পোস্ট বার দেখা হয়েছে
সারদা দেবী ও ডাকাত ভিখদাস—
প্রচলিত কিংবদন্তি
(২২শে ডিসেম্বর শ্রীমায়ের জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি)
কলমে অলিপা পাল
জয়রামবাটী গ্রামের কাছে শিরোমণিপুরের মুসলমান সম্প্রদায়,যাদের পেশা ছিল চুরি বা ডাকাতি—তাদের নিয়েও যেন শ্রীমা নীরবে একটি সংশোধনাগার নির্মাণ করেছিলেন ৷
তাঁর এই মনোভাব শুধু আবেগপ্রসূত ছিল না,এর পিছনে ছিল অর্থনৈতিক বাস্তবতা ৷
ব্রিটিশ শাসনের ফলে বাংলার বহু অঞ্চলের উর্বর মাটিতে নীলচাষ শুরু হয় ৷নীল উৎপাদন ব্রিটিশ ব্যবসায় মুনাফা সৃষ্টি করলেও জমির উর্বরতাকে নষ্ট করে দিত ৷শিরোমণিপুরের মুসলমান সম্প্রদায় রেশম শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ৷এপ্রসঙ্গে জয়রামবাটী অঞ্চলের ভৌগোলিক দিকটির দিকে তাকালে দেখা যায়—এমন একটি অঞ্চল,যে অঞ্চলের কিছু পরেই শুরু হচ্ছে ছোটনাগপুরের মালভূমি ও তারপর বাঁকুড়ার জয়পুরের বিখ্যাত জঙ্গল !লাল মাটি'র উঁকিঝুঁকি !রাঙা পলাশ, শাল পিয়ালের সাথে কুল ও অর্জুন !কুল গাছে গুটি তৈরী হয় যার থেকে উৎপাদিত হয় রেশম বা সিল্ক ৷ বিদেশি শাসকের নীলচাষ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে দিলে ধ্বংস হয় রেশমশিল্পের ৷ অবস্থাপন্ন মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামগুলি অনাহারে দিন কাটাতে লাগল ৷নিরুপায় হয়ে তারা চুরি ডাকাতি শুরু করল ৷শ্রীমা কেবল তাদের দয়া দেখালেন না—ঘরামির কাজ দিয়ে,তাদের উঠোনের ফলন্ত সব্জি কিনে তাদের স্বাভাবিক উপার্জনের পথ ও সুস্থ জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন ৷
আরামবাগ অঞ্চলে ভিখদাস যে দুর্দান্ত ডাকাত ছিলেন তা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত ৷বর্গীর হাঙ্গামার পর মারাঠা দস্যু'রা স্বদেশে না ফিরে আরামবাগে দামোদর ও রূপনারায়ণের মধ্যবর্তি স্থানে বসবাস করে ৷ অঞ্চলটি এতটাই সমৃদ্ধছিলো যে Granary of Bengal বলা
হত ৷এই স্থান সহ সম্পূর্ণ বঙ্গদেশে ক্রমশ বিভিন্ন দলে ছড়িয়ে যায় ডাকাত'রা,শুরু হয়
অত্যাচার ও লুটপাট ৷এই সব দলের দলপতিদের নাম এখন প্রসিদ্ধ সে সব
অঞ্চলে,যেমন ভিখদাসের মাঠ, সনাতনের মাঠ, রূপদাসের মাঠ,ডাকাত কালীর মাঠ ৷
জয়রামবাটী বা কামারপুকুর থেকে গঙ্গাস্নান করতে আসতে হলে অহল্যাবাঈয়ের রাস্তা না ধরে রঘুদাসের মাঠ(রঘুবাটী গ্রাম) ও সনাতনের মাঠ পার হয়ে তিরোল গ্রামের ভেতর দিয়ে তারকেশ্বর পর্যন্ত সোজা হাঁটাপথ ধরে আসতে হত ৷অনেকে আবার অহল্যাবাঈয়ের রাস্তা থেকে উত্তর পূর্বদিকে সোজা মাঠপথে তারকেশ্বরে উপস্থিত হতেন ৷ এই অঞ্চলটি ছিলো ভিখদাসের এলাকা ৷ সেখান অন্যদল বিরোধী হয়ে
আসতে পারত না ৷
যেদিন শ্রীমা আত্মীয় ও প্রতিবেশী সহ গঙ্গাস্নানে গেলেন , ভিখদাসের এলাকার রাস্তাদিয়ে যাওয়ার সময় সন্ধ্যানেমে আসে এবং সকলে গাছ তলায় বিশ্রাম করতে থাকে ৷
নানারূপ মানসিক দুশ্চিন্তায় শ্রীমা'র ঘুম হয়
নি ৷ঘোর অন্ধকারের মধ্যে তিনি যেন মনে মনে শুনতে পেলেন ,শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁকে আসতে বলছে ৷তিনি কোনদিক না দেখে অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে থাকেন ৷ কিছুদূর যাওয়ার পর ডাকাত সর্দার ভিখদাসের সঙ্গে তাঁর দেখা হয় ৷শ্রীমা'র গায়ে গহনা দেখে তার লোভ হয় ৷সেদিন এক স্থানে ডাকাতি করতে গিয়ে বিফল হয়ে ভিখদাস ফিরছিল ৷গহনা কেড়ে নেওয়ার জন্য শ্রীমা'র পথ অটকায় ও জিজ্ঞাস করে,'তুমি কোথায় চলেছ?তুমি কে?'
শ্রীমা তখন সরল বালিকার মতো নির্ভিক চিত্তে উত্তর দেন,'কেন বাবা,আমাকে তুমি চিনিতে পার না?আমি যে তোমার মেয়ে ৷'ভিখদাস আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল,'আমার মেয়ে?তুমি?অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ যেন চতুর্দিকে আলো প্রকাশিত হল এবং ভিখদাস সে জ্যোতির্ময়ী চেহারার মধ্যে দেখল,তারই কন্যা—যাকে অসুস্থ অবস্থায় বাড়ীতে ফেলে সে ডাকাতি করতে এসেছে ৷ নৃশংস হৃদয়হীন দুর্বৃত্ত লোকেদের মনেও এমন একটা দুর্বলতা থাকে—যাকে সে যত্নে মনে লালনপালন করে অথচ অস্তিত্ব স্বীকার করতে ভয় পায় ৷
ভিখদাস সেই অপূর্ব চেহারাতে মৃত্যুশয্যায় নিজের মেয়ের মুখ দেখে বলে ওঠে,'মা, একি তোমার মায়া—না তুমি আমার মেয়ে ?' কিছুক্ষণ পরে সে দৃশ্য মিলিয়ে যায় ৷ ভিখদাস কাঁপা স্বরে জিজ্ঞাসা করে 'মা, তুমি কোথায় চলেছ? এই অন্ধকারে? আমাকে ছেড়ে?'শ্রীমা বলেন, তোর ছেলে গঙ্গাতীরে আছে, আমাকে ডেকেছে, তাই চলেছি ৷' ভিখদাস বলে, 'আমার ছেলে? কই আমার তো কোন ছেলে নেই!' শ্রীমা বলেন,'মনে করে দেখ,তোর'ই ছেলে আমাকে ডেকেছে—তাঁর ডাক আমি ফেলতে পারি না ৷ভিখদাসের আর একটা মুখ মনে পড়ল ৷ একদিন এমনি অন্ধকারে কয়েকজন যাত্রীর ওপর অত্যাচার করার সময় এক যুবতী সন্তান প্রসব করে এবং মৃত্যুর আগে ভিখদাসের কোলে সদ্যজাত শিশুকে দিয়ে কাতরকণ্ঠে বলে— বাবা আমি তো মরে যাবো এই ছেলেটিকে আর প্রাণে মেরো না ৷ ভিখদাস সেই অসহায় শিশুকে ঘরে এনে লালন পালন করে ৷কিন্তু সেও একদিন ভিখদাসকে ছেড়ে চলে যায়, অনেক খোঁজ করেও পায়নি ৷সেই শিশু পুত্রের কথা মনে পড়তে উদভ্রান্তের মত হয়ে গেল ভিখদাস ৷ কিছুক্ষণ পর নিস্তব্ধতা ভেঙে ভিখদাস বলল,
'মা,তুমি কোথায় যাবে? আমি তোমাকে সঙ্গে করে দিয়ে আসছি ৷'
একটা প্রকাণ্ড মাঠ পার হয়ে ভোরের সময় এক স্থানে এসে শ্রীমা বললেন,'বাবা, আর তো হাঁটতে পারি না ৷একটু বিশ্রাম করি ৷'এই কথা বলে শ্রীমা অচেতন হয়ে পড়েন ৷ ভিখদাস মায়ের কাছে বসে থাকেন ৷
সূর্যোদয়ের পর ভিখদাসের একজন পরিচিত এসে খবর দেয় গত রাতে তার মেয়ে মারা গেছে ৷সেই সংবাদে শ্রীমায়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ভিখদাস ৷ ক্রমশ আত্মীয়সঙ্গী শ্রীমায়ের খোঁজে সেখানে আসলে ভিখদাস তাদের কাছে নিদ্রিত শ্রীমাকে রেখে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায় ৷যাওয়ার আগে ভিখদাস তার পরিচিতকে আদেশ দিয়ে যায় শ্রীমাকে পাল্কি করে তারকেশ্বরে পৌছে দিতে ৷
ভিখদাসের সাথে শ্রীমায়ের এই সাক্ষাৎকারের জায়গা এখন মায়াপুর নামে পরিচিত এবং শ্রীমা যেখানে ঘুমিয়ে পড়েন, তা মলয় পুর নামে পরিচিত ৷ সেখানে প্রকাণ্ড মাঠ এখন বর্তমান যা গোঘাটের কাছে ৷ এই ঘটনার পর ভিখদাস পাগল হয়ে যায় ও তিরোলের মা কালীর মন্দিরে আশ্রয় নেয় ৷ তিরোলের মা কালীর মূর্তির কাছে পাগলের বালা ও মহৌষধ পাওয়া যায় ,যা বঙ্গদেশে অনেক স্থানেই প্রসিদ্ধ ৷ ভিখদাসের মৃত্যুর পর আরামবাগে ডাকাতের দল বিশৃঙ্খল হয়ে যায় ৷

0 মন্তব্যসমূহ