দর্পণ || ইপত্রিকা ২০২১ || ১৩ তম সংখ্যা || নিবন্ধ - সাবিত্রী জানা ষন্নিগ্রহী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

আমেরিকায় স্বামীজী স্মৃতি

সাবিত্রী জানা ষন্নিগ্রহী


১৮৬৩ সাল, ১২ই জানুয়ারি -বাংলা ১২৬৯, ২৯ শে পৌষ। পৌষসংক্রান্তি-তিথি- কৃষ্ণা সপ্তমী জন্ম নিলেন বিলে। রামকৃষ্ণ দেবের নরেন। ১৮৮১ সালে রামকৃষ্ণ দেবের সাথে নরেনের প্রথম সাক্ষাৎ হোল। ১৮৯৩ সাল-স্বামীজী আমেরিকায়। সন্ন্যাসী বেশে-তরুণ সন্ন্যাসী-ভারতের প্রতিনিধি - শিকাগো ধর্মসভায়  "সনাতন হিন্দুধর্মের" -মাহাত্ম্য প্রচার করবেন। প্রচার করবেন-"সর্বধর্মের সহনশীল হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব"-আপামর ভারতের প্রতিনিধি "স্বামী বিবেকানন্দ"।

১৮৯৩ সাল, ১১ই সেপ্টেম্বর  শিকাগোর "আর্ট ইন্সটিটিউট" --এ বসেছে"দি পার্লামেন্ট অফ ওয়ার্ল্ড রিলিজিওন"-বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলন"। গেরুয়া পোষাক পরিহিত এক তরুণ সন্ন্যাসী আরম্ভ করলেন তাঁর বক্তব্য। আমেরিকাবাসীর উদ্দেশ্যে সম্বোধন করলেন-- "Sisters & brothers of America"----আমার আমেরিকাবাসী ভাইবোনেরা। শ্রোতামন্ডলীর আনন্দধারা ও করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠলো সভালয়‌। স্বামীজীর এই সম্বোধনের মধ্যে লুক্কায়িত ছিল "সর্বধর্ম ও সর্বজাতির প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি-ভালোবাসা-

সমত্ববোধ"।------

১৮৯৫ সালে ইংল্যান্ডে প্রচার করলেন হিন্দুধর্মের মাহাত্ম্য। ---ফিরে এলেন ভারতে। মাদ্রাজ থেকে স্টীমারে কলকাতার আলমবাজার মঠে। ১৮৯৮ এর ৯ই ডিসেম্বর হাওড়া জেলার বেলুড়ে প্রতিষ্ঠা করলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবকে। স্থাপন করলেন রামকৃষ্ণ মঠ-১৮৯৯ সালের ১লা মে।

আবার বেরিয়ে পড়লেন ধর্ম প্রচারে-উত্তর ভারত‌। আবার গেলেন আমেরিকা -দ্বিতীয়বার। -----ফিরে এলেন ভারতে। শরীর ভেঙ্গে যাচ্ছিল। ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই -বেলুড়মঠে নিজগৃহে সমাধি লাভ করেন।

---------

আমাদের প্রাইমারি স্কুলের মাষ্টারমশাই স্বামী বিবেকানন্দের আত্মত্যাগের গল্প শোনাতেন। পরে বড় স্কুলে লেখানো হোত স্বামীজী রচনা, পড়ানো হোত জীবনাবলী। বাংলা ক্লাসে যে না পড়া পারতো তাকে দিদিমনি শাস্তি না দিয়ে স্বামীজীর বানী শোনাতেন। আমরা সবাই শুনতাম। 

"ওঠো-জাগো, "হে ভারত ভুলিও না তোমার নারী জাতির আদর্শ", "সাফল্য লাভ করিতে হইলে প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকা চাই"। শোনাতেন-ব‍্যাখ‍্যা করে বলতেন স্বামীজীর যুবশক্তির প্রতি আহ্বান -আলস‍্য ত‍্যাগ ক'রে কর্মে উদ্দীপ্ত হওয়ার বানী। যুবশক্তিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন শরীরচর্চার দ্বারা নিজেকে দৃঢ় করে তোলার অঙ্গীকার।

স্বামীজীর জীবনী আমার মনে ছাপ ফেলেছিল সেই শৈশব থেকেই। মনে মনে আওড়াতাম স্বামী বিবেকানন্দের বানী। যেখানেই যেতাম স্বামীজীর জীবনী লেখা ছোট ছোট বই কিনতাম-অবসর সময় পড়তাম। বেলুড়-দক্ষিনেশ্বর দেখার খুব ইচ্ছে জাগতো মনের মধ্যে। গ্রামের মেয়ে --কলকাতা যাওয়া কিভাবে হবে? না-- সুযোগ পেয়ে গেলাম। বিশ্বববিদ‍্যালয়ে পড়ার সময় বড়দাদা সব দেখিয়ে দিলে। ---বহু বছর কেটে গেছে স্বামীজীর বানী হৃদয়ে নিয়ে। পরিদর্শন করলাম গোলপার্কের রামকৃষ্ণ মিশন কালচারাল সোসাইটি। যেখানেই বেড়াতে গিয়েছি সময় সুযোগ থাকলে স্বামীজী বিজড়িত মিশনে প্রণাম করে এসেছি। উল্লেখযোগ্য --ত্রিপুরা, কুলুমানালী, গঙ্গাসাগর।------

তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর।

---আমাদের স্কুলের হোস্টেলে একটি গান গাওয়া হোত। তার একটি লাইন আমার মনে খুব দাগ কেটেছিল---'"'বিখ্যাত সেই চিকাগোর কথা--হিন্দুধর্ম প্রচারিলে সেথা""--মনে মনে গাইতাম আর কল্পনা করে নিতাম --স্বামীজী জাহাজে চলেছেন ----আমেরিকায় বক্তব্য রাখছেন। কিন্তু কখনো ভাবিনি আমেরিকা যেয়ে স্বামীজীর স্মৃতিচিহ্ন দেখতে পাবো।

--ছোটছেলে আমেরিকা যাওয়ার আমন্ত্রণপত্র পাঠালো। বললাম যাবো -তবে আমাকে "আমেরিকায় স্মামীজী বিজড়িত কোন স্মৃতিচিহ্ন দেখাতে হবে"। ছেলে মুখে কিছু বললো না। আমন্ত্রণপত্র সহ সমস্ত কাগজপত্র ভিসা অফিসে জমা দেওয়ার দশদিনের মধ্যে ভিসা মঞ্জুর হয়ে গেল-আমার আর আমার স্বামীর। চেপে বসলাম ফ্লাইটে দোহামুখী। কলকাতা থেকে দোহা, থেকে শিকাগো। --বারোঘন্টা দিনের আলো-আকাশে আকাশে কাটলো-শিকাগোতে নামলাম তখনো দিন। সকাল আটটা। ফ্লাইটে চড়া রোদে পর্দা টেনে ঘুমোবার চেষ্টা। ঘুম আসবে কেন! ভেতরে ভেতরে উৎসাহিত আমি আমেরিকায় স্বামীজীর স্মৃতি দেখবো --আর কত দেরী!! কখন দেখতে পাবো? আর সেটা গানের কলি মনে মনে আওড়াচ্ছি--বিখ্যাত সেই চিকাগোর কথা, হিন্দুধর্ম প্রচারিলে যেথা।

--শিকাগোয় নেমে ঐদিন পুরো বিশ্রাম। পরদিন "মিচিগান লেক" অভিমুখে চলেছি আমরা। গাড়ি পার্ক করে হেঁটে হেঁটে ঘোরা হবে। হাঁটতে হাঁটতে ছেলে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো---বললো দেখে নাও স্বামীজীর স্মৃতি। রাস্তার উল্টোদিকে একটি বিশাল বাড়ি। বাড়ির পাশে একটি লোহার মোটা খুঁটির সাথে একটি প্লেট লাগানো। তাতে লেখা আছে ---Honorary

"SWAMI VIVEKANANDA" way. আমি খুঁজে পেয়েছি আমার  আশৈশব স্বপ্নের চাওয়া --আমেরিকায় স্বামীজী স্মৃতি। আমেরিকায় আমি আরো অনেককিছু দেখেছি। মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা "অব‍্যক্ত চাহিদা পূরণ"---আমার বিদেশ ভ্রমন সার্থক করেছে --প্লেটের উপর স্বামীজীর ঐ নামটি দেখে।

---১২ই জানুয়ারি দিনটিতে আমরা শ্রদ্ধায় আপ্লুত হয়ে নতমস্তকে স্মরণ করি বিবেকানন্দ বানী-তাঁর কর্মধারা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ