পোস্ট বার দেখা হয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের জীবন বোধ ও সমাজে তার বাস্তবায়ন
বিষয় ভাবনা -দেবলীনা চক্রবর্তী
"My ideal, indeed can be put into a few words, and that is to preach unto mankind their divinity, and how to make it manifest in every moment of life."
একজন অসাধারণ মণিষীর কথার মতই কথা। কথার জালে লোককে মুগ্ধ করা নয়, মানুষ গড়া ও তাদেরকে সর্বতোভাবে সমাজের উপকারের জন্য তৈরী করাই ছিল স্বামী বিবেকানন্দের ব্রত। একজন পশ্চিমী অনুরাগী একসময়ে তাঁর সম্বন্ধে উক্তি করেছিলেন যে-- স্বামী বিবেকানন্দ বয়সে নবীন কিন্তু জ্ঞানে প্রাচীন এবং শাশ্বত তাঁর জ্ঞান- 'young in age- but eternal in wisdom'. স্বামী লোকেশ্বরানন্দ বলেছিলেন, যদি আমরা এই স্বর্গীয় আনন্দময় উক্তিটির আক্ষরিক অর্থও ধরি, তাহলেও স্বামী বিবেকানন্দের জীবনদর্শনের প্রাসঙ্গিকতা আজও বর্তমান। তাঁর জীবন ছিল খুবই স্বল্প, ৪০ বত্সরেরও কম তিনি বেঁচে ছিলেন। তিনি মহাসমাধিতে চলে গেলেন বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়াতে, ৪-ঠা জুলাই ১৯০২ সালে। তার পরে দুটো বিশ্বযুদ্ধ ঘটে গেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার প্রভূত উন্নতি ঘটেছে। তার ফলস্বরূপ সারা পৃথিবীতে আসে এক নতুন পরিবর্তন, মানুষের সামগ্রিক চরিত্রেরও বদল হয়-- তাদের জীবনযাপনের ধারা, জীবনের আদর্শের দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যেও আসে পরিবর্তন। বিবেকানন্দ ভারতের ভবিষ্যতের কথা তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি দিয়ে বুঝেছিলেন। তিনি বলেছিলেন আগামী পঞ্চাশ বত্সরের মধ্যেই ভারত এক অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা লাভ করবে। সত্যিই তা হয়েছিল। তাঁর এই দূরদর্শিতা আমাদের অভিভূত করে আজও ।
এই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেও দিয়েছিলেন যে পৃথিবীর আর পাঁচটা দেশের মত ভারতও অনেক সমস্যার সাম্মুখীন হবে।
তাঁর শিক্ষা এই ভবিষ্যদ্বাণীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি কী ভাবে সেই সব সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে তাও বলেছিলেন। তিনি জোর দিয়েছিলেন-- মানুষের আত্মবিশ্বারের উপর। সঠিক আত্মবিশ্বাসী মানুষ সব বাধাই জয় করতে পারে।
'Man making is my mission', —তিনি বলতেন। সত্যিই একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার জনসাধারণের উপর-- তারা কতটা ভালো করে গড়তে পারে নিজেদের, কতটা বুদ্ধি ও কার্যক্ষমতার অধিকারী তারা, কতটা সচেতন তারা দেশের ও দশের ব্যাপারে-- এ সবই বলে দেয় একটি দেশ কতটা উন্নত। একটি দেশ দু-চারজন মণিষীর জন্ম দিতেই পারে, কিন্তু তাতে দেশটির সমগ্র জনসাধারণ সম্পর্কে কোন ধারণাই করা যায় না এবং তাতে দেশটির সামগ্রিক উন্নতি বা কল্যাণও হয় না। স্বামীজি তাই বলতেন একটি দেশের সাধারণ মানুষের মান উন্নত না হলে সে দেশকে মহৎ বা সর্বোন্নত বলা চলে না। তিনি বলতেন একজন বুদ্ধদেব বা একজন যীশুখ্রীষ্ট দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে না। ইতিহাস বলে সাধারণ মানুষই পৃথিবীর সর্বত্র দেশের ভাগ্যনিয়ন্তা। এই সাধারণ মানুষকে অবজ্ঞা করা, তাদের বঞ্চিত করা যা প্রাপ্য তা থেকে, তাদের অশিক্ষার অন্ধকারে রাখা একটি জাতীয় মহাপাপ-- স্বামীজির মতে। একটি দেশের যত দুঃখ, দুর্দশা সব এই কারণেই ঘটে। তিনি বলতেন এই জনসাধারণ অসীম ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু কখনই তাদের সুযোগ দেওয়া হয় নি অথবা আজও হচ্ছে না।
তিনি ভারতের অবস্থার উন্নতির জন্য কোন হিংসাত্মক বিপ্লব চাইতেন না। তিনি চেয়েছিলেন ক্রমপরিবর্তনের মাধ্যমে সাম্যাবস্থা আসুক সমাজে।
তিনি বলতেন-- 'a process of levelling up' এবং 'no levelling down'। তাঁর মত-- শ্রমিকশ্রেণী সব রকম সুযোগ সুবিধা পাক ও নিজেদের উন্নত করে দেশের উঁচু শ্রেণীর বা বিদ্বজনদের সমকক্ষ হয়ে উঠে জাতির চরিত্র গঠনকে শক্ত করে তুলুক ও জাতিকে, দেশকে ক্রমঃ উন্নতির পথে নিয়ে যাক। এই উপেক্ষিত অবহেলিত শ্রেণীকে যত শীঘ্র সম্ভব শিক্ষার আলো দিতে হবে তাদের অপূর্ণতা দূর করতে।
তিনি আশা করতেন সমাজের উঁচুতলার লোকেরাই পরিবর্তন আনবে সমাজের অবহেলিত শ্রেণীর উন্নতি সাধনের জন্য। এটাকেই তিনি ভারতের জাতীয় আদর্শ হওয়া উচিত বলে মনে করতেন। উঁচু শ্রেণী তাদের আত্মসুখ ত্যাগ করে কাজ করবেন, শিক্ষার আলো জ্বালবেন ঘরে ঘরে, দুঃখীর পাশে দাঁড়াবেন, নিরন্নকে অন্ন দেবেন-- এই ছিল তাঁর আশা-- এই আশা বুকে নিয়েই তিনি গড়ে তুলেছিলেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। এই মঠ ও মিশন আজও বিবেকানন্দ নির্দেশিত পথে সেবার কাজ করে চলেছে অক্লান্তভাবে পৃথিবীর সর্বত্র।
পরিব্রাজক হিসেবে তিনি যখন ভারতের প্রতিটি প্রদেশে, গ্রামে গেছেন, তিনি জনগণের দুঃখ, দুর্দশা দেখে বড়ই কাতর হয়ে পড়তেন। এই সমস্যার সমাধানে তিনি বলতেন —
'দারিদ্র দূর করতে পশ্চিমকে অনুসরণ কর, কিন্তু তার আর কিছু নকল কোরো না'
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নতি ও ব্যবহারই একমাত্র পথ গরিবী সমস্যা দূরীকরণে। পশ্চিম থেকে বিজ্ঞান ও কারিগরী শিক্ষা নিতে হবে এবং তা প্রয়োগ করে মানুষকে এই অর্থাভাব দূর করে নিজের ও সমাজের উন্নতি করতে হবে। এই ছিল তাঁর অটুট বিশ্বাস।
ভারতের নারীদের উদ্দেশ্যেও তিনি একই কথা বলেছেন, যা পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলেভারত একজন পুরুষকে চায় না, চায় একজন শক্তিময়ী নারীকে যিনি হবেন প্রকৃতিতে এক সিংহিনীর মতই-- ভারতীয়দের জন্য যিনি সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করবেন-- আত্মার কোন পুরুষ- নারী ভেদাভেদ নেই। ভারতের সর্বাঙ্গীন প্রগতির জন্য চাই হাজার হাজার পুরুষ ও হাজার হাজার নারী, যারা উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে কন্যাকুমারী পর্যন্ত, নর্থ পোল থেকে সাউথ পোল-- সারা পৃথিবীময় আগুনের মত ছড়িয়ে পড়বে স্বার্থহীন ভাবে সেবামূলক
কাজ, দেশ গঠন, চরিত্র গঠনের কাজে। অলসতার কোন স্থান নেই, সময় নষ্ট করারও সময় নেই---”
ধর্ম বা religion সম্বন্ধে তিনি বলেছেন-- ধর্ম হচ্ছে সেই ধারণা যা পশুসুলভ মনোভাবকে মানবিক বোধে উন্নীত করে, প্রকৃত মানুষ তৈরী করে, এবং মানুষকেই ভগবানরূপে প্রতিভাত করে।
'Religion is the idea which is raising the brute unto man and man unto God.'
স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর গুরু শ্রী রামকৃষ্ণ
এই দুই মহাপুরুষের মিলন গড়ে তুলেছিল এক অবিশ্বাস্য আন্দোলন। যুগাবতার শ্রী রামকৃষ্ণ দিব্যচোখে খুঁজে পেলেন নরেন্দ্রের মধ্যে তাঁর মন্ত্রশিষ্যকে যে ঘরে ঘরে, দেশে দেশে "যত মত তত পথ" বাণী, ভালোবাসার বাণী, সেবাব্রতের কথা প্রচার করবে। বেদান্তের কথা ও আদর্শকে পাশ্চাত্ত সমাজে তুলে ধরে, ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্ম সম্পর্কে ধারণাকে তার হৃত গৌরব ফিরিয়ে দেবে।

4 মন্তব্যসমূহ
উত্তরমুছুনমুগ্ধ হলাম
ধন্যবাদ ❤️
মুছুনঅপূর্ব লেখা দেবলীনা
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো
ধন্যবাদ দিদি❤️
মুছুন