পোস্ট বার দেখা হয়েছে
রোমহর্ষক কাহিনী
ভেলোর দুর্গে কান্নার সুর
সাবিত্রী জানা ষন্নিগ্রহী
সেই ২০০১ সাল--ছেলেটা মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হচ্ছে একাদশ শ্রেণীতে মাধ্যমিকে ভালো ফল করেছে--সারা বাংলায় দ্বাদশ স্থান। যদি ও আরো ভালো পরীক্ষা দিয়েছিল। সে যাই হোক--পরীক্ষক তো জানেন কোন খাতায় কত নম্বর দিতে হয়। বায়োলজিতে খুব খারাপ নম্বর এসেছে। মায়ের বিষয়--খুব মন খারাপ। একাদশ শ্রেণীতে বায়োলজি রাখবে না-- এমন পণ করে বসলো ছেলেটা। গ্রামের স্কুল--আর কি বিষয় বা পাবে। মন খারাপ নিয়েই ছেলেটা সেদিন গাঁয়ের স্কুলেই ভর্তি হচ্ছে। মায়া ও মন খারাপ। ঐ মন নিয়েই ডাস্টার-চক্- অ্যাটেন্ডেন্স খাতা হাতে নিয়ে ক্লাসে যাচ্ছে-- বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখা আছে ছাত্রদের সাইকেল। সেই সাইকেলের হাতলে শাড়ির আঁচল লেগে মা গেলে পড়ে। ডান হাঁটু গেল উল্টোদিকে উল্টে--ঠিক নব্বই ডিগ্রী।
---এটি আমার গল্পের ভূমিকা।---তারপর কেটে গেছে অনেক বছর। মাঝে মাঝে ব্যাথা করে।--- ছোটছেলে জোর করে ভেলোরে ডাক্তারের অ্যাপোয়েনমেন্ট---ট্রেনের রিজার্ভেশন করে দিয়েছে। -ভেলোরে ডাক্তার দেখানোর জানান কয়েকদিন হাতে নিয়ে যেতে হয়। তাই হোল। সূঁচে রক্ত টানা--রশ্মির সামনে টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে হাড়ের চিত্র--কত কিছু প্রোগ্রাম থাকে। এর ফাঁকে ফাঁকে বেরিয়ে যাওয়া ছোট ছোট টিলা পাহাড় ঘেরা উষ্ণ--স্থান ভেলোরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। ---যানবাহন- ও গাইড- অটো ভাই। প্রথম দিন নিয়ে গেল ভেলোরের "স্বর্ণ মন্দির"--লক্ষ্মীমন্দির। সারাদিন ওখানেই কাটলো। পরেরদিন ভেলোর ফোর্টদুর্গ। দুর্ভেদ্য দুর্গ-- চারদিকে গভীর জলাশয়--কালো জলে দূর্গের ছায়া। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দূর্গের ভেতরের সব দেখা যায়। দূর্গের গায়ে অসাধারণ কারুকাজ। মাঝে মাঝে শ্বেত মূর্তি বসানো। দূর্গের গেটে ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অনুসন্ধানমূলক বোর্ডে গড়ের কিছু পরিচয় পাওয়া গেল। বিজয়নগর রাজ্যের রাজা বিজয়নগর এই দূর্গ তৈরী করেন। পরবর্তীকালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের কাজকর্ম চালাতেন। দূর্গের মাঝে আছে এক বিশাল মন্দির। "জলকন্টেশ্বর মন্দির"--- শিবমন্দির। মন্দিরের গেট অন্যদিকে---
যাইহোক দূর্গের উপর থেকে নেমে চতুর্দিক দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে এগোতে লাগলাম। দূর্গের ভেতরে কবরস্থান। জানতাম না ওটা কবরস্থান। কাঁটা- ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে সরু একটি গলি। গলিটা চলে গেছে কবরস্থানের দেওয়াল পর্যন্ত। বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছি--এক যুবা ঘুপচি ঘর থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞেস করলো কোথায় যাবেন? আমি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম-- ঐ যে গম্বুজ ঘরটি দেখতে যাবো। মাথা নেড়ে ঈঙ্গিত করলো না--হাত দেখিয়ে ফিরে যেতে বললো। আমার আরো কৌতূহল হোল--কি আছে ওখানে দেখতে দিল না। আশেপাশে কয়েকটি ঘুপচি ঘর--দেখে মনে হোল অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার। ছেলেটি ভেতরে ঢুকে গেল। আমি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে এগোতে লাগলাম। ---সূর্য দূর্গের জল রাঙিয়ে দিয়ে চলেছে দূরদেশে-- সন্ধ্যে নামতে খুব দেরী নেই। ---হঠাৎ দুম্ করে পড়ে গেলাম। ভাবলাম বোধহয় কোন লতায় আঙ্গুল লেগে পড়ে গেছি। উঠে চারদিক দাঁড়িয়ে-- তাকিয়ে দেখলাম -- না তা তো নয়। একটু এগোবো--সেই আঘাত লাগা হাঁটু তো আর নড়ছে না।---এই রে কিভাবে উপরে উঠবো? ছেলেটা আবার বেরিয়ে এসেছে। ভয় করছে--মুখে কিছু বলতে পারছি না। ছেলেটি বেশ রাগতঃ মুখে এগিয়ে এলো। আমি আমার অবস্থা ঈঙ্গিতে বোঝালাম।--এসেছে আমার হাত ধরে উপরে তুলে দিয়ে গেল। দেখিয়ে দিল--দেখিয়ে দিল পা টা কিভাবে নাড়াচাড়া করলে ঠিক হবে।--
আমি এক শশ্মান পুরীর দিকে এগোচ্ছিলাম। দূর্গের উপর থেকে গম্বুজের মতো যেটি দেখেছিলাম সেটি কবরখানা।---অটোভাই গল্পটি বলেছিল---ঐ দূর্গের ভেতর কবর দেওয়া হয়েছিল "মহীশূরের রাজ্যের শাসনকর্তা টিপু সুলতানের"- পরিবারবর্গ ও সন্তান সন্ততিদের। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি টিপু সুলতানকে হত্যা করে তাঁর আত্মীয় স্বজনদের বন্দি করে এনে ঐ গড়ের ভেতর আটকে রাখে। পরে গনহত্যা করে কবর দেয়। ঐ নিষিদ্ধ জায়গা কবরস্থান। ---সূর্য ডোবার সাথে সাথে অতৃপ্ত আত্মারা জেগে ওঠে। সারারাত কেঁদে বেড়ায়। কেউ ধারেপাশে যেতে পারে না। এমনকি দূর্গের গেট ও বন্ধ হয়ে যায়। প্রহরীরা ও যে যার বাড়ি ফিরে যায়।-- -আমি বললাম আমার পায়ের অবস্থার কথা। ---আতঙ্কিত হয়ে বললো--- জোর বাঁচা বেঁচে গেছেন। --কেউ কেউ ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছিল ----নাকি আর ফেরেনি।
---জিজ্ঞেস করলাম---ঐ যে ঘুপচি ঘুপচি বাড়িগুলো!!! ওদের ভয় করে না??
ওরা তো ওখানে স্থায়ী বাসিন্দা নয়। কবরের আশেপাশে মোমবাতি জ্বালিয়ে ওরা শহরে ফিরে যাবে। ওরা নাকি টিপু সুলতানের বংশধর।---
---পা টা রাতে একটু বেশী রকম ব্যাথা হয়েছিল। ডাক্তারবাবু ২১ দিনের ঔষধ দিয়ে বললেন ---পায়ের কোন অসুবিধা হবে না।----
না আর কোনদিন পায়ে অসুবিধা হয়নি।
----এখনো ভাবি--- ডাক্তারের ঔষধ না অশরীরী আত্মার ঠেলায় হাঁটু আর ব্যাগড়া দেয়নি।

0 মন্তব্যসমূহ