নিবন্ধ | অলিপা পাল




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


ব্রহ্ম জ্ঞান ও বিজ্ঞান
অলিপা পাল

মানবকল্যাণে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে বিজ্ঞানচর্চা ও তার প্রয়োগের যে যথেষ্ট প্রয়োজন আছে সে কথা প্রথম বলেন স্বামী বিবেকানন্দ ৷তাঁর মহাপ্রয়াণের ১১০বছর পর,৪/৭/২০১২,CERN বিজ্ঞানীরা জেনিভায় ঘোষণা করেন—ঈশ্বর কণার (যার বৈজ্ঞানিক নাম Higgs-Boson)সন্ধান মিলেছে Large Hadron Collider(LHC) যন্ত্রে ৷
জগৎসৃষ্টির আদিমতম মুহূর্তে কোন বস্তুরই অস্তিত্ব ছিল না,ছিল শুধু ঘনীভূত এক শক্তিপুঞ্জের কেন্দ্র,যার বিস্ফোরণের ফলে শক্তিকণারা যুগ যুগ ধরে শীতল হতে হতে রচনা করে চলে এই বিরাট মহাবিশ্বকে ৷ বিজ্ঞান কোন সত্যকে পরীক্ষা ও প্রমাণ ছাড়া কখনোই গ্রহন করে না ৷পরীক্ষায় যেহেতু কোন যন্ত্র বা  ইন্দ্রিয় যুক্ত হয় ,তাই শুধু জড়জগতের সত্যগুলিই ধরা পড়ে বিজ্ঞানের চোখে ৷জড় বিজ্ঞানের পরীক্ষা নির্ভর যাত্রা শুরু হয়েছিল  sir Isaac Newton এর হাত ধরে ৷ ভারতীয় মুনি ঋষি গণ কিন্তু ব্রহ্ম রূপ সত্যটির সন্ধান সাধনায় মগ্ন হয়েছিলেন বহু হাজার বছর আগে ৷ গৌতম মুনি রচিত ন্যায় দর্শনের যুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কণাদ মুনি তাঁর বৈশেষিক দর্শন এ সর্ব প্রথম উল্লেখ করেন অণু পরমাণু ও আরও সূক্ষ্ম কণাদের কথা ৷সে কালে তাত্ত্বিক অনুমানগুলিকে পরীক্ষা করে দেখার বা দেখানোর কোন সুযোগ ছিল না ৷ ফলে অনেক সত্যই শুধু অনুমান আর বিশ্বাস নির্ভর হয়ে টিকে ছিল যুগ যুগ ধরে ৷
বেদান্তের আকাশ ও প্রাণ এবং বিজ্ঞানের বস্তু ও শক্তি —এদুটি আলাদা নয় একই সত্তার ভিন্ন প্রকাশ এই বিষয়টি স্বামী বিবেকানন্দ বিজ্ঞান মতে প্রমান করতে বলেন বিজ্ঞানী Sir Nikola Tesla কে ৷ পরবর্তী ঐতিহাসিক ঘটনা ৷
বড়ো সাফল্যেও বিজ্ঞানীরা খুব বেশি খুশি হতে পারে না কারণ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অতি দ্রুত বৃদ্ধির ব্যাখ্যা তাঁদের কাছে অজানা ৷বিজ্ঞানীরা শুধু যুক্তি বুদ্ধি পর্যবেক্ষণ অঙ্ক ও যন্ত্রের মাধ্যমে গবেষণা করেন,ইন্দ্রিয়াতীত কোন সত্তাকে মানতে তাদের অনীহা ৷
ভারতীয় মুনি-ঋষিগণ কিন্তু প্রথম থেকেই বলে এসেছেন সবকিছুর মূল ব্রহ্ম যা থেকে সৃষ্টি হয়েছে জড়প্রকৃতির সকল বস্তু ও শক্তি তেমনি সকল জীবের মনের আড়ালে গোপন থাকা আত্মশক্তি তাঁরই প্রতিফলন ৷জড়প্রকৃতি space- time-causation এর কারাগারে আবদ্ধ কিন্তু আত্মার চিৎ শক্তি নিত্য শুদ্ধ বুদ্ধ ও মুক্ত হয়ে সর্বদা বিরাজমান ৷সেই চিৎ শক্তিকে তো যন্ত্রে ধরা বা মাপা যাবে না কোনদিনই কারণ সেটি বস্তু নয় শক্তি নয়—সেটি চিরস্থায়ী আনন্দময় চৈতন্য ৷তাই সেই অন্তিম মূলটিকে খুঁজতে বিজ্ঞানীকে তাকাতে হবে আপন অন্তরের অন্তস্থলে ৷বিজ্ঞানীও ঋষি হয়ে উঠবে সৃষ্টির মূলটিকে জানতে ৷

 ঈশোপনিষদ গ্রন্থে     বেদান্তের অদ্বৈত ও দ্বৈত–উভয় শাখাতেই আত্মার তত্ত্ব আলোচিত হয়েছে।  

এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু আছে সবই অনিত্য৷ ৷আত্মাকে পরমাত্মার সঙ্গে এক করে দেওয়া৷ব্রহ্ম হ'ল পরম সত্য ৷ যিনি নিজে অনন্ত ও অন্যকেও অনন্ত তৈরী করেন৷ মানুষের চাহিদা ও ক্ষুধাও অনন্ত আর সেই অনন্ত ক্ষুধা অনন্তই মেটাতে পারে৷ তাই মানুষের মন যখন সীমিত ক্ষণস্থায়ী জাগতিক ভোগের দিকে ছোটে তা হয়তোবা তাকে ক্ষণস্থায়ী সীমিত সুখ দিতে পারে, কিন্তু তার পরিণতি কেবল দুঃখই হয়ে থাকে৷স্থান কাল পাত্র ভেদে সবকিছুই পরিবর্তনশীল৷তাই এই পরিবর্তনশীল জগতের সৃষ্টিকর্তা পালনকর্তা বিনাশকর্তা যিনি অনন্ত ব্রহ্ম ৷মাণ্ডুক্য উপনিষদে বলা হয়েছে, ব্রহ্ম অন্তর্মুখী ওনয়,বহির্মুখী ওনয়, ব্রহ্ম সমস্ত জ্ঞানের অতীত।

সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের মতে, উপনিষদের ঋষিরা ব্রহ্মকে ব্যাখ্যা করেছেন চক্ষুকর্ণের অগোচরে সেই সমস্ত ঘটনাবলীর পরম সার হিসেবে যাদের শুধুমাত্র আত্মজ্ঞান লাভের মাধ্যমেই অনুধাবন করা সম্ভব।
    
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনষ্টাইন তাঁর থিওরিতে প্রমাণ করেন জগতে সবকিছু আপেক্ষিক চরম সত্য নয় ৷

ব্রহ্ম শব্দের ব্যুৎপত্তি
ব্রহ্ম শব্দটির শব্দশূল বৃহ। বৃহ অর্থ বৃধ  বেড়ে চলা,বৃদ্ধি পাওয়া,বৃহৎ হওয়া। বৃহ+মন্=ব্রহ্ম। 
জগৎ যাঁর দ্বারা দীপ্ত হয় তার অর্থ ব্রহ্ম

ব্রহ্ম নির্গুণ নিরুপাধি,অদ্বয়, নির্বিশেষ,নিরাকার,অপরিণামী, স্বপ্রকাশ,সর্বভূতান্তরাত্মা,অসীম এবং সচ্চিদানন্দ। বাক্য মন ও বুদ্ধির অতীত ব্রহ্ম একটি অনির্বচনীয় তত্ত্ব। ব্রহ্ম বুদ্ধিগত সকল প্রমাণের অগম্য। ব্রহ্ম নিরাকার বলেই বুদ্ধিগত সকল কিছুর ঊর্ধ্বে।আত্মা কিংবা ব্রহ্ম 
অজ ৷ ব্রহ্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠজাতীয় কিংবা,সমজাতীয় ভিন্নতর কোন সত্তা নেই। ব্রহ্ম নিরাকার এবং নির্গুণ। ব্রহ্মে কোন প্রকার ভেদ নেই।এই জগতে তার কোনো প্রভু নেই, নিয়ন্তা নেই। এমন কোনও লিঙ্গ বা চিহ্ন নেই ৷
 

হিন্দু ধর্মীয় দর্শনে ব্রহ্ম হ'ল পরমেশ্বর, সগুণ ঈশ্বর। এই সত্তার যে সকল গুণাবলি বিভিন্ন উপনিষদে পাওয়া যায়,তা বাইবেলের সদাপ্রভু বা কোরান এর আল্লাহর সমতুল্য। 
আত্মমুক্তি অর্থাৎ পূর্ণতা প্রাপ্তির জন্যে যেমন আধ্যাত্মিক সাধনা প্রয়োজন তেমনি জগতের কল্যাণ সাধনের জন্যে বিজ্ঞানও সমভাবে প্রয়োজন৷ তাছাড়া বিজ্ঞানমানসিকতা মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত রাখে৷ তাই সমাজের অগ্রগতির জন্যে আধ্যাত্মিকতা ও বিজ্ঞানের সমন্বয় প্রয়োজন৷

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

5 মন্তব্যসমূহ

  1. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  2. বাহ্ সুন্দর আলোচনা, সমৃদ্ধ হলাম ।

    উত্তরমুছুন
  3. বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা সর্বজনগ্রাহ্য। "ব্রহ্ম" শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ এবং ধারণা তোমার লেখায় কিছুটা পেলাম। ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব সুন্দর আলোচনা ৷
    খুব ভালো লাগলো ৷

    উত্তরমুছুন