দর্পণ || একাদশ সংখ্যা || প্রসঙ্গ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় - কবি মৃণাল বসুচৌধুরী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

"প্রসঙ্গ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় "

আলোচনায় বিশিষ্ট কবি মৃণাল বসু চৌধুরী

প্রশ্ন : মঙ্গল মিদ্যা 

১।। প্রশ্ন : - সৌমিত্র বাবু কোনটা খুব বেশি পছন্দ করতেন অভিনয় নাকি সাহিত্যচর্চা ?

উঃ।। এ প্রশ্নের উত্তর  তিনিই দিতে পারতেন  বোধহয় । তবে আমরা জানি  কৈশোর  থেকেই কবিতা লিখতেন তিনি ।  আবার ছোটবেলা থেকে বাবার অভিনয় দেখে দেখেই তাঁর অভিনয়কে ভালোবাসা । মাত্র  ২২ বছর বয়সে তিনি শ্রদ্ধেয় শিশির কুমার ভাদুড়ী র প্রফুল্ল’ নাটকে  অভিনয় করার  সুযোগ পান। ১৯৫৮ সালে অর্থাৎ২৩ বছর বয়সে তিনি অভিনয়ের সুযোগ পেলেন শ্রদ্ধেয় সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘অপুর সংসার এ । পরের সবকিছু ইতিহাস । 

আমরা জানি , কলকাতার  সিটি কলেজ থেকে প্রথমে আই এস সি, পরে বি এ অনার্স পাশ করে , পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ অফ আর্টস  এ  পড়াশোনা করেন দু’ বছর ।  ওই  সময়েই আলাপ হয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ।শুরু হয় কফি হাউসে যাতায়াত ,আড্ডা ।  কিশোরবেলা থেকে  কবিতার প্রতি  ভালোবাসার টান তো ছিলই । কফি হাউসের আড্ডায় ,কাব্যিক পরিমণ্ডলে তা বাড়তে থাকে ক্রমশই । বন্ধু নির্মাল্য আচার্য এবং তাঁর যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশ পায় ‘এক্ষণ’  । 

কবিবন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উৎসাহে কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াবো বলে’ প্রকাশিত হয়েছিল১৯৭৫ সালে । এই কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ  এঁকেছিলেন  শ্রী সত্যজিত রায় ।

শুধু অভিনয় নয় , পাশপাশি সাহিত্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসা স্পষ্ট তাঁর জীবনচরিতে ।

২ ।। প্রশ্ন : - সৌমিত্র বাবু একজন সফল ও ব্যস্ত অভিনেতা হবার পরেও বাংলা সাহিত্যের প্রতি এতো টান -আপনার মতে এর থেকে আমাদের সকলের কি কি শিক্ষা নেওয়া উচিত ?

উঃ।। অভিনয় ,সাহিত্য ,নাট্য নির্দেশনা , আবৃত্তি , সমস্তই ছিল তাঁর সাধনা ।  প্রতিটি বিষয়ে তিনি ছিলেন সমর্পিত ।

সাধনা এবং সমর্পণ ছাড়া  কোনকিছুতেই সফল হওয়া  যায় না । প্রায় ৩০০ ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি । 

সৃষ্টি করেছেন সাহিত্য । কবিতাসমগ্র ,১৪ টি কবিতার বই ,দুই খণ্ড গদ্যসমগ্র , তিনটি  নাটক সমগ্র  প্রকাশিত হয়েছে । এ ছাড়া নাটক নির্দেশনা মঞ্চে অভিনয় ,আবৃত্তি সবই করেছেন সমান নিষ্ঠায় ।

ব্যস্ততা তাঁর সৃষ্টির পথে বাঁধা হয়নি কখনো ।  কাজ, নিরন্তর কাজ করে  যেতেন তিনি । বলতেন ‘ কাজই যদি না করতে পারি বেঁচে থেকে কী লাভ ? এটাই শেখার ।

৩ ।। প্রশ্ন : - আচ্ছা দাদা, সৌমিত্র বাবুর লেখার মধ্যে আপনি কি কি গুন ও বৈশিষ্ট্য দেখতে পান ?

উঃ ।। তাঁর সৃষ্টি নিয়ে আলোচনার ধৃষ্টতা আমার নেই । প্রথম পাঠে ভালো লাগাটাই আমার কাছে মুখ্য । সমাজ , সমকাল , প্রতিবাদ এবং ব্যক্তিচেতনা  তাঁর কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে ।পরিশুদ্ধ আবেগ এবং প্রকাশভঙ্গির

সারল্য তাঁকে পাঠকপ্রিয় করেছে বলেই আমার বিশ্বাস । বাংলাদেশের একটি দৈনিকে  এই প্রবাদপ্রতিম  মানুষটির কবিতা ও তাঁর গদ্য নিয়ে সামান্য কিছু কথা  লিখেছি ।এখানে সে সুযোগ নেই । তাই পাঠকদের অনুরোধ করবো তাঁর কবিতা পড়তে ।

তাঁর ‘মানিকদার সঙ্গে ‘ এবং ‘প্রতিদিন তব গাথা ‘  বই দুটি আমার খুব প্রিয় ।প্রথমটি শ্রী সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাটানো দীর্ঘ সময়ের  নানা ঘটনা নিয়ে লেখা  ।  পরিচালক ও  অভিনেতা দুজনকেই চেনা যায় নতুনভাবে।

দ্বিতীয়টি   কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে তাঁর মুগ্ধ অনুভব । অসাধারণ ।

৪।। প্রশ্ন : - "সৌমিত্র বাবুর গলায় কবিতা পাঠ" -কথাটা শুনলে আপনার কেমন লাগে ?

উঃ।। এই বাক্যবন্ধ আমার পছন্দ নয় ।   তাঁর কণ্ঠে আবৃত্তি শুনেছি অনেক । ঘোষকের এমন উচ্চারণ শুনিনি ।

৫ ।। প্রশ্ন : - সৌমিত্র বাবু কী যথাযগ্য সম্মান পেয়েছেন -আপনার মতে কি বলে ?

উঃ।। সত্তরের দশকে তাঁকে পদ্মশ্রী  দেওয়ার কথা হলেও তিনি তা গ্রহন করেন নি ।২০০৪ সালে পদ্মবিভূষণ উপাধি তে ভূষিত হন তিনি । ২০০৮ সালে ‘পদক্ষেপ’ ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ।

এর আগেও ১৯৯২ এবং ২০০১ সালে তাঁকে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয় জাতীয় স্তরে । নাটকের জন্য পেয়েছেন সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার । ২০১২ সালে পেয়েছেন দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার । তালিকা এখানেই শেষ নয় ।ফ্রান্স থেকে পেয়েছেন ‘ কিন্তু আমার মনে হয় জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার তিনি পেয়েছেন তাঁর ছবির অগণিত দর্শকদের , অনুরাগীদের ভালোবাসায় । তাঁর সাহিত্যের পাঠকদের অমলিন মুগ্ধতাই তাঁর আসল পুরস্কার । 

আমাদের  এই  কিংবদন্তী নায়কের হয়ত আরও কিছু  পাওয়ার  ছিল ,দিতে পারিনি আমরা । কিন্তু প্রকৃত শিল্পী ও সাহিত্যিকরা কখনোই বোধহয় তাঁদের যোগ্য সম্মান  পান না   জীবনকালে । জীবনানন্দের কথা ভাবুন ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ