পোস্ট বার দেখা হয়েছে
ভূতের থাপ্পর
শংকর ব্রহ্ম
বন্ধুবর দেবাশিস ভট্টাচার্যের আহ্বানে, 'দর্পণ'-এর ' ভূতচতুর্দশী সংখ্যা'-র জন্য একটা ভূতের গল্পটা লেখার জন্য বসেছি এসে নিরালায়
ছাদের চিলেকোঠার ঘরে।
ভূতের গল্প লিখতে বসে স্বচক্ষে ভূত দেখব, তা কখনও স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।
চিলেকোঠায় দরজা জানলা বন্ধ করে লিখতে বসেছি।
পরিবেশটাকে ভৌতিক করে তোলার জন্য, লেখার আগে মনে মনে ভূতের কল্পনা করছি, ভূতের আকৃতি ভাবছি। প্রকৃতি ভাবছি।
হাব-ভাব ভাবছি। অঙ্গ-ভঙ্গীর কথা ভাবছি। আর তার উপস্থিতি এই ঘরের মধ্যে ভাবছি। গল্পটা লেখার আগে, গায়ে কাঁটা-দেওয়া একটা শিরশিরানি ভাব আনতে চাইছি।
এমন সময় মনে হল কে যেন জানলায় টোকা মারছে। ভাবলাম ভুল শুনেছি। একটু পরে আবার মনে হলো, সত্যিই এবার কেউ জানলায় টোকা মারছে। জমিয়ে লিখতে বসেছি। তাই আর উঠতে ইচ্ছে করছে না। আবার টোকা পড়ল। এবার অনিচ্ছায় উঠতে যাব ভাবছি।
এমন সময় আচমকাই লাইটটা নিভে গেল হঠাৎ। দরজাটা খুলে গেল একা একাই।
দরজা দিয়ে কে একজন ঢুকে এলো ঘরের ভিতর। কে এলো, কিছুই দেখতে পারছি না ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে।
সে নাকি সুরে খ্যানখ্যানে গলায় বলল, ব্যাঁটা লেঁখক, আঁমাদের নিঁয়ে গঁল্প লিঁখবি? কিঁ জাঁনিস তুঁই আঁমাদের সঁম্পর্কে ?
আমি আমতা আমতা করছি ভয়ে , মানে...
- মাঁনে কিঁ, বঁলবি,আঁমরা হিংঁস্র, মাঁনুষের ঘাঁড় মঁটকে রঁক্ত খাঁই, নাঁকি সুঁরে কঁথা বঁলি - এঁইসব তোঁ?
আমি কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বললাম, তাই তো জানি। লোকে তাই বলে।
সজোরে এক থাপ্পর পড়ল আমার গালে।
- আঁমাদের নিঁয়ে মিঁথ্যের বেঁসাতি। আঁমরা মাঁনুষের ঘাঁড় মঁটকে রঁক্ত খাঁই? নাঁকি,তোঁরা নিঁজেরাই নিঁজেদের ঘাঁড় মঁটকে রঁক্ত খেঁয়ে আঁমাদের নাঁমে চাঁলাস?
- তবে, লোকে যে বলে?
- লোঁকে আঁমাদের নাঁমে দোঁষ চাঁপিয়ে নিঁজেদের অঁপরাধ আঁড়াল কঁরে রাঁখে।
- তা কি করে হবে?
- হ্যাঁ তাঁই হঁয়। আঁর এঁকটা মিঁথ্যে বঁললে আঁমাদের নাঁমে, মাঁরব আঁর এঁক থাঁপ্পর। ঘাঁড় মঁটকে দেঁবো তোঁর।
এক থাপ্পরেই গালটা জ্বলছে, আর একটা
থাপ্পর খাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই বলেই আমি চুপ করে গেলাম। তারপর ঘাড় মটকে দিলে তো আর কথা নেই।
হঠাৎ আলোটা জ্বলে উঠল, দেখলাম ঘরে কেউ কোথাও নেই, শুধু দরজাটা হাট করে খোলা।
এরপর আর ভূতের গল্প লেখার আর সাহস হয়নি আমার।
ভয়ে ভয়ে নীচে নেমে এসে দেখি, গিন্নি ছোট ছেলেকে ভূতের গল্প বলে ঘুম পারাবার চেষ্টা করছে।
আমি বললাম, চুপ কর, চুপ কর ,ছাতে ভূত আছে।
ছাতে ধুপ ধুপ করে, কারও চলাফেরার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। গিন্নি তা শুনে ভূতের গল্পটাকে - গভীর গহন নির্জন অরণ্যে শিয়াল আর কুমিরের গল্পে বদল করে ফেললো, কায়দা করে।
ছেলে ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তারপর গিন্নি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার গালে ওটা কিসের দাগ গো?
আমি তখন তাকে সব কথা খুলে বললাম।
ছাদে ততক্ষণে ভূতের দাপাদাপি কিছুটা কমেছে বলে মনে হলো আমার।
সে কারণে, এবার আর আমার 'দর্পণ'-এর জন্য ভূতের গল্পটা লেখা হলো না । সকলে এ'জন্য মার্জনা করবেন আমাকে ।
0 মন্তব্যসমূহ