পোস্ট বার দেখা হয়েছে
কলমে শ্রাবণী
প্রিয় দর্পন,
মুখোশবিহীন একটা সুস্থ স্বাভাবিক পৃথিবী ফিরে পাওয়ার আশা নিয়েই তোমাকে হঠাৎ চিঠি লিখতে বসলাম। জানি না তুমি কেমন আছো, কেননা আমরা তো কেউই ভালো নেই। ভালো নেই কেননা ভালো নেই আমাদের পৃথিবী, ভালো নেই আমাদের আশেপাশের মানুষজন। যে সুখের সন্ধানে মেতে উঠে আমরা ক্রমাগত গরল ছড়িয়েছি আমাদের নির্মল স্বচ্ছ পৃথিবীর বুকে, যে ভালো-থাকার প্রবল বাসনায় সাজিয়েছি নকলের উপঢৌকন, আজ সেই সুখ সেই ভালো-থাকা অদ্ভুত এক ছদ্মবেশে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। যে মুখোশকে মুখ ভেবে ঠোঁটের কোণে এনেছি মেকি হাসির ঝলক, সেই মুখোশই আজ ঢেকে দিয়েছে আমাদের মুখ। ভালো নেই দর্পন, আমরা কেউ ভালো নেই। আগামীতে কতটা ভালো থাকব তাও জানি না।
ও সব কথা থাক, এখন বলো তোমাদের সেই তিস্তা নদীর ধারে বাগানঘেরা বাংলোটা পরিচর্যায় আছে নাকি আমাদের সন্তানদের মতোই ওটা সংস্কারের অভাবে ক্রমশঃ ধ্বংসপ্রায় হয়ে আসছে? ওই দেখেছ তো, সেই একঘেয়ে কথা বলে ফেলছি। আসলে কি জানো তো চোখের সামনে এই অবক্ষয় দেখতে দেখতে কোথাও যেন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। আচ্ছা বলোতো, আমরা কি ছোটবেলায় কখনও ঘন্টার পর ঘন্টা টিভির সামনে বসে থেকেছি, নিজেদের পরম্পরাকে ভুলে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে বাঁচার এ হেন প্রচেষ্টায় মেতে থেকেছি? গাছে উঠেছি, মাছ ধরেছি, ঘুড়ি উড়িয়েছি, আবার গুরুজনদের সাথে দেখা হলে পা ছুঁয়ে তাঁদের প্রণামও করেছি। আর আজকাল তো ওসবের বালাই-ই নেই। আর এসবের জন্য দায়ী আমরাই, আমরাই কলুষিত করেছি শিশুসুলভ মনকে। জানো তো একজন প্রকৃত মা-ই পারেন একজন প্রকৃত শিশু জন্ম দিতে, যে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠবে। সেই মা-রা আজকাল কোথায়! ভাবতে অবাক লাগে, আমরা আমাদের সন্তানদের কোন্ দিকে ঠেলে দিচ্ছি! আচ্ছা দর্পন, আমরা কি পারিনা নতুন করে আবার বুনে দিতে সৌহার্দ্যের বীজ, ছড়িয়ে দিতে ভালোবাসার আভা, বাড়িয়ে দিতে আন্তরিকতার হাত। এই যে আমাদের ভেতর সদা সর্বদা এক অস্থিরতা, এই যে স্থিতধী না হতে পারার অপারগতা, এই অস্থিরতাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরো অন্ধকারের মুখে ঠেলে দেবে। এখনও যে গুটিকয় সন্তান আমাদেরই লাগানো গাছের ছায়ায় বসে পড়ছে " বনলতা সেন " , যাদের চোখকে তৃপ্তি দিচ্ছে শ্রাবস্তীর কারুকাজ, তারাও আর খুব বেশি দিন এসবের মধ্যে আনন্দকে খুঁজে পাবে না। যে সব বিজ্ঞাপনে আজ আমাদের মুখ ঢেকেছে, সেই বিজ্ঞাপনই বিশ্রামবিহীন এক অভিশপ্ত সমাজের জন্ম দেবে। সবাই শুধু ছুটবে সর্বগ্রাসী সুখের সন্ধানে। আর এক এক করে ভেঙে পড়বে সমাজের বুনিয়াদ।
যাইহোক বলো, সেই বাংলোয় আজকাল কি যাও, পুরোনো দিনের মতো আজও কি রবীন্দ্র সঙ্গীতে মুখরিত হয় সেই নদীর কিনার?
তুমি তো খুব ব্যস্ত জানি, এতটাই ব্যস্ত থাকো যে নিজের দর্পনে নিজেকে দেখে ওঠার সময়ই বোধহয় পাও না। তবু এই যে অদ্ভুত সময় এসে আমাদের দাড় করিয়ে দিয়েছে ঘরের জানালায়, এই সময়টাতে নিশ্চয়ই কিছু সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছ। মনে আছে ছোটবেলায় আমরা কত কবিতা লিখতাম। আজকাল কি তুমি কাব্যচর্চা করো নাকি উপার্জনের নেশায় পেশাই হয়ে উঠেছে তোমার একমাত্র ভালো লাগার বিষয়?
সাবধানে থেকো। সুস্থ পৃথিবীর আশায় বুক বেঁধে এসো আরো বেঁধে বেঁধে থাকার চেষ্টা করি। বিনিময় করি চিঠিপত্তর। তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম।
ইতি
শ্রাবণী

0 মন্তব্যসমূহ