গল্প || সুপ্রকাশ মন্ডল




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

সফলতা

 সুপ্রকাশ মন্ডল


অমল সেদিন সারাদিন বাড়িতেই ছিল। ও দিনটা লকডাউন। তারা এখন কলকাতায় পোস্টিং। লকডাউন এর জন্য না আজ অফিস, না আছে বাজার করার তারা। একটু ভাত ফুটিয়ে খেলেই চলবে। সে ঠিক করল তার আলমারিটা একটু গুছিয়ে নেবে। আলমারি খুলতেই পুরনো কিছু অ্যালবাম আর বছর কুড়ি আগের কয়েকটা চিঠি হাতে পড়লো। কুড়ি তিরিশ বছর আগে চিঠি ছাড়া অন্য কিছু যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না। এখনতো চিঠি উঠে গেছে! আর অ্যালবাম। অ্যালবাম আর আগের মত হয় না। এখন ছবি ফোনের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপের বা ফেসবুকের প্রোফাইলেই রয়ে যায়।

চিঠি খুঁজতে খুঁজতে বাবার 1998  সালের চিঠিটা হাতে চলে আসে। তখন সে জলপাইগুড়িতে থাকতো। চিঠির মধ্যে আশীর্বাদ আর কিছুটা বারবার অভিমান ছিল। তাই সে অনেক চেষ্টা করে পরে কলকাতায় পোস্টিং হয়। কলকাতা থেকে বাড়িতে যাতায়াত করার অনেক সুবিধে। তাই বাবা মায়ের কাছে থাকার জন্য কলকাতাই বেছে নিয়েছিল।

পরের একটি চিঠি। চিঠিটা ছিল রমার। যখন সে কলকাতায় প্রথম থাকে তখন রমা অমল কে এই চিঠিটা দিয়েছিল। চিঠিতে সে জানায় 'বাবা অনেক সম্বন্ধ দেখছেন। তাই তুমি তাড়াতাড়ি এসে বাবার সঙ্গে দেখা করো। যাতে আমারও তোমার যে ভালোবাসা সম্পর্কটা আছে সেটা জানিয়ে আমাকে বিবাহ করার আর্জি জানাও ।'

এ সম্বন্ধে বলে রাখি। যখন ওরা দুজনে কলেজে পড়তো তখন অমল থার্ড ইয়ারে ও রমা ফার্স্ট ইয়ারে। ওদের বন্ধুত্ব স্কুল জীবন থেকেই ছিল। স্কুল জীবন ওরা দুজনে একটা থিয়েটার করেছিল। যেখানে অমল ছিল নায়ক ও রিতা ছিল নায়িকার ভূমিকায়। যেটা বলে প্রেম সেটা এসেছিল কলেজ জীবনে। 


রমার এই চিঠিটা পেয়ে কয়েকদিন বাদেই কলকাতা থেকে  অমল গ্রামে এসেছিলো। বাবা মাকে বিষয়টি সে সাহসের সঙ্গে জানাই। অমলের বাবার নাম বিমান বাবু। রমার বাবাকে বিমান বাবু চিনতেন। এটাও জানতেন "অমল ছোট চাকরি করে। তাই রোমার বাবা দিগন্ত বাবু কখনোই এই প্রস্তাবে রাজি হবেন না।" তবুও অমলের মায়ের কথায় তিনি একবার দিগন্ত বাবুর সঙ্গে কথা বললেন। দিগন্ত বাবু জানিয়ে ছিলেন ' রমার জন্য

একজন বিশিষ্ট সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পেয়েছেন যে কিনা ব্যাঙ্গালোরে আইটি সেক্টরে কাজ করে। সে একজন বিশিষ্ট প্রোগ্রামার। বিভিন্ন কোম্পানিতে অবসর সময়ে এডভাইসর হিসেবেও কাজ করে'। 

এই প্রত্যাখ্যানের পরেও রিতা আবার অমলের সঙ্গে যোগাযোগ। বলে -'" যে আমরা কোন মন্দিরে বিবাহ করে যদি কলকাতা চলে যায়।"

অমল রাজি হয়নি। "এভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে কাউকে বিবাহ করা তার পক্ষে সম্ভব নয় "একথা সে জানিয়ে দিয়েছিল।

অগত্যা রিতা ওই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রমেশকে বিবাহ করে বাবা-মার ইচ্ছা ক্রমে।

অমলের বাবা-মা অনেকবার অমল কে বিবাহ দেয়ার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু কোন ভাবেই তাকে রাজি করাতে পারেনি। অমলের সকল বন্ধুবান্ধব সংসার করেছে। এই দুঃখটা অমলের বাবার মায়ের মন মনের মধ্যে রয়ে গেল। এই অমল বাবা-মায়ের বয়স কালে তাদের খুব সেবা-যত্ন করে। সঠিক জায়গায় চিকিৎসা। কোন বিষয়ে প্রভাবে রাখেনি! এখন তার বাবা-মা দুজনেই গত হয়েছেন। এই ভাবতে ভাবতে কিছু খেয়ে ফোনটা নিয়ে শুয়ে পরলো।

ফোনটা খুলে নিজের ফেসবুক প্রোফাইল টা ধরতে লাগল।দেখে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে নাম রমা চৌধুরী। প্রোফাইলটা ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে বুঝতে পারলো এটা রমার। একসেপ্ট করার পরেই ওপার থেকে মেসেঞ্জারে গলা ভেসে এলো রমার।


" অমলদা আমি আজকে খুব বিপদে আছি। তোমার ফেসবুক প্রোফাইল টা দেখে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালাম। আমার হাসবেন্ড রমেশের বড্ড শরীর খারাপ। করোনা  পজিটিভ হয়েছে। আমার ছেলে প্রদীপ এইসবে মাধ্যমিক পাস করেছে। তেমন কিছুই জানেনা। "

"তোমরা এখন কোথায়" অমল জিজ্ঞেস করল। "আমরা এখন কলকাতায়। রাজারহাট ফ্লাট এ আছি। হাসবেন্ড এখন ঘর থেকেই work-from-home করছিল। "

এই কথা শুনে আমার এক মিনিটও সময় নষ্ট করল না। তার নিজস্ব গাড়িতে করে রাজারহাটে যায়। ওদের সঙ্গে আলোচনা করে একটা এম্বুলেন্স ব্যবস্থা করে ওই দিনই অ্যাপেলো হসপিটাল ভর্তি করে দেয়। এই মুহূর্তে কেবা কার উপকার করছে।

10 দিনের মধ্যে করোনার সঙ্গে লড়াই রমেশ তার বাড়িতে ফিরে আসে। অমল অনেকদিন পর আবার তার পুরানো বান্ধবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তার প্রয়োজনে কিছু উপকার করে সে আনন্দ বোধ করল। রমেশ্ অমল কে বলল " এই উপকারের জন্য আপনার  কাছে কৃতজ্ঞ" । অমল হয়ে গেল রিতা ও রমেশ এর পারিবারিক বন্ধু। রমেশ ভাবতে লাগলো জীবনে কি পেয়েছি কি পাইনি। সে তার মত ভেবে দেখল সে জীবনের সবকিছুই পেয়েছে। সে নিজের কর্মে সকল সে  তার বাবা-মার যতদূর সম্ভব দেখাশোনা করেছে ও এখন সে তার পুরনো বান্ধবীর পারিবারিক বন্ধু এটাই তার জীবনের সর্বোচ্চ সফলতা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ