বিদায়ী সূর্যের রূপ || সাবিত্রী জানা ষন্নিগ্রহী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

বিদায়ী সূর্যের রূপ

সাবিত্রী জানা ষন্নিগ্রহী


১৯৭৮ সালে দক্ষিনেশ্বর মন্দিরে গিয়েছিলাম- মন্দিরের মাতৃদর্শনে। সংকীর্ণ রাস্তা--গাড়ি জ‍্যাম- বাস থেকে নেমে হাঁটা রাস্তায় কিছুটা দূরে মন্দির। মাটিরাস্তার দু'পাশে খুপরি খুপরি দোকান। পাশে পাশে পান্ডারা ছুটছেন-একটি পূজোর ডালা বিক্রি করবেন। ভক্তিভরে পূজো ও দিয়ে দেবেন। দাম পাঁচটাকা কি দশটাকা। গঙ্গার পাশে দোকান থেকে কিনে ঘাটে পুন‍্যগঙ্গার জল মাথায় ছিটিয়ে ঘাটসংলগ্ন দরজা দিয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে পূজো দেওয়া। মাতৃদর্শনের কোন হ‍্যাপা নেই-না সিকিউরিটি -না ভিড়-না লাইন -মা অতি সহজেই সুমুখে আসতেন। দূর থেকে যাওয়ার কষ্ট ছিল-মাতৃদর্শনের কষ্ট ছিল না।---গাছের উপর কাচ্বা- বাচ্চা নিয়ে বাঁদরগুলোর খেলা দেখা-মা গঙ্গার জলে নৌকার যাতায়াত-জলে ঢেউএর আন্দোলন দেখে-হোটেলে দশটাকার ডাল-ভাত-তরকারি খেয়ে দাদার নেওয়া ভাড়ার বাড়ীতে ফেরা-দমদম ক‍্যান্টনমেন্ট।---তারপর অনেকবার ভাবেই মাতৃ দর্শন করেছি।---প্রায় বিগত কুড়ি বছর একটি ছোট্ট আশা মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলাম- "দক্ষিনেশ্বরে কল্কতরু উৎসব দেখবো"। কিন্তু সে তো ভোরবেলায় লাইন দিতে হয়। কিভাবে হবে!-দূর থেকে যেয়ে অসম্ভব। --মনের আশা ব‍্যক্ত হোল--ঠিক করলাম আগের দিন হোটেলে যেয়েই থাকবো। ভোর বেলায় উঠে লাইন দেবো। সবার আগে যাবো।

---গেলাম--বিকেলে গঙ্গার ঘাটে যেয়ে বসলাম। ৩১ ডিসেম্বর-২০১৮ সূর্য বিদায় নেবে। অজস্র পুন‍্যার্থীর আনাগোনা। ভিড় এড়িয়ে বকুল গাছের নিচে দাঁড়ালাম --বছর শেষের বিদায়ী সূর্যের রূপ দেখবো।  নদী তার বোবা ভাষায় কি কথা বলে তাও বোঝার চেষ্টা করবো। --সূর্যরশ্মি তার বর্ণহীন তেজ ক্রমশঃ হারিয়ে রাঙা হচ্ছে। নদীর জল তার বর্ণহীন রূপ রাঙিয়ে নিচ্ছে--সূর্যরশ্মির লালচে  আভায়। আকাশ লাল-নদীর জল লাল--দূরে সেতুর লোহার রেলিং কুয়াশামাখা ধূসরশ্বেত। নদীর জলে ভাসমান নৌকা ও লজ্জায় রাঙা। নৌকার উপর হাল ধরে রাখা মানুষটি ও কেমন উদাস হয়ে গেছে। তার শরীরটাকে ও সূর্য রাঙিয়ে দিয়েছে।

---বিদায় নিচ্ছে ২০১৮ সালের শেষ সূর্য। 

--গার্ডভাই বাঁশী দিয়েছে-- সূর্য গেলেন লুকিয়ে-নদীর জলের ঢেউগুলো শান্ত- মাঝী নৌকা নিয়ে ঘরে ফিরছে। --

---পরের দিন ভোরবেলায় আমি "কল্কতরু" উৎসবের  প্রথম দর্শনার্থী হবো--এই উৎসাহ নিয়ে অনাগ্রহ নিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে।

---না এবছর-২০২০ সেই বছরের শেষ সূর্যকে আমি পেলাম না-পেলাম না গঙ্গার জলে ঢেউ-পেলাম না নৌকা -হালধরা মাঝিকে-

দূর থেকে মানসচক্ষে উপভোগ করলাম মন্দির-গঙ্গার জল-বিদায় নেবে বছরের শেষ সূর্য -রাঙা হবে আকাশ-নদী- জল-মাঝি-নৌকা।---

রবিঠাকুরের "মধুময় পৃথিবীর ধূলি"--র উক্তি হোক সত‍্য "সব ক্ষতি মিথ্যা করি অনন্তের আনন্দ বিরাজে"-শেষ আশির্বাদ স্পর্শ দিয়ে যেয়ো "২০২০ এর বিদায়ী সূর্য"।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ