মুখোমুখি || বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 

নিরপেক্ষতা সবসময়ই পটভূমি নির্বাচন করে , মুখোমুখি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় 
( প্রশ্ন - দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য, এডিটিং ও সহযোগিতায় - অনুপ রায়, দেবলীনা চক্রবর্তী) 

পরিচিতি -
জন্ম, কর্ম কলকাতায়। ৩০শে নভেম্বর, ১৯৭৫ , শুভ জন্মদিন। ইংরেজি সাহিত্যে এম. এ- আধুনিক লেখকদের মধ্যে অন্যতম। গদ্য লেখার শুরু ‘উনিশ কুড়ি’ পত্রিকায়। প্রথম উপন্যাস ‘সোহাগিণীর সঙ্গে এক বছর’। এর পর পরই প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকায়। এরই মধ্যে নয় নয় করে কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১৫, উপন্যাস ১৫ খানেক। পেয়েছেন অজস্র পুরস্কার- কৃত্তিবাস, ভাষানগর, বাংলা অকাদেমি। ইত্যাদি।
ছবি সৌজন্যে ফেসবুক 

প্রশ্ন : একসময় আপনি আমেরিকার IOWA বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক লেখক শিবিরে সসম্মানে ভারতীয় লেখক হিসেবে গিয়েছিলেন এবং  সেই সময় আমেরিকার ভিন্ন ভিন্ন শহরে কবিতা সম্পর্কিত অনেক আলাপ আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। এই বিষয়ে আমার প্রথম প্রশ্ন - সাহিত্য চর্চা এবং নিয়মিত অভ্যাসে ভারতীয়রা বিশেষত বাঙ্গালীরা অন্যান্য দেশের থেকে কতোটা এগিয়ে? এবং এই চর্চার প্রতি দৃঢ়তা কতোটা ভারতীয় বাঙ্গালীদের? 

উত্তর : আমার মতে সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্র এগিয়ে বা পিছিয়ে থাকা এভাবে বিচার হয় না । বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি এক একরকম ।পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক আছেন যাঁরা সারা জীবনে আট থেকে দশটা উপন্যাস লিখেছেন , আবার আমাদের দেশে লেখক - উপন্যাসিকরা দেড়শ /দুশো উপন্যাস লিখেছেন সেক্ষেত্রে গুণগত দিক থেকে সব লেখা উন্নত নয় কারণ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপানোর একটা চাপ সেক্ষেত্রে থাকে । আরো একটা বিষয় বিভিন্ন দেশে লেখক - সাহিত্যিকরা সময় নিয়ে , রিসার্চ করে একটা লেখা লেখেন । অন্যদিকে বাংলা ভাষার লেখকেরা বহুপ্রজ ।
 অন্যদিকে আজকাল ফেসবুক বা ডিজিটাল মাধ্যমে যে সাহিত্য চর্চা বা প্রয়াস হচ্ছে  তা একটা উৎসাহ পেয়ে লেখালেখি করার জন্য এগিয়ে আসা  অবশ্যই একটা ভাল দিক কিন্তু আবার এটাও আমরা ভুলে যাচ্ছি যে আমরা কাদের লেখা পড়ে আমাদের শিখেতে হবে অর্থাৎ টলস্টয় , ও হেনরি এঁদের না পড়ে  আমরা এদিক ওদিক কিছুজনের লেখা পড়ে লিখতে চলেছি , সেক্ষেত্রে চিন্তা চেতনার একটা ফারাক থেকে যাচ্ছে এই সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে । 
 আমাদের সময় আমরা লেখা লিখেছি বা শিখেছি একটা প্রত্যাখানের মধ্যে দিয়ে অর্থাৎ আমার লেখা অগ্রজের পছন্দ বা ভালো না লাগলে আবার নতুন করে চেষ্টা করেছি কিন্তু এখন নতুন লেখা শুরু করেছেন তারা অনেকেই এই প্রত্যাখান থেকে শিখতে বা নতুন করে আবার শিখতে পাড়ার ইচ্ছেটা নেই বললেই চলে ।
ছবি অনুপ রায়

প্রশ্ন - লেখা লেখিতে অনুপ্রেরণা আর উৎসাহ যোগান পরবর্তী প্রজন্মকে। সেই বিষয়ে আপনার বক্তব্য বা মতামত ।

উত্তর : আমার মনে হয় যে কোন ক্ষেত্রেই অগ্রজের উচিত অনুজদের অনুপ্রাণিত করা , উৎসাহ দেওয়া । 
এক্ষেত্রে উৎসাহ বলতে শুধু প্রশংসা করা না , লেখালেখির ক্ষেত্রে কিছু বইয়ের সাথে পরিচিত করানো বা কোন লেখকের কিছু সৃষ্টি সম্বন্ধে তাদের জানানো কিন্তু একধরনের অনুপ্রেরণা । কারণ আমার মতে আজকের দিনে একটা বড় সমস্যা হলো লেখা লেখি করতে চাইছে এমন অনেকে আছেন যাদের লেখার যোগ্যতা আছে কিন্তু পড়ার অভ্যাস নেই , সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে তাদের যদি বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলা যায় আমার মনে হয় সেটা ভীষণভাবে ভবিষৎ প্রজন্মকে উন্নত করবে । 

প্রশ্ন - একটি 20-30 লাইনের কবিতা ও তিন চার ফর্মার উপন্যাস কোনটি যে কোন বিপ্লবে সাধারণ মানুষের উপর বেশী প্রভাবশালী। আপনার কি মনে হয় উপন্যাস পড়ার চেয়ে মানুষ ছোট ছোট কবিতার উপর মানুষের আকর্ষণ বাড়ছে? ?

উত্তর : আমার মনে হয়না উপন্যাস পড়ার প্রবনতা কমছে। কবিতা চটজলদি অবশ্যই মনোগ্রাহী ।কিন্তু বিভিন্ন কালজয়ী উপন্যাস আজও যথেষ্ট প্রভাবশালী এবং বর্তমানে বহু উপন্যাস মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে। 

প্রশ্ন : যতদূর পড়েছি আপনার লেখাগুলি সমাজ ধর্মী। এক্ষেত্রে আপনার বিচারে আপনার শ্রেষ্ঠ বই কোনটি যা বর্তমান সমাজিক প্রেক্ষাপটে  সুষ্ঠ বার্তা প্রচারে দৃষ্টান্ত হতে পারে ?

উত্তর : এটি ভুল তথ্য। আমার লেখা কেবলমাত্র সমাজ ধর্মী নয়। আমার অনেক লেখা প্রেম - বিরহ - সংসার বিভিন্ন রকমের দিককে উদ্ঘাটন করেছে। ভালো লেখা ভালো বই সবসময়ই আমার কাছে শ্রেষ্ঠত্বের দাবী রাখে।

প্রশ্ন : বিভিন্ন সংবাদ পত্রে আপনি লেখালেখি করেন। খুব জানতে ইচ্ছে করে বর্তমান সময়ে সংবাদ পত্র যেখানে নিরপেক্ষ নয় বলে শোরগোল চলে বা দোষারোপ পাল্টাদোষারোপ চলে,  সেখানে সংবাদ পত্রের ভূমিকা কতোটা বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনে  ??

উত্তর : নিরপেক্ষতা সবসময়ই পটভূমি নির্বাচন করে। আমার মতে বর্তমান সমসাময়িক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে নিরপেক্ষ থাকাটা খুবই কঠিন। 
ছবি সৌজন্যে ফেসবুক 

প্রশ্ন : দেশ পত্রিকায়,  কয়েকদিন আগে একটি স্বাক্ষরতার অনলাইন দেখছিলাম আপনার এবং সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের " ফরমায়েশী লেখা সাহিত্য নয় এটা ভুল ধারনা " 
আমার প্রশ্ন - 
যেকোনো লেখা লিখতে গেলে লেখকের বর্তমান পরিস্থিতি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ?  অর্থাৎ তার জীবনবৃত্তান্ত সুখ দুঃখ ব্যক্তিগত গন্ডীর বাইরে কতোটা বেড়োনো প্রয়োজন? ? 

উত্তর : প্রকৃত লেখকে অবশ্যই ব্যক্তিগত গণ্ডীর বাইরে গিয়ে লিখতে হবে। যেখানে লেখা লেখি একধরনের শিল্প। বিভিন্ন পাঠকের মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাবনার প্রয়োগ ও বিস্তার ঘটানো আবশ্যকীয়। 
প্রশ্ন :  আপনার আসন্ন কাব্য গ্রন্থ / উপন্যাসের নামটি কি?

উত্তর : এখনই বলা মুষ্কিল ।তবে কাজ চলছে। 

প্রশ্ন : প্রতিদিনের জীবন যুদ্ধ চাকুরী - সংসার কতোটা প্রভাবশালী একজন লেখকের কলমে?  

উত্তর : প্রভাবশালী না হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। কারণ লেখা একটা শিল্প এবং একজন শিল্পী সবসময়ই পাঠকের উদ্যেশ্যে নিজের বার্তা দিয়ে থাকে। সেটি বিভিন্ন মহল নিরিখে হওয়া উচিত। 
ছবি সৌজন্যে ফেসবুক 

প্রশ্ন : আপনার মতে বাংলা সাহিত্যের সুবর্ণ যুগ কোনটি?  বর্তমান সময়কে আপনি কোন যুগের আওতায় ফেলতে চান?  

উত্তর : আমার মতে বাংলা সাহিত্যে সুবর্ণ যুগ সব সময় । রবীন্দ্রনাথ , বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে সুনীল - শীর্ষেন্দু - মতি নন্দী , সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এরা যখনই লিখেছেন তাঁদের পাঠকের কাছে তখনই তা সুবর্ণ যুগ ।  আমাকে লেখার ক্ষেত্রে কোন যুগ প্রভাবিত করে নি প্রভাবিত করেছে এই সমস্ত যুগের লেখা । আমি কোন একটা বই একসাথে পড়তে পারি না আমার খুব ভালোলাগে " তুঙ্গভদ্রার তীরে " কুড়ি পাতা পড়ে " আরণ্যকের " দশ পাতা পড়তে , আবার তেমনি সেখান থেকে " পুতুল নাচের ইতিকথা " তিরিশ পাতা পড়ে " ঘুণ পোকা " পড়তে চলে এলাম অর্থাৎ এই পুরো পড়ার মধ্যেই একটা ভালোলাগা ছড়িয়ে আছে 
বর্তমানেও ভালো লেখা হচ্ছে এবং সেটাও ভবিষ্যতের কাছে অবশ্যই সেরা সাহিত্য বলে আলোচিত হবে বা মূল্যায়ন হবে , তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমি তাকে কোন যুগের আওতায় রাখতে চাই না বা সোনা রূপা এমন কোন ধাতু দিয়ে বিচার করতেই চাইনা । আমি লেখা দিয়ে বিচার করতে চাই । লেখা দুরকম হয় , একধরণের লেখা তাৎক্ষণিকভাবে দারুণ ভাবে গ্রহণযোগ্য বা সফল মনে হলো আর একধরণের লেখা একটু সময় নিয়ে গ্রহণযোগ্য হলো , এই দু'ক্ষেত্রেই আমরা ভালো লেখা পাচ্ছি কিন্তু তা কতটা জনপ্রিয় ও কালজয়ী হবে তা বিচার করবে সময় । 
আজকের দিনে যেমন নতুন লেখক আসছেন তেমন নতুন পাঠকও আসছেন , নতুন পাঠকদের জন্য কতটা লেখা হচ্ছে সেটাই এখন বিচার্য । খুব সাধারণ , খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য কি আজ সাহিত্য লেখা হচ্ছে ! আজ কি এমন কোন উপন্যাস আছে যে কিশোর চরিত্রের বাবা রিক্সা চালক ! বা
' কনি ' মতো সেই প্রচন্ড প্রতিকূলতার মধ্যে লড়াই করে যাওয়ার গল্প কি লেখা হচ্ছে ! সাহিত্যিকের জন্য 'ছাপা পৃষ্টাতেই আমার গর্ব , ছাপা পৃষ্ঠাতেই আমার লজ্জা '।
আমার বক্তব্য এই ধরণের লেখার জন্য আমাদের এই রকম জীবন যাপন প্রয়োজন । রবি ঠাকুরের কথায় -
"সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি যে আছি মাটির কাছাকাছি "। 

প্রশ্ন :  পাঠকদের জন্য আপনার বার্তা? ?

উত্তর : পাঠকই ভগবান , লেখককে গ্রহণ বা প্রত্যাখান সবটাই পাঠকের হাতে । তবে যতটুকু পাঠকের ভালোবাসা পেয়েছি তা আমি নত মস্তকে গ্রহণ করেছি । তবে পাঠকের উদ্দেশ্যে একটা কথা অবশ্যই বলতে চাই যে তারা যেন সব ধরণের লেখা পড়ে দেখেন , বিচার করেন । নতুন যারা লিখছেন তাদের লেখাও পড়ুন , গ্রহণ বা বর্জন করলেও তা পড়ে বিচার করে করুন এটুকুই পাঠকের কাছে আমার অনুরোধ 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. ভীষন ভালো ও খুব গুরুত্বপূর্ন আলোচনায় সমৃদ্ধ এই সাক্ষাৎকার ❤️❤️

    উত্তরমুছুন
  2. আমরা যারা নূতন লিখছি আমাদের কাছে খুব প্রয়োজনীয় আলোচনা ৷ প্রেরণা পেলাম এই আলোচনা থেকে ৷

    উত্তরমুছুন