গল্প | কিরণশঙ্কর বাগ




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


ফেরেস্তা
কিরণশঙ্কর বাগ


ত্রিদীব গোস্বামী। পাড়ার ডাক নাম মরা।
সে তখন অনেক ছোট, মানে জন্মেই অসুস্থ হয়ে মরণাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে। তারপর বাড়ীতে এলে, ছোট থেকে সবাই ওকে মরা বলেই ডাকে পাড়াতে। বাড়ীতে বাবু বলে যদিও। ত্রিদীব বঙ্গরতন হাইস্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্র।

গত মার্চ থেকে করোনার প্রকোপে চারদিকে লকডাউন। উদ্বিগ্ন বিশ্বের শহর, গ্রাম। চারিদিকে মৃত্যু আর লক্ষ লক্ষ আক্রান্ত মানুষ। ত্রিদীবদের গ্রামে রোগের প্রকোপ না থাকলেও লকডাউনের প্রভাব এসে পড়তে শুরু করেছে। 
ত্রিদীবদের গ্রামটা প্রধানত তাঁতি প্রধান গ্রাম। ব্যবসার বাজারে তাঁতের কাপড় কেমন বিক্রি হবে তার উপর নির্ভর করে তাঁতিদের সংসার। আর এই করোনা প্রবাহে লকডাউনের কারণে কাপড় রপ্তানি করার প্রধান মাধ্যম যাতায়াত ব্যাবস্থায় ছেদ পড়েছে। কলকাতার বাজার বন্ধ। ওখান থেকেই দেশের অন্য জায়গায় আর দেশের বাইরেও কাপড় যায়। 
কাঁচা মালের অভাব না থাকাতে কাপড় বোনার কাজ থেমে ছিলো না। কিন্তু কাপড়ের বেচাকেনা ক্রমে ক্রমে কমে এসে শূন্যে ঠেকেছে। এখন লাভ না রেখে আসল দামে কাপড় বেচতে চাইলেও কেউ নেয় না। ফলত তাদের সংসারে হাঁড়ির টান দেখা দিয়েছে। পাঁচ দশ হাজারের যতটুকু সঞ্চয় তাদের ভান্ডারে ছিলো,তাতে হাত দিতে দিতে তাও প্রায় ফাঁকা হতে বসেছে। সরকার অবশ্য মাসে ৫ কেজি করে চাল দেয়। কিন্তু শুধু চাল দিয়ে কি সংসার চলে? পাড়ার নিধু তাঁতির ডায়াবেটিস আছে। তাকে নিয়মিত ইন্সুলিন নিতে হয়। ও পাড়ার সুখেন দাদুর বৌ এর কিডনির অসুখ। নিয়মিত ডায়ালিসিস করতে হয়। ত্রিদীবদের পাশের বাড়ির সরস্বতী মাসির ছেলের ক্যান্সার। মাসে একবার করে রে নিতে হয়। এসবের অনেক খরচ। কিন্তু ইনকামের পথ বন্ধ। তাই ৫ কেজি চাল পেটের জোগাড় করলেও তাতে সংসার চলে না। 
এতো গেল রোগের কথা। গ্রামের অনেক বাড়িতেই ছোট বাচ্চা,তাদের পথ্য। তার থেকে একটু বড়দের পড়াশুনোর খরচ আছে। মনসাতলার সুখেন দাস তার নাতি কে প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করেছিলো। এই লকডাউনে স্কুল বন্ধ থাকলেও ফি বেড়েছে। গত মাসে ফি বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দিতে না পারায় তাঁর নাতি কে স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের স্পষ্ট জবাব,টাকা দিন নইলে আপনার নাতি কে কোনো সরকারি স্কুলে পড়ান।
 ত্রিদীব অবশ্য তাঁতি সম্প্রদায়ের নয়। সে জাতিতে ব্রাহ্মন। বাবা সরকারী হাইস্কুলের জীবনবিজ্ঞানের টিচার। তাই লকডাউনের অর্থনৈতিক প্রভাব তার পরিবারে এখনো পড়েনি।

প্রতিদিনের মত আজও বিকেল বেলায় খেলার জন্য ত্রিদীব তার বন্ধু বাপ্পাদের বাড়িতে বাপ্পাকে ডাকতে যায়। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মায়ের কথা মত মুখে মাস্ক পরে নেয়। পকেটে নেয় ছোট একটা হ্যান্ড স্যানিটাইজার। বাড়ির গেট খুলে পাশের শিব মন্দিরের বাঁ পাশ দিয়ে চলে যাওয়া মাটির রাস্তার শেষ প্রান্তে পুকুরের ধারে বাপ্পাদের বাড়িতে যায় ত্রিদীব। গিয়ে দেখে বাপ্পা চা মুড়ি খেতে বসেছে। বাপ্পা আরো কিছু মুড়ি চাইলে তার মা মুড়ির টিনটা বারান্দায় এনে তলদেশে পড়ে থাকা অল্প কিছু মুড়ির সবটা ঝেরে বাপ্পাকে দিয়ে দেয়। তারপর বলে, "আজ রাতে আর মুড়ি নেই। দুটো বিস্কুট আছে ওই খেয়েই ঘুমাবি।"
বাপ্পা বলে,"রাতে কতদিন ভাত খাইনি মা,সব পাড়ার লোকেরা রেশন দোকানে চাল পায়,আমরা কেন পাই না মা?"
বাপ্পার মা বলে,"আমাদের কাগজ পত্রের কি গন্ডগোল আছে। তোর বাবা কলকাতায় কাজ করার সময় বাসে একবার একটা ব্যাগ হারিয়ে ফেলে,ওতেই সব কাগজপত্র ছিলো।"
-"আর কাগজপত্র হবে না মা?"
-"তোর বাবা গ্রামের প্রধান কে সব জানিয়েছে,ওরা বলেছে অনেক সময়ের ব্যাপার।"
-"আচ্ছা মা কলকাতায় বাবাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিলো কেন? "
-"এই লকডাউনে কোম্পানির ব্যাবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। ওরা প্র‍য়োজনের বেশি একজন কর্মচারীকেও রাখেনি। আর তোর বাবা তাদের অপ্রয়োজনের তালিকায় ছিলো।"

ইতিমধ্যে মাছ বিক্রি শেষ করে বাপ্পার বাবা বাড়ি ফিরে আসে। বাড়ির মধ্যে ঢুকতে গিয়ে দেখে ত্রিদীব দাঁড়িয়ে আছে। ত্রিদীবকে সঙ্গে করে বারান্দায় নিয়ে আসে। বাপ্পাকে বলে,"তুই একা একা মুড়ি খাচ্ছিস,তোর বন্ধুকেও দে।"
ত্রিদীব একটু আগেই মুড়ির টিনের অবস্থা দেখেছে দূর থেকে দাঁড়িয়ে।  বাপ্পা আর বাপ্পার মাকে যাতে অস্বস্তিতে না পড়তে হয় তারজন্য তাড়াতাড়ি বলে, "না আমি বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছি এইমাত্র। পেট ভর্তি।"
বাপ্পার বাবা আর কিছু না বলে বাড়ির মধ্যে চলে যায়। বাপ্পার খাওয়া শেষ হলে দুজন বন্ধু মিলে শিবতলায় খেলতে চলে আসে।

প্রতিদিন সন্ধ্যে বেলায় তার বাবার কাছেই পড়তে বসে ত্রিদীব। আজও পড়ছিলো। জীবনবিজ্ঞান বই এর 'অভিব্যক্তিবাদ ও বিবর্তনবাদ' চ্যাপ্টারটি শেষ করে তার বাবার করে চলা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল ত্রিদীব। হঠাৎ করেই তার বাবা প্রশ্ন করে,"আচ্ছা বাবু তুই তো একটু আগে জীবনবিজ্ঞান পড়লি। এবার এককথায় বলতো,জীবনবিজ্ঞান আসলে কী?"
ত্রিদীবের সহজ উত্তর,"বিজ্ঞানের যে শাখায় জীব ও তার জীবন কে নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে জীবনবিজ্ঞান বলে।"
ছেলের প্রশ্নের উত্তর শুনে সুধীর বাবু খুশি হন। তারপর বলেন,"আচ্ছা কোনটা জীব আর কোনটা জড় এটা বুঝবি কীভাবে?"
-যারা উত্তেজনায় সাড়া দেয়,বড় থেকে ছোট হয়,খাদ্য গ্রহন করে তারা জীব। আর যারা এসব করেনা তারা জড়।
-হুম। ঠিক বলেছিস। আর জীব এসব করে তার কারণ জানিস? তাদের মধ্যে জীবনীশক্তি আছে তাই। আর এই জীবনীশক্তিকেই আর এক ভাবে আমরা আত্মা বলে জানি।
-আত্মা! সে তো ভুত প্রেতের সঙ্গে জড়িত।
ছেলের কথা শুনে সুধীর বাবু হাসিতে লুটিয়ে  পড়েন। বাবাকে এইভাবে হাসতে দেখে ত্রিদীব অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। সুধীর বাবু হাসি থামিয়ে বলেন,"এই তোকে আমি বিজ্ঞান পড়াই? ওসব ভূত প্রেত মানুষের কল্পনা মাত্র। মানুষের ভেতরে যে ভয়,তার কাল্পনিক প্রকাশ হল ওইসব ভূত প্রেত। তোকে কাল 'ক্যাস্পার' সিনেমাটা দেখাবো। দেখবি ভূতেরাও কি সুন্দর হয়।"
ত্রিদীব বলে,"আচ্ছা বাবা,এই আত্মার কথা জীবনবিজ্ঞান বইএ নেই কেন?"
-আত্মা একটা শক্তি। জীবনীশক্তি। লাইফ ফোর্স। এটা স্থান পেলে ফিজিক্সে পাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা হল,এই জীবনীশক্তিকে প্রামাণিক ভাবে ব্যাখ্যা করার মত প্রসার বিজ্ঞানের এখনো ঘটেনি। ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় আমাদের চেয়ে থাকতে হবে।
-বিজ্ঞানে যখন ব্যাখ্যা নেই তখন তো এর ভিতই নেই।
-না রে বোকা। সৃষ্টি অনেক বড়। সেই সৃষ্টির অনেক বিষয়েরই ব্যাখ্যা বিজ্ঞানের কাছে নেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের দর্শণের সাহায্য নিতে হয়।
-দর্শন কী বাবা?
-দর্শন হল জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। যার যেমন দৃষ্টিভঙ্গি সে জগৎকে সেই ভাবে দেখছে। 
-তাহলে দর্শনে এই আত্মাকে কীভাবে দেখানো হয়েছে?
-আত্মা সম্পর্কে যে দর্শন তাকে আধ্যাত্মিকতা বলে। ইংরেজিতে বলে স্পিরিচুয়ালিজম। আর এই আধ্যাত্মিকতা শব্দের অর্থ হলো আত্মার অধ্যয়ন। 
আত্মা যেহেতু একটি শক্তি তাই নিজের ভেতরের সেই শক্তিকে উপলব্ধ করতে হয়। প্রত্যেক জীবের মধ্যেই সেই শক্তি আছে। তোর মধ্যেও, আমার মধ্যেও। কিন্তু আমরা এটা সম্পর্কে কন্সিয়াস থাকি না। আধ্যাত্মিকতা প্রথমে এই জীবনীশক্তি সম্পর্কে সচেতন হতে শেখায়। তারপর পুরো জগতের সাথে তার সম্পর্ক সাধনের জন্য পুরো জগৎকেই শক্তি রুপে দেখার দৃষ্টি আনে। আর এর চরম পর্যায়ে পুরো সৃষ্টিশক্তির সাথে নিজের ব্যাক্তিগত জীবনীশক্তির যে সাম্য তাকে চিহ্নিত করে। এই পুরো সৃষ্টির সমগ্র শক্তিকে আধ্যাত্মিকতায় পরমাত্মা বলা হয়। আত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনই আধ্যাত্মিকতার প্রধান উদ্দেশ্য। বিজ্ঞানে শুধু যুক্তি লাগে। আর আধ্যাত্মিকতায় যুক্তির সাথে ভক্তির প্র‍য়োজন হয়।
ইতিমধ্যে রাতের খাবারের জন্য ত্রিদীবের মা ডাক দেয়। সুধীর বাবু "যাই" বলে ত্রিদীবকে বই খাতা গোছাতে বলে। ত্রিদীব বই গোছাতে গোছাতে বিকালের বাপ্পাদের বাড়িতে বাপ্পা আর বাপ্পার মায়ের কথা তার বাবাকে বলে। সুধীরবাবু তাদের অভাবের কথা জানতে পেরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ত্রিদীব বলে,"বাপ্পার বাবা তো আগে তাঁত বুনতো। এখন কলকাতার কাজটা চলে যাওয়াতে তাঁতটাই বোনে না কেন? মাছ বেচে আর কটা টাকা হবে।"
সুধীর বাবু বলেন, "এখন তাঁতের বাজারো ভালো নয় রে। তাছাড়া বাপ্পার বাবার কোমরে স্পন্ডালাইটিসের ব্যাথা আছে। ওই জন্যই তো তাঁত ছেড়ে কলকাতার কারখানায় হিসাব তদারকির কাজ করতো।"
ত্রিদীব মুখটা ছোট করে বলে,"বাবা আমরা কিছু করতে পারিনা ওদের জন্য।"
-পারি। আমি খেয়ে নিয়ে একবার বাজারে যাবো। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিই গে চল। তুই কাল ভোরে উঠিস। কাজ আছে।

সকালের আলো তখনো পুরোপুরি চারিদিক আলোকিত করতে পারেনি। রাতের অন্ধকার তখনো ছিটেফোটা লেগে আছে গাছেদের পাতায়। বাপ্পার মা ঘুম থেকে উঠে দরজা খোলে। চোখ রগড়াতে রগড়াতে দেখে বারান্দায় স্তুপ করে কিসব   যেন রাখা আছে। টর্চটা জ্বালিয়ে দেখে সেখানে কেজি দশেক চাল,চার প্যাকেট মুড়ি,দু প্যাকেট বিস্কুট,দুটো সাবান আরো ছোট ছোট বোতলে কিসব আছে। আর আছে তিনটে মাস্ক। এসব দেখে বাপ্পার মা চমকে যায়। বাড়ির ভেতর থেকে বাপ্পার বাবাকে ডেকে নিয়ে আসে। তারা দুজনেই অবাক হয়ে চেয়ে থাকে জিনিসগুলোর দিকে। বাপ্পার বাবা মুখে বিস্ময়ের হাসি নিয়ে বলে,"এই রাত-বিরেতে কে দিয়ে গেল রে এত জিনিস?"
বাপ্পার মা সেই জিনিসগুলো গোছাতে গোছাতে বলে,"নিশ্চই ভগবানের দূত। দুগ্গা দুগ্গা।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ



  1. আধ্যাত্মিকতার ভক্তির সাথে মিশেছে মানবিকতা
    অসাধারণ ভাবনায় লেখা
    কলমকে স্যালুট

    উত্তরমুছুন