মেঘে ঢাকা তারা || অলিপা পাল




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

মেঘে ঢাকা তারা

অলিপা পাল


—'আমি মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্ট অফিসে অ্যাকাউন্টস বিভাগে বছরে মাত্র ২০ পাউন্ড মাইনের এক জন কেরানি। বয়েস প্রায় ২৩ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেই আমার, শিক্ষা সাধারণ স্কুল পর্যায়ের।অবসর সময়ে গণিতচর্চা করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাগত পাঠক্রমের মধ্যে দিয়ে চলা হয়নি আমার। তবে,নিজের জন্য নতুন পথ রচনা করে চলেছি আমি।আপনাকে অনুরোধ যে কাগজগুলি পাঠালাম তা দয়া করে পড়ে দেখবেন। আমি দরিদ্র। আমার আবিষ্কৃত তথ্যগুলি যদি আপনার বিচারে একটুও মূল্যবান মনে হয়, তা হলে আমি ওগুলো ছাপতে চাই। আমি অনভিজ্ঞ, তাই এ ব্যাপারে আপনি কোনও পরামর্শ দিলে তা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে করব। আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছি।'—


 মাদ্রাজ থেকে ইংল্যান্ডের কেমব্রিজে পাঠানো এক বিখ্যাত চিঠির কয়েক লাইন। পাঠিয়েছিলেন যিনি, তাঁর নাম শ্রীনিবাস রামানুজন আয়েঙ্গার। আর, যাঁর উদ্দেশে পাঠানো, তিনি হলেন গডফ্রে হ্যারল্ড হার্ডি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং নামজাদা গণিতজ্ঞ। ও রকম চিঠি রামানুজন নামে ওই সামান্য বেতনের কেরানি পাঠিয়েছিলেন আরও দুই ব্রিটিশ অধ্যাপকের ঠিকানায়। তাঁরা উত্তর দেননি। আশাহত গণিতচর্চাকারীর তরফে তাই মরিয়া চেষ্টা। যদি সাড়া দেন হার্ডি। দেবেন কি? আশায় বুক বাঁধলেন রামানুজন।


চিঠি পড়ে হার্ডি অবাক। মূল চিঠির বয়ান ওরকম অথচ খাম মোটা। কারণ চিঠির সঙ্গে অনেকগুলো পাতা। তাতে হাতে লেখা একের পর এক ফরমুলা। গণিতের নানা বিষয়ে। পত্রলেখকের দাবি, ওই সব ফরমুলা তাঁর আবিষ্কার। অথচ, কী ভাবে তিনি পৌঁছেছেন ওগুলোয়, তা ব্যাখ্যা করা নেই। ফরমুলাগুলো পোর্ট ট্রাস্ট অফিসে সামান্য মাইনের এক কেরানির আবিষ্কার? গণিতের যে সব বিষয়ে চর্চা করলে ওরকম সব ফরমুলা মিলতে পারে, সে সব নিয়ে মাথা ঘামাতে উঁচু মাপের জ্ঞান থাকা চাই। অথচ, পত্রলেখকের দাবি, তিনি ডিগ্রিধারী নন। গণিতচর্চা করেন নেহাত শখের বশে। এ হেন কেরানির পক্ষে সম্ভব বিস্ময়কর এক একটা ফরমুলা আবিষ্কার?

হার্ডি পড়লেন ধন্দে। ফরমুলাগুলো কি ঠিক? নাকি সব আজগুবি? তাঁকে ধোঁকা দিতে কোনও ঠগবাজের কাজ? তবে ওগুলো একেবারে সেরা গণিতজ্ঞের কাজ। কারণ ধারণার উপর ওরকম ফরমুলা কারও পক্ষে লেখা অসম্ভব। অতএব,জহুরি জহর চেনে। হার্ডি বুঝলেন রামানুজন আসলে এক জন জিনিয়াস। বৃত্তি দিয়ে তাঁকে নিয়ে গেলেন কেমব্রিজে। যে গণিত প্রতিভা অনাদর আর অবহেলায় পড়েছিল পরাধীন ভারতে, তার স্বীকৃতি মিলল পশ্চিমে। হার্ডির সঙ্গে যৌথ গবেষণায় এবং একক ভাবে রামানুজন আবিষ্কার করলেন একের পর 

এক—তাঁর কাজের মূল ক্ষেত্রগুলো ছিল 'নাম্বার থিওরি', 'কন্টিনিউড ফ্র্যাকশান', অসীম শ্রেণি ইত্যাদি। 

হার্ডি এক সময় রামানুজন সম্পর্কে বলেছিলেন, 'যে কোনও ধনাত্মক অখণ্ড সংখ্যাই রামানুজনের কাছে ভগবান !'

তার কারণ, যত বড় সংখ্যাই হোক না কেন, তাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে সেই সংখ্যার একটা অদ্ভুত গাণিতিক বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করে ফেলতেন।

খুব ভোরে কনকনে ঠান্ডা জলে নিয়মিত স্নান করার ফলে,যক্ষা হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

এক দিন হার্ডি ট্যাক্সি নিয়ে হাসপাতালে রামানুজনকে দেখতে যান। সেই ট্যাক্সির নাম্বার ছিল '১৭২৯' ৷

হাসপাতালে গিয়ে হার্ডি রামানুজনকে বলেন, 'সংখ্যাটা খুব বোরিং।' রামানুজন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন,'কে বলল? এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা। কারণ,এটি হল সবচেয়ে ছোট ধনাত্মক, অখণ্ড সংখ্যা, যাকে দু'টি ধনাত্মক অখণ্ড সংখ্যার ত্রিধাতের (টু দ্য পাওয়ার থ্রি বা কিউব বলা যায়) সমষ্টি হিসেবে প্রকাশ করা যায় ৷'

কিন্তু এ কাহিনির শেষটা যে সুখের নয়। রামানুজন,কেমব্রিজে ছিলেন মা ও স্ত্রীকে ভারতে রেখে। ওখানে যাওয়ার কিছু পরেই শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এক দিকে গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণের তীব্র বাছবিচারের খাদ্যাভাস আর অন্য দিকে পরিবার থেকে বহু দূরে প্রায় যোগাযোগহীন জীবনযাপন। সঙ্গে জুটল কেমব্রিজের হাড়কাঁপানো শীত। রামানুজন শরীরে-মনে বিধ্বস্ত। গুরুতর অসুস্থ শরীরে দেশে ফিরলেন । রোগমুক্তি হল না,মারা গেলেন  মাত্র ৩২ বছর বয়সে ।প্রতিভার অনাদর কদর জীবনযন্ত্রণা এবং খ্যাতির সূর্য যখন মধ্য গগনে তখনই আয়ু শেষ। এ সত্য কাহিনি যে নাটক নভেলকেও হার মানায়। জিনিয়াস আসলে মেঘে ঢাকা তারা ৷ প্রতিভা কখনো সুপ্ত থাকে না ৷


Every year, India celebrates National Mathematics Day on December 22 to commemorate the birth anniversary of Mathematician Srinivasa Ramanujan

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ