ্চারণে ,
না লিখে কোনও ভাবেই জবাব আসছে না ।
শুধু দেওয়াল ঘড়ির কাঁটার শব্দ আসছে টিক-টিক , ঠিক-ঠিক ! অনুভব করলাম আমার হৃৎপিন্ড তার সাথে তাল মিলিয়ে ধুক ধুক করে চলেছে। সময় এগিয়ে চলে, কিন্তু কোথায় আত্মা ! মনে হচ্ছে বাস্তবে কি এসব হয় না সবটাই বুজরুকি? কখনও মনে হয়, আমাদের পদ্ধতিতে কিছু ভুল হচ্ছে না তো ! কারণ , কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্ল্যানচেটে বিশ্বাস করতেন। তবে কি আমদের অবিশ্বাসই সাফল্যে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ! কারণ , আমরা সেই ছোটবেলাতেই শুনেছি যে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু , তর্কে বহু দূর !
কতক্ষণ এভাবে কেটে গেছে জানি না । আবার সেই ঠান্ডা হাওয়া। এবার আরও দাপটের সঙ্গে বয়ে যাচ্ছে যেন। আওয়াজে বোঝা যাচ্ছে বাইরে বৃষ্টি ক্রমশ জোর ধরছে। হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানিতে দেখলাম যে বড়দির বার্বি ডল পুতুলটা ওই ঘরে ছিল সেটা ভয়ংকর মূর্তি ধারণ করেছে আর তার মুখে রক্ত মাখামাখি হয়ে গেছে!
তখন যে কি অসহায় অবস্থা আমাদের সে কথা বুঝিয়ে বলা কঠিন কাজ ।
"ও বাবা গো ....." বলে চিৎকার করে দরজা খুলে ছুটে বেড়িয়ে এসেছিলাম ওই ঘর থেকে ! এর পরের ঘটনা আর জিজ্ঞেস করবেন না। আমরাও এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে পরবর্তী কালে কখনও আলোচনা করেছি বলে মনে পড়ে না।যদিও একলা রাতে যখন ঘুম আসতে চায় না কোনও অজ্ঞাত কারণে, তখন এই ঘটনা মনে পড়েছে অনেক দিন অবধি তাতে সন্দেহ নেই।
আর হ্যাঁ ! সেই পুতুলটাকে এরপর আর কোনওদিন চোখে দেখি নি। শুনেছিলাম বাবা পরদিন ভোর হওয়ার আগেই বিদায় করেছিলেন সেটা ।
0 মন্তব্যসমূহ