পোস্ট বার দেখা হয়েছে
স্বামীজির মা ও মহাপ্রয়াণ
ডঃ রমলা মুখার্জী
কলকাতার সিমলের গৌর মুখার্জী স্ট্রীটে দত্তদের বিখ্যাত উকিল পরিবারে স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম। ওকালতি থেকেই দত্তদের যৌথ পরিবারের সমৃদ্ধি, আবার মামলা-মোকদ্দমার আবর্তে সব হারিয়ে ফেলা বিবেকানন্দের জীবনকে বিষময় করে তুলেছিল। শরিকি ঝগড়া-গণ্ডগোলের কালো ধোঁয়ার দূষণ থেকে বেরিয়ে অপার মুক্তির জগতে ঐশ্বরিক আনন্দে পৌঁছে যাবার জন্য চব্বিশ বছর বয়সে বিবেকানন্দ গৃহত্যাগী হয়েছিলেন। তাঁর আসল নাম বীরেশ্বর দত্ত, ডাক নাম বিলু। দত্তদের আসল বাড়ি ছিল বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার দরিয়াটনা গ্রামে। রামনিধি দত্ত, পুত্র রামজীবন ও পৌত্র রামসুন্দরকে নিয়ে কলকাতা চলে আসেন। রামসুন্দরের জ্যেষ্ঠপুত্র রামমোহন দত্ত ছিলেন নরেন্দ্রনাথ অর্থাৎ বিলুর প্রপিতামহ। তিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি ছিলেন ও প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। কিন্তু মাত্র ছত্তিশ বছর বয়সে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। রামমোহন দত্তের বড় ছেলে দুর্গাপ্রসাদ দত্ত বিবেকানন্দের পিতামহ ছিলেন এবং তিনি এটর্নি অফিসেই নিযুক্ত ছিলেন; তবে তিনিও পরে সন্ন্যাসী হয়ে যান। নরেন্দ্রনাথের বাবা বিশ্বনাথ দত্ত তাঁর কাকার কাছে খুব অনাদরে অবহেলায় বড় হন। বিশ্বনাথ দত্ত সাহিত্য-প্রেমিক ছিলেন। বাবা মা দুজনের সাহিত্য প্রতিভা থাকায় স্বামী বিবেকানন্দের সাহিত্য প্রতিভার সুন্দর বিকাশ তাঁর রচনাবলীর মধ্যে আমরা পেয়ে থাকি।
নরেন্দ্রনাথের দেহশ্রী যুবক বয়সে সুন্দর ও বলিষ্ঠ ছিল। তিনি প্রায় পাঁচফুট আট ইঞ্চি লম্বা ছিলেন, উজ্জ্বল শ্যামল চিক্কন ত্বক, চোখ দুটি ছিল দীর্ঘায়ত। পরিপূর্ণ গোল মুখমণ্ডলে খাঁজ বা টোলযুক্ত চিবুকটি তাঁর মুখশ্রীকে সুন্দরতর করে তুলেছিল। ঢেউ খেলানো বাবরি চুলে তাঁকে ভারি সুন্দর মানাত। অবশ্য সন্ন্যাস নেবার পর তিনি মুণ্ডিত মস্তকেই থাকতেন।
মৃতদেহ সৎকার করতে যুবক নরেন্দ্রনাথের প্রবল আগ্রহ ছিল। পরের উপকার করে বেড়ানোই ছিল যুবক নরেন্দ্রনাথের নেশা। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কথায় নরেন্দ্রনাথ "ধ্যানগোষ্ঠী" তৈরি করেছিলেন, মহর্ষি তাঁদের প্রত্যহ কিছু সময় ধ্যানশিক্ষা দিতেন।
শরীরের একদম যত্ন না করার জন্য এবং নানা জায়গায় ঘোরাঘুরি, অধিক পরিশ্রম ইত্যাদি কারণে পরবর্তীকালে আমরা দেখতে পাই বিবেকানন্দের শরীর ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিল। তাঁর পিতার হঠাৎ মৃত্যুতে পরিবারে নেমে আসে কালো মেঘ। মানসিকভাবে ক্লান্ত নরেন্দ্রনাথ সেই সময় সারাক্ষণ মাথার যন্ত্রণায় ভীষণ কাবু হয়ে পড়তেন, তার ওপর অনিদ্রা রোগ ছিল তাঁর চিরসাথি। সন্ন্যাস নেবার পর তিনি যখন কলম্বোতে তখন মধুমেহ (ডায়াবিটিস) রোগে আক্রান্ত হন। পেটের নানা গণ্ডগোলে স্বামীজিকে সারাজীবন বড়ই দুর্ভোগ ভোগ করতে হয়েছিল। শেষে হৃদরোগে তাঁকে একেবারেই কাহিল করে ফেলেছিল, মাত্র সাড়ে উনচল্লিশ বছর বয়সে, ১৯০২ খ্রীষ্টাব্দের ৪ঠা জুলাই এই হৃদরোগেই এই মহান সন্ন্যাসীর মহাপ্রয়াণ ঘটেছিল। ১৯০০ সালে স্বামীজি যখন সানফ্রানসিসকোয় তখন স্বামীজি নিউরোসথেলিয়া নামের স্নায়ুরোগে ভোগেন, এই সময় ওখানে ঐ রোগটির খুব প্রকোপ ছিল। নানান রোগে জর্জরিত স্বল্পায়ু স্বামীজির সান্নিধ্য আমরা খুব কম দিনই লাভ করার সুযোগ পেয়েছি, কিন্তু এত কম সময়ে তিনি কি করে এত কাজ করে গেলেন তা ভাবতেই অবাক লাগে। শুধু নিজের দেশেই নয় বিভিন্ন দেশে তাঁর সেই অমর ‘জীব প্রেমের’ মন্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছেন; রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপন, আরো কত সৎ কাজ যে করেছেন তাঁর কোন সীমা-পরিসীমা নেই।
বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র নয়নের মনি। তিনি ছিলেন সুন্দরী, সুগায়িকা, সুকবি ও শ্রুতিধর। বিবেকানন্দ মায়ের সব গুণগুলি পেয়েছিলেন। ভুবনেশ্বরীদেবী প্রচুর বই পড়তেন। বিলুর প্রাথমিক ইংরাজি শিক্ষাও তাঁর মা তাঁকে দিয়েছিলেন, কারণ বাড়িতে মেমসাহেব রেখে ভুবনেশ্বরী দেবী ইংরাজি শিখেছিলেন। কন্যাদেরও তিনি যথেষ্ট শিক্ষিত করেছিলেন।
ভুবনেশ্বরী দেবী শ্বশুরবাড়িতে কোনদিনই সুখ পাননি। নরেন্দ্রনাথের বয়স যখন মাত্র একুশ তখন তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। মেজভাই মহেন্দ্রনাথের তখন মাত্র পনেরো ও ছোট ভাই ভূপেন্দ্রনাথ মাত্র তিন বছরের। সন্তানদের অকাল মৃত্যু ছোট মেয়ে যোগীন্দ্রবালার আত্মহত্যা, আর্থিক অনটন, পুত্ররা বিবাহ না করার কারণে বংশ লোপের চিন্তা আর সর্বোপরি মামলা-মকোদ্দমায় জর্জরিত ভুবনেশ্বরী দেবী খুবই অসুখী ছিলেন। যৌথ পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়ে বিধবা ভুবনেশ্বরী দেবী ছেলেমেয়েদের নিয়ে উঠেছিলেন তাঁর মা রঘুমনি দেবীর কাছে। পরম বৈষ্ণব রঘুমনি দেবীর আদরে এমন কি দিদিমা রঘুমনির দেবীর মা রাইমনি দেবীর সান্নিধ্যে নরেনরা লালিত পালিত হয়েছিলেন। বিবেকানন্দ বন্ধুদের বলতেন, “আমি কি অমনি হয়েছি, আমার জন্য আমার মা কত তপস্যা করেছেন।” তিনি আরও বলেছেন, “আমার বিকাশের জন্য আমি মায়ের কাছে ঋণী।” ছেলেকে ভুবনেশ্বরী বলতেন “আজীবন পবিত্র থাকিও, নিজের মর্যাদা রক্ষা করিও।” মায়ের কথা, মায়ের শিক্ষা বিবেকানন্দের প্রতি পদক্ষেপের দিশা। তাই তো বিবেকানন্দের মুখে আমরা মাতৃপূজার সেই মন্ত্র শুনতে পাই, “যে মাকে সত্য সত্য পূজা করতে না পারে, সে কখনও বড় হতে পারে না।”

0 মন্তব্যসমূহ