পোস্ট বার দেখা হয়েছে কলমে অদিতি সেনগুপ্ত
প্রিয় দর্পণ,
আজ আমি তোমার সঙ্গে ভাগ করে নেবো আমার সবচাইতে প্রিয় মানুষটাকে লেখা মনের কথাগুলো।
অনিমেষ, আমার দেওয়া নামটিতে আজ আর ডাকলাম না! আসলে ও নামে ডাকলে আবেগটা আর সামলে রাখতে পারিনা যে! আর তখন এইযে গুছিয়ে চিঠি লিখতে বসেছি সেইটে পুরো মাটি হয়ে যাবে। এই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের যুগে চিঠি লেখা তো প্রায় উঠেই গেছে, কিন্তু আমার কাছে চিঠির গুরুত্ব আজও অনেক বেশি। তাই সুযোগ পেলেই চিঠি লিখে ফেলি। আসলে কি জানোতো কিছু কথার তৎক্ষণাৎ জবাব ঠিক ভালো লাগেনা। চিঠির মধ্যে সেই সময়টুকুকে সযত্নে লালন করা যায়, আর সেইসঙ্গে অপেক্ষা জবাবের—এ সম্পূর্ণ অন্যরকম এক অনুভুতি, কোনোকিছুর সঙ্গে যার তুলনা চলেনা! এ যেন এক অন্য আমির সঙ্গে অন্য তুমির দেখা! আসলে ২০২০ র পর থেকে জীবনটাই কেমন যেন বদলে গেল! এতদিন মহামারি এই শব্দটির সঙ্গে পরিচয় ছিল আক্ষরিক। গতবছর থেকে তার বাস্তব আঁচকে অনুভব করলাম, পরিচিত হলাম আরও একটি নতুন শব্দের সঙ্গে, “লকডাউন”। তবে সত্যি বলতে কি, গতবছর এর ভয়াবহতা এই পর্যায়ে অনুভব করিনি! কিন্তু এই দ্বিতীয় ঢেউকে সত্যি এবার ভয় পাচ্ছি! আমাদের আর কি কখনো দেখা হবে অনিমেষ? এক এক করে কত পরিচিত মুখ হারিয়ে গেলো এই সময়সারনীতে, এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ আলোর রেখা খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। জানিনা এর শেষ কোথায়! প্রথম ঢেউতে একেবারেই যে নিশ্চিন্তে দিনযাপন হয়েছে এমনটা নয়। সেসময়ও মানসিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট বেসামাল দিন কেটেছে। মাসের পর মাস দেখা হয়নি তোমার আমার, কিন্তু এখন যেমন এক গভীর আশঙ্কা ঘিরে ধরেছে তেমনটা গতবছর মনে হয়নি। আসলে কি জানোতো বড্ড বেপরোয়া হয়ে পড়েছিল মানুষ। পরিস্থিতি একটু নাগালে আসতেই পুজো-পার্বণ, মেলা, উৎসব, ভোট— কার্যত আমরাই আহ্বান করেছি মহামারির এই দ্বিতীয় ঢেউকে! আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কি অসম্ভব মানসিক ভাঙাগড়া চলছে শিশু-কিশোর মননে। দেড়বছর হতে চললো ওরা স্কুলের মুখ দেখেনি। জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা কিংবা জীবনের গতিপথ তৈরি করা দুটি পরীক্ষাই ইতোমধ্যে বাতিল ঘোষিত! মহামারির প্রকোপে যেমন জীবনহানি ঘটছে তেমনই জাঁকিয়ে বসছে আরেক মানসিক ব্যাধি, “ডিপ্রেশন” । বেশ কিছু প্রাণ অকালে ঝরে গেছে ডিপ্রেশন নামক এই মনের রোগে। আসলে ভয়ানক নেগেটিভ একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছি সকলে, যাদের মন দুর্বল তারা এঁটে উঠতে পারছে না এই নেগেটিভিটির বিরুদ্ধে। যাক প্রচুর জ্ঞান দিয়ে ফেললাম তাইনা ? তুমি বড্ড বেশি ব্যাস্ত অনিমেষ, একেবারে কাজপাগল! আমিও প্রচুর ব্যাস্ত আমার রোজনামচায়, কিন্তু তারই ফাঁকে আমি খুব মিস করি সেই প্রথম পরিচয়ের সময়টাকে। কিরকম পাগলামি করতে মনে আছে তোমার অনিমেষ? আর আমিতো বরাবরের বদ্ধ পাগল, মিলেছিল ভালো দুই পাগলে ! তোমার পাগলামিটা যেন বড্ড তাড়াতাড়ি সেরে গেলো অনিমেষ! যাকগে এ নিয়ে পরে আবার জমিয়ে ঝগড়া করবখনে। এখন এই এতদিনের অদর্শনে ভালবাসাটাই প্রাধান্য পাক কি বলো ? একটা কি জিনিস জানোতো, এই চরম নেগেটিভ সময়ের মধ্যেও বেশ কিছু পজেটিভ দিক দেখে মনটা ভরে ওঠে। বাংলা জুড়ে ছুটে চলেছে তরুণ তুর্কি স্বেচ্ছাসেবকের দল, দলমত নির্বিশেষে সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে চলেছে ঐ ভাইরাসকে পরাস্থ করতে। এসব দেখে মনে হয় করোনা হারবেই আর আমাদের জয় হবেই। এই চরম সঙ্কটের মোকাবিলা করতে করতে মানুষ একটা জিনিস বুঝেছে, মানুষ ছাড়া মানুষের কেউ নেই। তাই বহুবছর নিশ্চুপে পাশাপাশি থাকা প্রতিবেশীও আজ কখনো না বাজানো কলিং বেলটায় আঙুল ছোঁয়াচ্ছে ! জিততে আমাদের হবেই অনিমেষ, জিততে আমাদের হবেই।
ভালো থেকো তুমি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন এই কাজ পাগলটার মাথায় খুব বেশিনা এইই এক ছটাক রোমান্টিসিজম জাগিয়ে তোলে।
শুধু তোমার
রাণী বিবি
অদিতি সেনগুপ্ত

1 মন্তব্যসমূহ
উত্তরমুছুনলেখার মুন্সিয়ানায় সাধারণ কথাও কত অসাধারণ হ'ল!
আবারও আমরা ফিরবো মূল স্রোতে , তবে পাগলামির স্ট্যাম্প নিয়ে ৷ না হলে তারকাটা কথাটার মানেই থাকবে না