পোস্ট বার দেখা হয়েছে
পান্ডবপ্রিয়া কৃষ্ণা
জয়া
এই পান্ডবপ্রিয়া কৃষ্ণা কে? পাঁচ ভাই অর্থাৎ পঞ্চপাণ্ডদের যিনি বিবাহিত স্ত্রী দ্রৌপদী! যজ্ঞের অগ্নি থেকে যার জন্ম সেই অগ্নিকন্যা! স্বয়ম্বর সভায় দ্রৌপদী বিজয়ী অর্জুনের গলায় মালা পড়ালেন, তবে কেমন করে তিনি হলেন পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী? অর্জুন সহ চার ভাই দ্রৌপদীকে সাথে নিয়ে কুন্তীর দ্বারে এলেন। বললেন, 'দেখো মাতা তোমার জন্য কি ভিক্ষা এনেছি'। তিনি কিছুই না দেখেই বললেন, "যা এনেছো সবাই মিলে ভোগ কর"। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এই মাতৃআজ্ঞা পালনের জন্য অস্থির হয়ে উঠলেন। এক ভীষণ রকম অসহায় অবস্থায় পড়লেন দ্রৌপদী। কী ভাবে তিনি নিজেকে পাঁচজনের মধ্যে ভাগ করে নেবেন! কিছুই তার বোধগম্য হচ্ছিলো না। অপেক্ষা করেছিলেন যদি রাজমাতা কুন্তী কিছু বলেন, যুধিষ্ঠির কিছু বলেন বা প্রাণ সখা কৃষ্ণ কিছু সমস্যা সমাধান করেন। নাহ্ সেদিন দৌপদীকে অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে মুক্ত করতে কেউ এগিয়ে আসেন নি।
এমন সময় ঋষি নারদ মুনির আগমন। ঋষি হয়েও তিনিই ইতি কর্তব্য স্থির করে দিয়ে গেলেন। ঠিক হলো প্রত্যেক পাণ্ডবের সাথে দৌপদীকে এক বছর করে থাকতে হবে। একজনের সঙ্গে থাকার সময় কেউ যদি এসে পড়েন,তাহলে তাকে বারো বছরের জন্য নির্বাসনে যেতে হবে। কথাগুলো শোনামাত্রই দৌপদীর বুক এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। আনমনা হয়ে ওঠেন তিনি।
নিয়ম অনুযায়ী প্রথম পালা রাজা যুধিষ্ঠির। সবসময় নানান রাজকার্যে ব্যস্ত হয়েও অস্ত্রাগারে সময় কাটাতে ভালোবাসেন আলোক সামান্য রূপবতী স্ত্রী দ্রৌপদীর সাথে। নানান অছিলায় যুধিষ্ঠির ঘনিষ্ঠ হতে চাইলে দ্রৌপদীর বুক ধরফর করে ওঠে, যদি পার্থ হঠাৎ এখানে চলে আসেন কোনও অস্ত্রের খোঁজে! হলোও তাই, রাজ্যে গন্ডগোল লাগায় অর্জুন অস্ত্রাগারে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। পেয়েও গেলেন। পার্থ তৎক্ষণাৎ কোন দিকে না তাকিয়ে নিজের গান্ডীব তুলে প্রস্থান করলেন। আরক্ত মুখে পাঞ্চালি অন্তঃপুরে নিজের কক্ষে বসে রইলেন স্তব্ধ হয়ে। ঘন্টা দুয়েক পর শুনতে পেলেন, পার্থ বলছেন, শর্তানুযায়ী মহারাজ আমায় বিদায় দিন। এখন আসি, ১২ বছর পর আবার দেখা হবে। ভীম নকুল সহদেব আরো সবাই মিলে আপনাকে ও মাতা কে রক্ষা করবেন। দ্রৌপদী অবসন্ন মনে ভুতলে পড়ে রইলেন। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বললেন ওঠো প্রিয়া,অর্জুনের দীর্ঘ বারো বছরের যাত্রা যাতে শুভ হয় তারজন্য আমাদের বিদায় সম্ভাষণ জানাতে হবে!
মহাকাব্যের নায়িকা হলেও, দ্রৌপদী তো আমাদের মতোই রক্ত মাংসের মানুষ। তিনি কি পেরেছিলেন তাঁর ক্ষোভ,হতাশা, কষ্ট জয় করে বাকি দিনগুলো স্বাভাবিকভাবে যুধিষ্ঠিরের সাথে কাটিয়ে দিতে? ঠিক কী ভেবে এই কাজ টা করলেন ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির? সু্কৌশলে পাঞ্চালী কে পার্থের থেকে আলাদা করার যেন এক নিপুণ প্রয়াস! দীর্ঘ বারো বছর পর পার্থ কি সেই আগের পাঞ্চালী কে ফিরে পেয়েছিলেন?
যাকে জয় করেছিলেন ভালোবেসে ছিলেন সেই মেয়ে যে আর কোথাও নেই! মহামতি ব্যাসদেব তাঁর সুক্ষ ইশারা গুলো খুব সুন্দর ভাবেই মহাভারত কাব্যে ভবিষ্যতের পাঠকদের জন্য ফেলে রেখে গেছেন। বারো বছর পর পাঞ্চলী তখন পরিনত এক গৃহবধূ। চার সন্তানের মা। প্রণয় কাম ছলা কলায় রপ্ত এক পূর্ণ যুবতী। আর পার্থ তখন নানান দেশ ঘুরে প্রনয়কলায় অভিজ্ঞ পরিণত যুবক, এক অচেনা মানুষও! তিন বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ও দুই সন্তানের পিতা তিনি।
বারো বছর পর যবনিকা উঠেছে।মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে অনেক টা সময়, অনেক ঘটনা। অবশেষে বহু প্রতীক্ষার পর ফিরে আসে সেই ক্ষন। অর্জুনের ফিরে আসার দিন।পার্থ একা নয় সাথে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী সুভদ্রা ও সদা মৃদু হাস্যময় সখা কৃষ্ণের সাথে। আমরা পাঠকগণ যদি সময়কে রুদ্ধ করে পিছনে হাঁটি,দ্রৌপদীর কথা ভাবি, কতোটা তার মনের গভীরে তারও অতলে পৌঁছাতে পারবো! সেই বারো বছর আগে ফেলে আসা কিশোরীর মন যে আর কোথাও নেই! তার অবাল্যলালিত স্বপ্ন তো কবেই ভেঙে চুরমার হয়েছে! কিন্তু অভিমান যাবে কোথায়?
সুভদ্রা মাতা কুন্তী কে প্রনাম করে ধীর পায়ে অবনত মুখে দ্রৌপদীর কক্ষে প্রবেশ করে বললেন আমি আপনার একান্ত অনুগত দাসী। দ্রৌপদী মুখ তুলে চেয়ে দেখলেন, মিষ্টি ও নম্র স্বাভাবের একটি মেয়ে নত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রৌপদী এতো সহজে হেরে যাবার মানুষ নন। তিনি হৃদয়গ্রাহী। বুকে টেনে নিয়ে বললেন তুমি দাসী নও, তুমি যে আমার বোন।
তারপর এলো সেই আকাঙ্খিত রাত। পাঞ্চলীর অন্ধকার ঘরে একটি মাত্র দীপ জ্বলছে। অর্জুন অবাক বিস্ময়ে দেখলেন এক আলো আঁধারি রহস্যময় পরিবেশে দ্রৌপদীকে যেন সেই স্বয়ংবরের মেয়েটিই মনে হচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ পাঞ্চালী অবনত মুখে বসে রইলেন। আর অর্জুন অপলক দৃষ্টি মেলে চেয়ে রইলেন কৃষ্ণার দিকে। স্তব্ধতা ভঙ্গ করে অর্জুন বলে উঠলেন কথা বলবে না কৃষ্ণা? দ্রৌপদীর ঠোঁট দুটি প্রদীপের শিখার ন্যায় কেঁপে উঠল। অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠে বলে উঠলেন, যাও পার্থ তুমি সুভ্রদার কাছেই যাও। নতুন স্ত্রী তোমার জন্য অপেক্ষা করছে! চারিদিকে আলো-আঁধারিতে, প্রদীপের আলোয় দ্রৌপদীর মুখ আরো উজ্জ্বল ও মায়াময়। কোন প্রসাধন করেন নি তিনি। এলোচুলে নিশ্চুপ হয়ে বসে রয়েছেন। এমন মানবী কে কেমন করে পার্থ স্পর্শ করবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। খুব সন্তপর্ণে এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখলে। দ্রৌপদী আবারও বললেন "পার্থ নতুন বাঁধন দিলে পুরোনো বন্ধন শিথিল হয়ে যায়।" তুমি সুভদ্রার কাছেই যাও। পার্থ যেন আরও বিহ্বল হয়ে গেলেন। এমন অভিমানীর মান তিনি কেমন করে ভাঙ্গবেন! ধীরে ধরা গলায় বললেন, কৃষ্ণা লক্ষ্যভেদের পর, আজ আমাদের প্রথম রজনী।
সেই রাতে কে কার বুকে মাথা রেখে কতক্ষণ কেঁদে ছিলেন! কেমন করে অভিমানীর মান ভঙ্গ হয়েছিল তার হিসাব মহাকালও রাখেন নি! সমাজ এখনও কি দ্রৌপদীকে নিয়ে কটুক্তি করে না?পাঁচ স্বামীর ঘর করেন বলে! না কি এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জন্য অনায়াসে পাঞ্চালী কে দায়ী করা হয় না? অর্জুন স্বাধীন ভাবে বারো বছর ভ্রমণ করলেন। স্বেচ্ছায় স্ত্রী সহবাস করলেন। কিন্তু পাঞ্চালীর তার তো হাত পা বাঁধা। অনেকেই বলবে তিনি তো পাঁচ পাঁচটি স্বামী পেয়েছেন, তিনি তো স্বাধীন। সকলের জানা উচিত এটা তাঁর ইচ্ছায় হয় নি। এটা কখনই তাঁর স্বাধীনতার চিহ্ন নয়। উপায়হীন পরাধীনতার কলঙ্কের চিহ্ন মাত্র। রাজা যুধিষ্ঠির, ভীম, নকুল, সহদেব সকলেই আবার বিবাহ করেছিলেন। প্রত্যেকের একটি করে সন্তানও ছিল।
প্রশ্ন একটা থেকেই যায় সময়ের ও সমাজের কাছে! দ্রৌপদী পাঁচ পাঁচটি স্বামী পেয়েও সত্যিই কি পান্ডবপ্রিয়া হতে পেরেছিলেন?
কিংবা প্রাণ সখা কৃষ্ণের কৃষ্ণা !!
0 মন্তব্যসমূহ