পোস্ট বার দেখা হয়েছে
দুর্যোগ ও দুর্ভোগ
সুজিত চক্রবর্তী
আদিকবি যখন মেঘদূত রচনা করেছিলেন , তখন আর যাই হোক, বৃষ্টির কারণে মানুষের দুর্ভোগের কথা তাঁকে ভাবতে হয় নি মনে হয় । আমাদের এই বাংলার কবিগুরুর কলমও বর্ষায় অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠত, সন্দেহ নেই । যতদূর আন্দাজ করতে পারি তার সূত্র ধরে বলা যায় কখনও কোথাও একআধবার ওগো , আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে ' বললেও তিনি ঝড় বৃষ্টির দুর্যোগকে তাঁর সৃষ্টির সুযোগে পরিণত করেছেন নিপুণ দক্ষতায় ।
তবে কথাটা কি জানেন, দিন বদলে গেছে । এখন যদি ঝড় বৃষ্টির দিনে ( অথবা রাতে ) কেউ কবিতা লিখতে বসে, তার ঘরের লোকেই তাকে স্বার্থপরের তকমা লাগিয়ে দিতে পারে ! কারণ, দুর্যোগের অনেক আগেই আজ আমাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে বিজ্ঞানীর নির্ভুল সতর্কবার্তা । টিভির পর্দায় ভেসে উঠছে দুর্যোগের মোকাবিলায় বিভিন্ন জায়গায় কেমন চলছে প্রস্তুতিপর্ব তার চিত্রনাট্য ! এইখানে শুরু করে দুর্যোগ যখন আছড়ে পড়ছে উপকূলবর্তী এলাকায় এবং তার প্রভাবে যে ক্ষয়ক্ষতি হলো তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারাবিবরণী।
এর ফলে আমরা ড্রইং রুমে বসে দেখতে পেলাম কুলকুল করে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে জল ঢুকে কেমন করে তছনছ করে দিচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম! আবার সেই সংবাদ কভার করতে গিয়ে হয়তো বিপদে পড়েছেন কোনও সাংবাদিক ! কেউ হয়তো অশ্রুসিক্ত প্রতিবেদনে বোঝাতে চাইছেন এইমাত্র মৃত্যুকে তিনি ঠিক কতটা কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন । সৃষ্টি হচ্ছে অন্য এক বিতর্ক : এত ঝুঁকি নিয়ে এই কাজ করার কি আদৌ কোনও প্রয়োজন ছিল ? আমার মনে হয়, সব বিপদকে তুচ্ছ করে সংবাদ পরিবেশনের এই প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে। চলতে থাকবে, ঝড়ের গতিতে খবর শোনানোর লড়াই ।
ফিরে আসি ড্রইং রুমের গল্পে । ' টাউনের ' লোকে যে সবসময় তাঁদের ড্রইং রুমে বসে নিশ্চিন্তে দুর্যোগের ধংসলীলা দেখতে পাবেন তারও নিশ্চয়তা নেই। অতীতের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তাঁরা বলেন, গতবারের ঝড়ের পর টানা আটচল্লিশ ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কি নরক যন্ত্রণা সহ্য করেছি তা কখনও ভুলব না।
এবার আসি বিজ্ঞানের কথায় । শুরুতে বলেছি দুর্যোগের নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণীর কথা। যার ফলে আজ আমরা লক্ষ লক্ষ মানুষকে সময়মতো নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যেতে পারছি । বেঁচে যাচ্ছে বহু অমূল্য প্রাণ ! এ অবশ্যই বিজ্ঞানের জয় । আর একটু এগিয়ে যদি ভাবি, তাহলে দেখা যায় যে বিজ্ঞানীর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে ক্রমবর্ধমান দুর্যোগের আনাগোনা। বুলবুল, ফণী, আমফানের সাথে লড়াই করেই এগিয়ে চলেছে আমাদের জীবনযাত্রা। পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনই এর মুখ্য কারণ, জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হাল আমলে টাউটে, ইয়াস শুধু যে মানুষের ঘর ভেঙেছে তাই নয় , ভেঙে দিচ্ছে আমাদের পুরনো ধ্যান ধারণাও। আমরা অপেক্ষায় রইলাম বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারের খবর পাবার জন্য। এগিয়ে চলুক আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি। জয় হোক বিজ্ঞানের !

0 মন্তব্যসমূহ