শতবর্ষে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় || দেবলীনা




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 

শতবর্ষের আলোয় উদ্ভাসিত কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, লিখছেন  দেবলীনা 

ছবি সংগৃহীত 

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯২০সালে , ২ সেপ্টেম্বর৷ অবিভক্ত বাংলার ঢাকায়৷ যৌবনে অনুশীলন সমিতির সদস্য৷ ৪০ ’এর দশকে কিছুদিন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য৷ জাতিদাঙ্গা , দুর্ভিক্ষ, স্বাধীনতার জন্য লড়াই , দেশভাগ , পার্টিভাগ , খাদ্য আন্দোলন … নকশালবাড়ি আন্দোলন , জরুরি অবস্থা , বন্দিমুক্তি আন্দোলন … একের পর এক লড়াই ও আন্দোলনে নিজেকে মিলিয়েছিলেন বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়৷

তিনি লিখলেন প্রেম, তিনি লিখলেন প্রতিবাদ ।বাংলা কবিতা তাতে আরও রূপবান হয়ে উঠল ! চরম বাস্তব জীবন থেকে শব্দ ও অক্ষর তুলে এনে তিনি গেঁথে দিলেন এক একটা আগুন ঝরা কবিতায়।গনগনে আগুনের রাস্তা হাঁটতে হাঁটতে তিনিও একটিই মাত্র প্রেমের কবিতা লিখতে চেয়েছিলেন, তিনি লিখলেন .....
 "সে চেয়েছিল 
 একটি সত্যিকারের প্রেমের কবিতা লিখতে৷  একটাই জীবন , মানুষের জীবনে প্রেমের চেয়ে নির্মল 
 পিপাসার জল আর কী থাকতে পারে ?"
 আমরা সকলেই স্বপ্ন দেখি বা ভাবি যে জীবন তো প্রেমেরই গান ,সেই প্রেমের মাধুরী যদি আমাদের কাব্যে মিশে যায় , গল্পে কবিতাকে ছুঁয়ে যায় তাহলে ক্ষতি কি ? কিন্তু প্রেমের রঙিন কাব্যিক পৃথিবীর মধ্যেও কঠিন ও কঠোর বাস্তব আছে , আছে ঘৃণ্য - শোষিত নরক যন্ত্রণা , প্রতিদিনের নিশ্বাস নেওয়ার লড়াই ! কিন্তু তার মধ্যেও মানুষ ও জীবন স্বপ্ন দেখে , আশা করে ,সত্যের পথ অন্বেষণ করে! 
 তিনি লিখছেন .... (তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা'র ভূমিকা ' কবির ধর্ম ' থেকে সঙ্কলিত ) 
"মানুষের আশা অবিনাশী । চারিদিকের নরকের মধ্যেও মানুষ তাই স্বপ্ন দেখে । তখন স্বয়ং মৃত্যু এসেও যদি তার সামনে দাঁড়ায় – সে তাকে সহজে পথ ছেড়ে দেয় না – প্রশ্ন করে । 
প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয় প্রশ্ন করাটাই হয়তো কবির ধর্ম ।"
তখন সময় উত্তাল , রাজনৈতিক টানাপোড়েন, তখন মুক্তির দশক। তিনি সে সময় প্রেম ও বিষাদের ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে সে অনলে পুড়ে পরিশুদ্ধ হলেন আর গাইলেন বিপ্লবের গান ,তাঁর প্রতিবাদ ধ্বনিত হলো সর্বহারার মিছিলে..
রাস্তার মোড়ে মোড়ে তখন কারফিউ, কিন্তু তাঁর চিন্তা ও চেতনায় তখন কোন ছেদ পরে নি , মগজ খুঁজে চলেছে তার পুষ্টি আর বিকাশ। 
ছবি সংগৃহীত 
ঠিক যেমন মায়ের আচঁলে থাকে এক অন্যরকম স্নেহ, মায়াভরা আকাশ। যেখানে মাথা রেখে দুনিয়ার সমস্ত চিন্তা দূর করে ফেলা যায়, ঠিক তেমন একটা মায়ের আঁচল দাবি করে বসলেন কবি! শুধু নিজের জন্য নয়,সমগ্র পৃথিবীর জন্যে৷ যে পৃথিবীটায় প্রত্যেকটা মানুষ ওই শান্তির ঘুম ঘুমোতে পারবে। থাকবে না শোষণ। যেন এক রূপকথার রাজ্য । ঠিক সেখান থেকেই আঁকলেন আর এক চরম বাস্তব চিত্র ....
" একটি মেয়ে উপুড় হয়ে কাঁদছে যন্ত্রণায় 
 বিবর্ণ তার নয়ন দুটি , কিন্তু বড় মিঠে 
 একটি ছেলে জানে না , তাই অঘোরে নিদ্রা যায়  জানলে পরে থাকত এখন পঙ্খিরাজের পিঠে৷!"
অথবা ...
"আশ্চর্য ভাতের গন্ধ রাত্রির আকাশে
কারা যেন আজও ভাত রাঁধে
ভাত বাড়ে, ভাত খায়।

আর, আমরা সারা রাত জেগে থাকি
আশ্চর্য ভাতের গন্ধে
প্রার্থনায়, সারা রাত।"
কিন্তু কবির কলম শুধু প্রতিবাদ করে বা স্বপ্ন ভঙ্গের অনুশোচনা করেই থেমে থাকেন নি। তিনি শিরদাঁড়া সোজা রেখে কলমে শান দিয়ে স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়ে গেছেন। তার মতো বাস্তববাদী কবি আমাদের শিখিয়ে গেছেন দো-টানায় বিভ্রান্ত পথের শেষে আছে এক আশার আলো। পথ হলো নদীর মতো আর পথের বিপদ হলো জলের স্রোত যা ভেসে থাকবেই কিন্তু ঢেউ এসে সেই অনটন - দুর্দশা - হতাশা বয়ে নিয়ে যাবে শত বাধা অতিক্রম করে। 
 তার কবিতার লাইন এক আশ্বাসবাণীর মতো শোনায়.... 
"রাস্তা কারও একার নয়"
" বরং তাকেই একদিন রাস্তা ছাড়তে হয়, যার স্পর্ধা আকাশ ছুঁয়ে যায়।" 
এই স্পর্ধা আসলে লোভ। যার কোনো আলো নেই । আছে বিষাক্ত দাঁত নোখ, আর তাই বোধহয় সে অন্যের ভয়ের কারণ। কিন্তু এই বাধাও অতিক্রম করা যায় সত্য দিয়ে, আলো দিয়ে , সদিচ্ছা দিয়ে!  তাই কবি বলছেন .....
" বিজ্ঞান যখন প্রেমের গান ভুলে ভাড়াটে জল্লাদের পােশাক গায়ে চাপায়, আর
 রাজনীতির বাদশারা পয়সা দিয়ে তার ইজ্জত কিনে নেয়,
 আর তার গলা থেকেও ধর্মের ষাঁড়েদের মতােই কর্কশ আদেশ শােনা যায় : 'রাস্তা ছাড়াে! নইলে - " 
অর্থাৎ তিনি বারবার প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন ...নিজের অধিকারের দাবিতে মিথ্যার মুখোশ টেনে ছিঁড়ে দিতে বলেছেন, তার ভাষায় ..... 
" যতদিন 
বিনা বিচারে
বিচারের নামে
বিচারকে উপহাস করে
এই দেশের জেলখানায়
একটি মানুষকেও
কুকুর-শেয়ালেরা নির্যাতন করবে,
ততদিন 
তোমরা স্বীকার করো না
এই দেশে
গণতন্ত্র বলে
ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে
শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সভ্যতা বলে
কিছু আছে :
তোমরা 
কিছুতেই মেনে নিও না
মানুষ
এবং মনুষ্যত্বের
এত বড়ো অপমান।"
কবির কলম থামেনি আজীবন। তিনি তো জানতেন তিনি চিরকাল থাকবেন না কিন্তু তার কবিতা - লেখনী - গান চিরকাল মানুষকে চেতনা জাগাবে , উজ্জীবিত করবে তাই তিনি লিখে গেছিলেন একশো বছরের প্রাসঙ্গিক কিছু লেখা , যা আজও ভীষন যথার্থ ! তিনি লিখলেন আশ্বাস বাণী ....
 “অস্থির হয়ো না;
     শুধু, প্রস্তুত হও!”
“তোমার কাজ
আগুনকে ভালোবেসে উন্মাদ হয়ে যাওয়া নয়-- 
আগুনকে ব্যবহার করতে শেখা।
অস্থির হয়ো না,
শুধু প্রস্তুত হও।”
      আবার তিনি লিখছেন —
  “যখন দুর্দিন ঘনিয়ে আসে
তখন মাথা ঠান্ডা রাখাই সবচেয়ে জরুরী কাজ। ”--------
“দুর্দিন কখনও চিরদিন থাকে না,”
            অর্থাৎ তাঁর লেখা এই শিক্ষাই দিয়ে যায় যে , ক্ষোভ - দুঃখ - বিষণ্ণতা সমাজ জীবনে যতই আসুক , যতই আষ্টেপৃষ্ঠে গ্রাস করার চেষ্টা করুক না কেন কিন্তু কখনই হতাশা বা নিরাশার অধিনতা স্বীকার না করে , তাকে অন্তরের শক্তি , ধৈর্য্য ও সাহস দিয়ে জয় করতেই হবে। কবির মতে জীবনের যত রকম রঙ মৃত্যুরও তত রকম রঙ । আলো-অন্ধকার , দিন - রাত্রি যেমন অনিবার্য সত্য , ঠিক তেমনই আশা- নিরাশাও একে অপরের সাথে জড়িত ।
তাকে জয় করতেই হবে। আর কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বেঁচে থাকবেন ও বেঁচে আছেন তাঁর লিখিত প্রতিটি শব্দ ও তার অন্তর্নিহিত অর্থে , যেন আজও তা নিজস্ব মহিমায় ফুটছে , জ্বলছে - জ্বালাচ্ছে , কাঁদছে ও অধিকার পাওয়ার আশায় প্রতিনিয়ত লড়াই করছে।এই চিত্রই তার কবিতার প্রতি ছত্রে ফুটে উঠেছে ....
" সারা জীবন ধরে পুড়িয়েছ। কিন্তু আমি তো
শুদ্ধ হলাম না। শুধু পুড়ে গেলাম। আমি সারা জীবন
শুধু হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘশ্বাস, তাদের সর্বনাশ
আমার জটায় বেঁধে সরস্বতী-নদীর জলে ঝাঁপ দিতে গেলাম,
কোথাও তাকে খুঁজে পেলাম না। তুমি আমাকে কী জীবন শেখাও, আগুন? 
এই কি মানুষের জীবন!’
তার একটিমাত্র প্রেমের কবিতা? ‘কবিতা! তুমি এখন
তিন ভুবনের কোন্‌ অতলান্ত অপ্রেমের মধ্যে ঘুমিয়ে আছ?
ঘুমাও! তুমি ঘুমাও! আর, আমি জেগে থাকি
আর এক আরম্ভের জন্য মৃত্যুর মুখোমুখি 
আমি জেগে থাকি।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ

  1. খুব সুন্দর মূল্যায়ন সুন্দর বিশ্লেষণ ।

    উত্তরমুছুন
  2. অনবদ্য লেখা । কবিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা প্রশংসনীয়। ভীষণ প্রাসঙ্গিক এই লেখা। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে ভাবতে শেখায়।

    উত্তরমুছুন

  3. নকশাল আন্দলনের কবির প্রতি জানাই
    শ্রদ্ধা ৷খুব ভালো লাগলো লেখা ৷ সত্যি তো প্রেম কবিতার প্রাণ শব্দ ধ্বনি...

    উত্তরমুছুন