বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- নির্বাচিত কবিতা




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

।। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় - নির্বাচিত কবিতা।।

 এই নরকে

কবিরা কোথায় আজ? উত্তরার জলসা-ঘরে এখনো কি নাচ সেখায় তারা?
এদিকে যে শমীবৃক্ষে মন্ত্রপড়া অস্ত্রগুলি কীচকের বাড়ায় আহ্লাদ!
শুনি পাড়ায় পাড়ায় জল্লাদের আস্ফালন ; দেখি ঘরে ঘরে
নরখাদকের রক্তমাখা থাবা, পিশাচের মার…
কবিরা কোথায় আজ? সবাই কি দুর্যোধনের কেনা,
নাকি বিরাট রাজার কৃতদাস ।

===
রাস্তা কারও একার নয়

ধর্ম যখন বিজ্ঞানকে বলে রাস্তা ছাড়াে!’ বিজ্ঞান কি রাস্তা ছেড়ে দেয়?

 পােপের ভয়ে দেশান্তরী হয়েছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। সারাদিন
 একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে পায়চারি করতেন গ্যালিলিও গ্যালিলেই ;
 তাঁকে পাহাড়া দেবার জন্য বসে থাকতাে একজন ধর্মের পেয়াদা, যার
 চোখের পাতা বাতাসেও নড়তাে না।
 বিজ্ঞান কি তখন থেমে ছিল? তীর্থের পাণ্ডাদের হই হই, তাদের লাল
 চোখ কি পেরেছিল পৃথিকে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে, সূর্যকে
 তার চারদিকে ওঠবােস করাতে?
 ধর্ম যতদিন দুঃখী মানুষকে বেঁচে থাকার সাহস দেয়, ততদিন
 রাস্তা নিয়ে কারও সঙ্গে তার ঝগড়া থাকে না। রাস্তা কারও
 একার নয়।
 বরং তাকেই একদিন রাস্তা ছাড়তে হয়, যার স্পর্ধা আকাশ 
 ছুঁয়ে যায়।
 বিজ্ঞান যখন প্রেমের গান ভুলে ভাড়াটে জল্লাদের পােশাক গায়ে চাপায়, আর
 রাজনীতির বাদশারা পয়সা দিয়ে তার ইজ্জত কিনে নেয়,
 আর তার গলা থেকেও ধর্মের ষাঁড়েদের মতােই কর্কশ
 আদেশ শােনা যায় : ‘রাস্তা ছাড়াে! নইলে –
 পৃথিবীর কালাে সাদা হলুদ মানুষের গান, তাদের স্বপ্ন
 এক মুহূর্ত সেই চিঙ্কার শুনে থমকে তাকায়।

তারপর যার যেদিকে রাস্তা, সেদিকে মুখ করেই তারা সামনে, 
আরও সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
কেউ কারােকে রাস্তা ছেড়ে দেয় না, যতদিন এই পৃথিবীতে গান থাকে, 
গানের মানুষ থাকে, স্বপ্ন থাকে..

====
 লেনিন

যে-দেশে শিশু জন্ম নিলে
জননীর মুখের হাসি মানিক হয়ে ঝরে 
যে-দেশে শিশু জন্ম নিলে
পড়শীদের প্রতি ঘরে শাঁখ বাজে, এয়ােতিরা উলু দেয়
সে-দেশের একটি মানুষ অনেকদিন কবরের নিচে শুয়ে আছেন 
কিন্তু তিনি কখনাে ঘুমােন না, পাহারা দেন
যেন কোনো জননীর মুখের হাসি চোখের জল না হয়।

====
 ছত্রিশ হাজার লাইন কবিতা

ছত্রিশ হাজার লাইন কবিতা না লিখে

যদি আমি সমস্ত জীবন ধ’রে
একটা বীজ মাটিতে পুঁততাম
একটা গাছ জন্মাতে পারতাম
যেই গাছ ফুল হয়, ছায়া দেয়
যার ফুলে প্রজাপতি আসে, যার ফলে পাখিদের
ক্ষুধা মেটে ;

ছত্রিশ হাজার লাইন কবিতা না লিখে
যদি আমি মাটিকে জানতাম !

====
 আশ্চর্য ভাতের গন্ধ

আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে
কারা যেন আজও ভাত রাঁধে
ভাত বাড়ে, ভাত খায়।

আর, আমরা সারা রাত জেগে থাকি
আশ্চর্য ভাতের গন্ধে
প্রার্থনায়, সারা রাত।

====
 মহান নেতৃবৃন্দ

তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত “চাচা
আপন বাঁচা”-র ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ;
যদিও নিজেকে সে তুলতে চায় সে মাচায়,
ভুলে যায়, যারা গতকাল ছিল মিত্র
এখনো পচছে খাঁচায়…

কিন্তু সে বেপরোয়া ।
“আগে নিজে বাঁচো, তবে আকাশ ছোঁয়া
পাহাড়ে উঠবে ।” বলেছেন নাকি লেনিন :
বেনামে স্তালিন, স্বপ্নে মাও সে তুং :

“জাহান্নামে যে যাবে, তাকে যেতে দিন—
আবার আসবে বদলা নেবার দিন ।

মহান নেতৃবৃন্দ! যে মরে মরুক, আপনারা
সুখে বাঁচুন ।।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ