দর্পণ | সাপ্তাহিক সেরা নির্বাচিত পরিচালক কলম | কবিতা ও গল্প




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 

কবিতা 


সংগ্রামের ভোরে // দে বা শী ষ


লড়াই যেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয় - সবুজের কথা বলে মাটি ;

কিষান তোমার হাতিয়ার গর্জায়, ফুঁটো হয়েছে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি ।


আন্দোলনের বিকল্প কোথাও নেই - কেড়ে নিতে চায় লোভের পাত্রে দালাল।

জোর করে কিছু চাপানো সহজ নয়, বুনেছো যতোই বিকাশের জঞ্জাল।


একজোট হয়ে দিনরাত পাত করে, স্বাধীনতার চেয়ে এই জয় কম নয়।

মৃত্যু শোকেও শহীদ সম্মানে - একতা তোমার এটাই আসল জয়।


শাসন যতোই চাপিয়ে দেবে বোঝা , অবিচার যতো মাথা চারা দেবে ঝুঁকে,

মিছিল জানে অনঢ় একরোখা - প্রতিটি কৃষক থাকবে বেঁচে বুকে ।



টুইঙ্কল টুইঙ্কল লিটল স্টার 

জয়তী


ওরা সারারাত নদীর সাথে খেলা করেছিলো 

আমি স্পষ্ট দেখেছি জানলার এপারে দাঁড়িয়ে 


তারপর ওরা রাজহাঁসের পেটে ঢুকে গেছে 

একথাও আমি স্পষ্ট জেনেছি -


মাঝেমাঝে ওদের ডাক দিই নদীর পাড়ে গিয়ে

ওরা হেসে ওঠে নদীর ওপারে-


সাঁকো পেরিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে অজস্র গান 

ধারাপাতে ভিজে উঠেছে ভেতরের ঘর.. 


ওরা অগ্রাহ্য করে

হাসে- লুটোপুটি খায় আকাশের দেওয়ালে 



টুকরো যাপন 

অরিজিৎ


সুন্দরের আরাধনায় গভীর রাতের চাঁদ 

জলাশয়কে আপন করলে, 

মুহূর্ত যাপনের তাত্ত্বিক বোধিসত্ত্ব ছেড়ে 

উলঙ্গ মন উষ্ণতা খোঁজে সাদা পাতায়! 

না, শব্দ বিভ্রম লিখব না। 

রিক্ততা ফেলে চাঁদ সরে যায় আপন মনে, 

অবকাশ কুড়িয়ে কলমও ছুঁতে চায় 

কাঙ্ক্ষিত বোধের নির্জন কোণ। 

মেঘ ভাঙা বৃষ্টির মতন উজাড় হলেও-

দৈনন্দিন প্রেক্ষাপটে লেখা হয় শুধুই- 'শূন্যতা' ! 

   

                                         

 আমি'না পুরুষ 

 তন্ময় রাণা

 


নারীর পুরুষের প্রাধান্যতা নিয়ে তরজা,

কখনোই-

সেভাবে আমায় নাড়া দিয়ে যেতে পারেনিl 

তবে পুরুষালি- 

সমাজের বদান্যতায়,সেখানের আকাশ বাতাস, 

মনেতে বিভেদের একটা সুপ্ত আগুন সব সময় জ্বালিয়ে রেখে গেছে l 


সেই শৈশবে থেকে জীবনের বিভিন্ন মন খারাপের পর্যায়, 

যখনি চোখের লবন জলের হৃদের প্লাবনে  

মন প্লাবিত হয়েছে,

মায়ের স্নেহের পরশ এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে গেছে 

আমি'না "পুরুষ" আমায় কি এভাবে

কাঁদতে আছে l 


যেদিন মাথার ওপর থেকে বিশাল ছাদটা 

সরে গিয়েছিলো 

শেষ বিদায়ের চরম কষ্টের সেই সেই 

অনাকাঙ্খিত মুহূর্তে,

নিথর শরীরটা জড়িয়ে যখন চোখের জল বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলো,

তখনো সব কাছের মানুষেরা পিঠে হাত 

রেখে আমায় 

শান্ত করে বলেছিলো,এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না "শক্ত হতে হবে l 


সেই শক্ত হতে হতে আজ সেসব নরম অনুভূতি গুলো 

ক্রমশ সময়ের আস্তরণের তলায় চাপা পড়ে মনকে 

আরও কঠিন রুক্ষ পাহাড়ের মতো দৃঢ় করে তুলেছেl  


দায়িত্ব কর্তব্য গুলো শিরা উপশিরা বেয়ে গুটিগুটি পায়ে 

কখন যেনো বিস্তার ঘটিয়ে কাঁধেতে 

জাঁকিয়ে বসেছে 

আমি হেঁটে চলেছি সে সবের বোঝা নিয়ে

জীবনের প্রতি ঘাত-প্রতিঘাতে l 

যেভাবে সেদিন ঝড় বৃষ্টি সব উপেক্ষা করে রাণার ছুটে চলেছিলো,  

খবরের বোঝা নিয়ে কাঁধে পথের বাঁকে বাঁকেl 


যখনি কষ্ট হয়েছে বাতাসের গুনগুনানিতে 

কে যেনো 

কানে কানে বলে গেছে বারবার 

আমি না 

"পুরুষ" আমায় কি কষ্ট পেতে আছে?


কি'করে বোঝাই ওদের যে আমারও মন খারাপ হয়,

কষ্ট হয়,কখনো কখনো একটা শক্ত কাঁধে মাথা রেখে, 

আমারও যে কাউকে জড়িয়ে ভীষণ ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছা হয় l 


কিন্তু ওই....আবার যেনো শুনতে পাই 

আমি'না "পুরুষ" 

আমায় কি অমন কাঁদতে হয় ..



পরিপাটি সংযম 

সায়ন্তিকা 


সংযমগুলো আসলে কোনো নিয়মেই মানে না ۔۔۔

ওদের আমি পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখি 

আমাকে কবি হতে নিষেধ করেছিলো ওরা !


ঠাকুরঘরে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরী ,

শুধু একটিবার একটা কবিতা লিখেছিলাম ,

আম۔পল্লবে লাগা সিঁদুর মুছে মনে মনে বলেছিলাম ۔۔۔

"ইতি গজ !"


সত্যি হয়ে ওঠা কবিতা আর মিথ্যে কবির পরিচয় একই রকম ۔۔۔

দুটোই বড্ড আঁশটে !


ঠাকুরঘরে প্রবেশ নিষেধ !


গাছগুলো মাটির সাথে সহবাস করতেই অভ্যস্ত ,

আকাশ মানেই তো হারিয়ে যাওয়া !


জন্ম আর মৃত্যুর ঠেলাঠেলিতে ঈশ্বরী হয়ে ওঠে মানুষ ,

ভেজা ঘরে শুধু আলো আর অন্ধকারের পাঁচমিশালি লেখা !


ঘড়ির কাটাতে টিকটিক , টিকটিক, টিকটিক ۔۔۔۔

সংযমী শরীরে অনর্গল তৈরী হয় সুখের কবিতা !



তোমাকে নয়

মঙ্গল মিদ্যা (রিপল)


আমি তোমায় নিয়ে কত কবিতা লিখি,

অথচ তোমাকে ভালোবাসি না।

যখন শব্দগুলো তোমার নামে কবিতা হয়ে সাজে,

তখন আমার হৃদয়ের ভালোবাসা অন্য একজনকে খোঁজে।


আমি তাকে ভালোবাসি,

হ্যাঁ সত্যি তাকে খুব ভালোবাসি।

তাই, ছন্দ গুলো তোমার কাছে উজার করে দিই।

জানি তুমি বুঝবে, তুমি জানবে....

আমার কবিতা তোমার হলেও , আমি তোমার নই।


তুমি আমার অনুপ্রেরণা,

তুমি আমার বেঁচে থাকার জীবন,

তুমি আমার এক-আকাশ জমে থাকা কথা,

তুমি আমার একান্তই আপন।

তবুও....

শুধু আমার ভালোবাসা নও !


ভালোবাসার জায়গাটা অন্যকারোর জন্য রাখা।

যে এখনো বেঁচে আছে,

যে আমাকে পুরনো স্মৃতি ভুলে 

নুতন ভাবে জীবন শুরু করতে বলে।

যে আমাকে ভালো থাকতে বলে !

হ্যাঁ, আমি তাই তাকেই ভালোবাসি !

খুব ভালোবাসি।।



      বঙ্গবন্ধু বলে ডাকে

        রতন চন্দ্র রায়

                               

আমি চাইনি ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে

আমি চাইনি রাষ্ট্রের প্রধান হতে

আমি চাইনি অসহায় মানুষকে বঞ্চিত করে

বিশাল রাজপ্রাসাদে বসবাস করতে।


আমি শুধু চেয়েছিলাম

স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার

মাতৃভাষায় স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার

আমি শুধু চেয়েছিলাম

স্বাধীন রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে

সকল ধর্ম বর্ণ মানুষের সাথে

স্বাধীন রাষ্ট্রে এক আকাশের নিচে বসবাস করতে

সরল মনে বিশ্বাস করেছিলাম

বাংলার প্রতিটি মানুষকে।


সেই বিশ্বাসের মর্যাদা কেউ রাখতে পারেনি

রাতের আধারে বুকের পাঁজরে করেছে গুলি

বাংলার কিছু বিশ্বাসঘাতক

ভুলে গিয়ে ছিলো তারা

এই বাংলার জন্য কত কষ্ট কত লাঞ্ছনা

সহ্য করেছি আমি........


শত কষ্টের পরেও

স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পিছপা হইনি

বাংলার মানুষের অধিকার আদায় করতে

জেল খেটেছি বহুবার..........


তবুও পারেনি দাবিয়ে রাখতে আমাকে

রাজনৈতিক মিথ্যা মামলা দিয়েছে

শত সহস্রবার, তবুও পারেনি আমার

প্রতিবাদী কন্ঠস্বর বন্ধ করতে

স্বদেশপ্রেমের আত্মহুতি দিয়েছি

তবুও মাথা নত করিনি

বিশ্বাসঘাতকদের কাছে.........


মৃত্যুর বহু বছর পরেও দেখছি

দূর নীল আকাশ হতে

এখনো বাংলার মানুষ ভালোবাসে

আমাকে.............. 

বঙ্গবন্ধু বলে ডাকে বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে।



গল্প 


সেদিনের কাল মেঘ

শিবাজী সান্যাল


        তিন দশক কেটে গেছে । প্রায় ভুলেই গিয়েছিল ঝুমা, কিন্তু আজ সকালে সুবীরের ফোন পেয়ে সেই পুরোনো ঘটনাটি আবার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল। সুবীর বলল , “ ঝুমা , এতদিন পরে প্রতীমের সঠিক খবর পেয়েছি। ও দার্জিলিং এর পথে টুলপিং বলে একটি ছোট্ট পাহাড়ি জায়গায় একটি স্কুলের শিক্ষক। এটা কার্শিয়াং থেকে একটু দূরে। ” কথা শেষে ফোনটি রেখে ঝুমা অনেকক্ষণ বসে রইল। সুবীর ওকে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবে না। কিন্তু ও বারবার ভেবেছে অন্তত একবার ও দেখা করে ওকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে , নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইবে। কিন্তু অনেক খোঁজ করেও ও প্রতীমের কোন সন্ধান পায় নি। 

            মেডিকেল কলেজের সেই দিনগুলোতে ছিল এক প্রচণ্ড পড়াশোনার চাপ আর তার সঙ্গে প্রথম যৌবনের আনন্দময় নানা মুহূর্তে ভরা। নিজেদের একটি গ্রুপ ছিল , তারা জোট বেধে আড্ডা , সিনেমা দেখতে যাওয়া , নানাভাবে অন্য ছাত্র ছাত্রিদের , বিশেষতঃ নতুনদের হেনস্থা করা , কারো রুমে একসাথে মিউজিক চালিয়ে নাচা এসব নিয়ে মেতে থাকত। সেসময় প্রতীম একটি গ্রাম থেকে আসা ভীষণ সাদাসিধে টাইপের ছেলে ছিল। তবে ছাত্র হিসেবে ওই বেস্ট ছিল , তাই সমস্ত শিক্ষকদের কাছে প্রিয়পাত্র। অনেক চেষ্টা করেও ওরা ওকে ওদের গ্রুপে ঢোকাতে পারে নি বা ওদের কোন মজায় আনতে পারে নি। কখনও ওকে জোর করলে ও বলত , “ আমি তোমাদের এইসবে ঠিক মানাতে পারব না , গ্রাম থেকে এসেছি । আমাকে একলা থাকতে দাও। একবার ডাক্তার হয়ে বেরুতে পারলে আমার গ্রামের অসংখ্য হতভাগ্য মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করব। ” এতে প্রতীমের ওপর ওদের রাগ বেড়ে যায়। সুযোগ পেলেই ওকে ওরা অপদস্থ করত। তবে ঝুমা ওর অবস্থা বুঝে ওর সঙ্গে আলাদাভাবে মিশত , কথা বলত। কিন্তু ঝুমার এই প্রতীমের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধুদের অনেকেই পছন্দ করত না , হয়ত হিংসে করত । ওকে দূরে থাকতেও বলেছে , তবে ঝুমা সর্বদাই প্রতীমের সততা এবং সরলতার প্রশংসা করত। ঠিক এই অবস্থায় হঠাৎ একদিন ঝুমা একটি চিঠি পায় , প্রতীমের লেখা। সেই চিঠি পেয়ে ঝুমা আকাশ থেকে পড়ল , এত নীচে নামতে পারে প্রতীম ! ওর সাথে সহজভাবে মিশেছে বলে ও এত দুঃসাহস পেয়েছে , ওকে এত সহজলভ্য ভেবেছে ? চিঠিতে ও নিজের প্রেম ব্যক্ত করে ওর শরীরের নানা বর্ণনা করে কুৎসিত ইঙ্গিত করেছে , ওকে শারীরিক ভাবে পাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে তাও লিখেছে। ওকে মিলিত হবার আহ্বান করেছে , সঙ্গে একটি সঙ্গমরত ছবি এঁকেছে। ঝুমা রেগে কি করবে কুলকিনারা পাচ্ছিল না । শেষে ও সোজা প্রিন্সিপালের কাছে গিয়ে এই চিঠি দেখিয়ে প্রতিবাদ জানাল। সব শুনে এবং চিঠি পড়ে প্রিন্সিপাল ভীষণ রেগে গেল। প্রতীমকে ডাকা হল , ও বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানে না বলল , বলল , “ স্যার , আমি গরীব ঘরের ছেলে , এখানে অনেক স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা করতে এসেছি। এমন জঘন্য একটি কাজ করার কথা আমি ভাবতেও পারি না। আর আমি ঝুমাকে নিজের এক বিশ্বস্ত বন্ধু ভাবি - - - । ” ওকে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলা হল। কিন্তু যে অপরাধ ও করেনি তার জন্য কেন ও ক্ষমা চাইবে ? পরিণামে ওকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হল। 

             পরদিন কলেজে সবাই জেনে গেল । প্রতীমের মত ছেলে এমন কাজ করতে পারে ? অবিশ্বাস্য । সুবীর ছুটে এসে ঝুমাকে বলল , “ এ তুই কি করেছিস ? এ চিঠি প্রতীম লেখেনি। তোকে ওর থেকে দূরে সরানোর জন্য কিছু ছেলে মিলে এই খেলা খেলেছে। তুই একবার আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারতিস। একটি গরীব নিরাপরাধ ছেলের সর্বনাশ হয়ে গেল। ” শুনে ঝুমা বিস্মিত , নিজের কাছে একদম ছোট হয়ে গেল , আত্মগ্লানিতে যেন মাটিতে মিশে গেল। ওরা সবাই ওর হোস্টেল রুমে ছুটল , সেখানে পৌঁছে দেখল প্রতীম সেখান থেকে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেছে। ঝুমা ব্যাপারটা প্রিন্সিপালকে জানাতে চাইলে বন্ধুরা মানা করল ,বলল এতে ওদের অনেকেই ফেঁসে যেতে পারে। ঝুমা এরপর প্রতীমের অনেক খোঁজ করেছে , ওর গ্রামের বাড়িতেও সুবীরকে নিয়ে গেছে কিন্তু কোথাও ওকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

           ঝুমা সন্ধ্যায় দুঘন্টা একটি ক্লিনিকে বসে । সেখান থেকে ফিরে অস্থির মনটা ঘোরাতে অনেক চেষ্টা করল কিন্তু বারবার সেদিনের প্রতীমের অসহায় মুখটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। মেয়ে জয়া এসে জিজ্ঞেস করল, “ মা তোমার শরীর ভাল আছে তো ? ” রাতে হসপিটাল থেকে প্রদীপ ফিরলে ঝুমা সুবীরের ফোনের ব্যাপারে সব বলল। প্রদীপ বলল, “ কেন যে তুমি এত বছর পরেও একটি অপরাধবোধ বুকে নিয়ে কষ্ট পাচ্ছ জানি না। যা হয়েছে তা অজান্তে হয়েছে । ” 

            ঝুমা বলল , “ আমি টুলপিং যাব। প্রতীমের কাছে গিয়ে সব বলে ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত আমি শান্তি পাব না । ”


            ঝুমা বাগডোগরা এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে দেখল অনেক গাড়ি বাস আছে , তবে প্রায় সবই দার্জিলিং যাবে , কিছু গ্যাংটক। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে ও একটি গাড়ি ঠিক করল , ড্রাইভার টুলপিং জায়গাটি চেনে। তারপর পাহাড়ী পথ ধরে এঁকেবেঁকে গাড়ি এগিয়ে চলল। সুন্দর দৃশ্য চারদিকে , গাছপালা , ছোট ঝর্ণা , চা বাগান । পথে কার্শিয়াংএ গাড়ি একটু দাঁড়াল। একটি রেস্তরাঁতে সামান্য কিছু খেয়ে আবার রওনা হল। একসময় ড্রাইভার বলল , “ ম্যাডাম , আমরা টুলপিংএ এসে গেছি। ” ছোট্ট জায়গা , বেশ কিছু বাড়িঘর এদিকে সেদিকে, ক্ষেত খামার , লোকসংখ্যা খুব কম মনে হচ্ছে। কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করে বোঝা গেল এখানে একটিই স্কুল আর তার এক মাস্টার কাছেই একটি বাড়িতে থাকে। সেই জায়গায় পৌঁছে ঝুমা দেখল একটি কাঠের বাড়ি , সামনে বাগান , গেটে নামফলক ‘ প্রতীম কুমার দাস , প্রধান শিক্ষক ’ । গাড়িকে বিদায় করে হাতের ব্যাগ নিয়ে ঝুমা বাগান পেরিয়ে দরজায় টোকা দিল। দরজা খুলে সামনে দাঁড়িয়ে প্রতীম , কিন্তু ভীষণ বদলে গেছে! একমুখ সাদাকালো দাড়ি, ঘাড় অবধি চুল , চোখে মোটা কাঁচের চশমা । ও অবাক্ হয়ে তাকিয়ে রইল । নীরবতা ভেঙে ঝুমা বলল , “ প্রতীম , চিনতে পারছ না আমাকে ? আমি মেডিকেল কলেজের তোমার সহপাঠী ঝুমা । ” তারপরও সময় লাগল পুরো ব্যাপারটা বুঝতে , যেন হঠাৎ করে সময়ের ঢেউ এসে অনেক পিছিয়ে নিয়ে গেল , সব খুঁজে পেতে একটু সময় লাগল , প্রতীম বলল , ” ঝুমা ! এতদিন পরে , তুমি এখানে ? ”

             প্রতীম ওকে ভিতরে নিয়ে এসে বসালো , তারপর কফি বানিয়ে হাতে দিয়ে বলল , “ আমি এখনও তোমার এই আসার বিষয়টি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না । ”

              ঝুমা বলল , “ তোমাকে অনেক খুঁজেছি। আর তিন দশক পর তোমার হদিশ পেলাম। আমার জন্যই তোমার জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে , তার জন্য এক বিরাট বোঝা আমি আজও বুকে নিয়ে ঘুরছি। ”

              প্রতীম একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল , “ এতদিন পর আর এসব প্রসঙ্গ কেন ? আমি জানি তুমি রাগের বসে অভিযোগ করেছিলে , কিন্তু যদি তার আগে একবার আমার সঙ্গে কথা বলতে , এই সমস্ত কিছু এড়ানো যেত। পরে নিশ্চয়ই সব জানতে পেরেছ। সবই ভাগ্য , নইলে এমন কেন হবে? তবে তোমার প্রতি আমার কোন রাগ নেই কারণ আমি যতটুকু তোমাকে জানি , একটু বুঝতে পারলে , তাহলে তুমি এ কাজ কখনও করতে না , তা আমি বিশ্বাস করি। ”

             ঝুমার গলা কাঁপছিল , বলল , “ আমি শুধু তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি প্রতীম , যখনই তোমার কথা মনে পড়ে , আমি মানসিক এক যন্ত্রণায় ক্ষত বিক্ষত হই। ”

             “ এমন বল না। তোমাকে আমার কখনই সম্পূর্ণ দোষী মনে হয় নি। কিছু ছেলের দুষ্কর্মে অজান্তে তুমি জড়িয়ে পড়েছ। মনে আর কোন কষ্ট রেখো না । ”


              সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল। একটি পাহাড়ী মহিলা এসে ঘরের সব ঠিকঠাক্ করে , ওদের জন্য রান্না করে , ফায়ার প্লেসের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে চলে গেল। এ সময় এখানে ঠান্ডা বাড়তে থাকে , তাই প্রায় সবাই আগুন জ্বালিয়ে তাপ নেয়। ওরা দুজন আগুনের কাছে বসে নিজেদের পুরোনো দিনের নানা কথা মনে করে কথা বলছিল। ঝুমা বলল , “ কি যে হয়ে গেল , ভাবতেও খারাপ লাগে। আচ্ছা বল , কলেজ থেকে যাবার পর তুমি কি করলে ? ”

             প্রতীম বলল , “ সে অনেক ঘটনা , পরপর ঘটে গেছে। বাড়ি ফিরতে পারিনি , কি মুখ নিয়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াব? বাবা ধারে টাকা নিয়ে আমাকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। সমস্ত গ্রাম এক বিরাট আশা নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। তাই এক অজানা শহর হায়দ্রাবাদ গিয়ে পৌঁছলাম। সেখানে একটা চায়ের দোকানে কাজ নিলাম । একদিন পরিচয় হল এক বাঙালির সঙ্গে , আমার সব কথা শুণে, তিনি ওখানকার বেঙ্গলী এ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমার একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেয় , আস্তে আস্তে কিছু বাচ্চাদের টিউশানি জোগাড় হল। পড়াশোনা আবার শুরু করলাম। বিএসসি পাশ করে ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে বিএড জয়েন করলাম। এই সময় বাবার ভীষণ শরীর খারাপের খবর পেয়ে বাড়িতে পৌঁছলাম। বাবা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার মুখের দিকে , একসময় চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। আমি কাছে গিয়ে সেই অশ্রু মুছে বাবার হাতটা ধরে বসে রইলাম। একটি কথাও বলতে পারিনি। কি বলব ? কত সময় কেটে গেছে জানিনা , কাকা আমার পিঠে হাত রেখে বলল , “ প্রতীম , দাদা চলে গেছেন। ” মা আগেই চলে গিয়েছিলেন , এবার পুরো এতিম হলাম। নিজের চোখের সামনে আমার বাবাকে , এক স্বপ্ন ভাঙা মানুষকে , তার অভাগা ছেলের সামনে পরপারে যেতে দেখলাম। দিদি এসেছিল , অনেক প্রশ্ন করল , কোনটির উত্তর দিতে পারিনি , শেষে রেগে বলল , “ তুই এসেছিস কেন ? যখন সবাইকে ছেড়ে দূরে গিয়ে বসে আছিস , আমাদের কারও জন্য তোর কোন চিন্তা নেই , আজ শুধু বাবার মৃত্যু দেখতে এসেছিস ? ” আবার ব্যাঙ্গালোর ফিরে এলাম। বিএড পাশ করে একটি স্কুলে চাকরি পেলাম । বন্ধুদের অনুরোধে এক অসহায় মেয়ের সঙ্গে বিয়েও করলাম। বছর ঘুরতে আমাদের একটি পুত্রসন্তান হল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস , ছেলেটা যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স , গৌরিও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। একা হাতে সব সামলাতে হয়েছে। সেসময় এক দার্জিলিংএর চা বাগানের মালিক পাহাড়ের গরীব ছেলেমেয়েদের জন্য একটি স্কুল তৈরী করে দায়িত্বপূর্ণ একজন লোক খুঁজছিলেন। যোগাযোগ করে কথাবার্তা শেষে এই লুংপিংএ চলে এলাম। তারপর থেকে এখানেই এই সরল মানুষদের মাঝেই আছি , বেশ কেটে যাচ্ছে সময়। ”

              কথা শেষে ওরা দুজনই চুপচাপ বসে রইল। ঝুমা বলল, “ কোথায় একজন ডাক্তার হয়ে গরীব দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারতে , পরিবারের গর্ব হতে পারতে , সেখানে এই পাহাড়ে , সবার থেকে অনেক দূরে এক বিচ্ছিন্ন জীবন কাটাচ্ছ। তোমার ছেলে কোথায় ? ”

              “ ও গ্যাংটকে একটি আইটি ফার্মে কাজ করছে। ”

              “ ছেলেটাও কাছে নেই । তোমার জীবন অনেক সুন্দর হতে পারত , কিন্তু আমার একটিমাত্র ভুলের জন্য তোমার সব তছনছ হয়ে গেছে। ” ঝুমার গলা কাঁপছিল , দুচোখে কুয়াশা ভরে এল । 

              প্রতীম বলল , “ এই ঝুমা , নিজেকে আর দায়ী কর না। কিছু জিনিস , কিছু ঘটনা ,মানুষের হাতে নেই। এই নাও মুনিয়া এখানকার স্পেশাল সুপ বানিয়ে রেখে গেছে। নাও , আর তোমার ছেলে মেয়েদের কথা বল। ”


≈==================================



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ