পোস্ট বার দেখা হয়েছে
নতুন ভোরের গল্প
কল্পতরু উৎসব -প্রপাত ধরণীতলে
সাবিত্রী জানা সন্নিগ্রহী
২০১৮, ১লা জানুয়ারি -ভোর চারটা। মনে মনে বায়না -প্রতিজ্ঞা-ঐকান্তিক আগ্রহ--রাত আড়াইটা থেকে মাথা সজাগ-চোখ আধবোজা। কল্পতরু উৎসবের প্রথম দর্শনার্থী হবো আমি। মন্দিরের পাশেই হোটেলে আগের দিন থেকে রয়েছি-চড়া দাম দিয়ে। সাড়ে তিনটায় বিছানা ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে এগোলাম মন্দিরপানে। আকাশপথের নিচে ভাঙাচোরা-এবড়ো খেবড়ো রাস্তা-মিটমিট আলো জ্বলছে। রাস্তার দু'পাশে পূজো দেওয়ার ফুল-মিষ্টি অস্থায়ী দোকান। একটি ডালা কিনে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছি। একটু এগোতেই চক্ষু চড়কগাছ। কাতারে কাতারে মানুষ--পুলিশ ভাইরা একধারে দাঁড়িয়ে আছেন। এখন আকাশ পথের যেখানে সিঁড়ি -ওখানেই বড়গেট। গেটের পাশে শয়ে শয়ে লোক অপেক্ষা করছে--কে আগে ঢুকবে। অবস্থা দেখে নিজেই নিজের মনে হেঁসে ফেললাম। শয়ে শয়ে মানুষ আমার চেয়ে বেশী পুন্য অর্জন করেছেন। ---না আমি চুপ করে একধারে দাঁড়িয়ে রইলাম। না দাঁড়ানোর ও উপায় নেই। পেছন থেকে এক ঠেলা। ঠেলায় এগিয়ে গেলাম বেশ খানিকটা। এগোনোর জন্য কষ্ট করতে হচ্ছে না। পেছনের ঠেলায় এগোচ্ছি -বেশ দ্রুতগতিতে। ঠেলার গতি থমকে গেল-মন্দিরের পেছনে পুকুরের পাশের সরু গেটের সামনে। --জুতো-মোবাইল রাখার লাইন। ভিড় ভেঙে কাউন্টারে কাউন্টারে লম্বা লাইন। আমার মোবাইল ও নেই-পায়ে জুতো ও নেই। সুতরাং অনেককে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম। পুকুর পাড় দিয়ে ঘুরে ঘুরে লাইন। এক একবার এগোয় তো আবার থমকে যাওয়া। ---সিকিউরিটি পেরিয়ে আবার মানুষ- জ্যাম--সিঁড়ির নিচে। কোথাও কেউ নেই যে নির্দেশ দেবে। সুতরাং সিঁড়ি দিয়ে সবাই একসাথে উঠতে চাইছে। গতিক ঠিক সুবিধের নয় দেখে তে আবার একদিকে চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলাম। হঠাৎ প্রায় কুড়িজন ছেলে-মেয়ে দর্শনার্থী একসাথে হুড়মুড় করে সিঁড়ির নিচে--একে অন্যের উপর --পর পর -- একেবারেই তালগোল। ---চিৎকার-কান্নাকাটি--
ঝগড়া--ছুটাছুটি--। প্রায় দশমিনিট পর পুলিশ ভাইরা এলেন--দর্শনার্থীরা এই মারে-ঔ মারে। যাইহোক বহু কষ্টে মিটমাট হোল--লাইন সোজা হোল।
রাত সাড়ে তিনটায় বেরিয়ে ছিলাম--মায়া দর্শন পেলাম সাড়ে সাতটায়--পুণ্য অর্জন করতে হলে কষ্ট তো করতেই হবে।
--পূজো দিয়ে ফিরে এলাম --টিফিন খেয়ে আবার বেরোলাম--"কল্পতরু উৎসব"--দক্ষিনেশ্বরে মানুষের ঢল নামে--বহু আগে থেকে শোনা তা দেখতেই। বেলা দশটা --মূলমন্দির থেকে এক কিলোমিটার দূরে আদ্যাপীঠের দিকে দুইসারি লাইন--হাতে পূজোর ডালি-জুতোহীন পা-মাথায় চড়া রোদ। বিকেল চারটা --লাইন একই রকম--একটু ও এগোয়নি। না না এগিয়েছে --পূন্যার্থীরা অনেক দূর দূর থেকে আসছে। অন্যদিকে বিবেকানন্দ সেতুর উপর বালি অব্দি একটি লাইন।
রাত দশটা--মন্দিরের দু'টি পুকুরের চারদিকে দু'সারি লাইন। না আমি রাত জাগতে পারিনি। পরের দিন জানতে পারলাম-- ভোর তিনটে পর্যন্ত পূজো দিয়েছে।--ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব গলায় ক্যানসার নিয়ে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে তাঁর শিষ্য পরিবেষ্টিত হয়ে অবস্থান করছেন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি সমাধিস্থ হলেন। সমাধিস্থ অবস্থায় তাঁর শিষ্য-সাধু-সন্ন্যাসী-হিন্দু ভক্তদের স্পর্শ করলেন। --বললেন-"চৈতন্য হোক"। তাঁর স্পর্শ পেয়ে প্রত্যেকে আধ্যাত্মিক শক্তি উপলব্ধি করলেন। ভক্তরা উপলব্ধি করলেন--"ঠাকুর কল্পতরু" হয়েছেন। প্রত্যেকে ঠাকুরের আশির্বাদ পেয়েছেন।
--"সেই ১৮৮৬ সালে ১ লা জানুয়ারি"-ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজেই ঐ দিনটিকে "কল্পতরু দিবস" নাম দেন। ভক্তরা ঐ দিনটিকে "ঠাকুরের লীলা মাহাত্ম্যের দিবস" হিসেবে উপলব্ধি করেন।
দর্শনার্থীদের বিশ্বাস কল্পতরু উৎসবে ঠাকুর রামকৃষ্ণ এখনো-সমস্ত পুন্যার্থীদের আশির্বাদ করবেন।--
প্রতি বছর ১ লা জানুয়ারি হাজার হাজার পুন্যার্থীর সমাগম ঘটে দক্ষিনেশ্বর মন্দিরে। আগের রাতেই দূর দূর রাজ্য-জেলা থেকে দলে দলে মানুষ আসেন- ভোরবেলায় গঙ্গার জলে স্নান সেরে পূজোর ডালি হাতে নিয়ে মাতৃদর্শনে অপেক্ষা করেন।--এ যেন সম্মিলিত আশির্বাদ নেওয়া--ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবের নিকট থেকে। মা ভবতারিণীদেবীর ছোঁয়া প্রসাদীফুল নিয়ে ঘরে ফিরে যাওয়া। অপেক্ষা করা পরের বছরের জন্য। --


0 মন্তব্যসমূহ