পোস্ট বার দেখা হয়েছে
দুই যোগে এক
বৈশালী গাঙ্গুলী
আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান নিয়ে কিছু বলার আগে, আসুন দেখে নেওয়া যাক। অভিধানে কি আছে সংজ্ঞা।
আধ্যাত্মিক /বিশেষণ পদ/ আত্মা হইতে আগত; ধর্ম বিষয়ক, ব্রহ্ম বিষয়ক।
এর অর্থ পাঁচ তত্ত্বের যে শরীর যা নশ্বর তার ভেতরের শক্তির উৎস - যা অবিনশ্বর যাকে power house বা প্রাণ বলা হয়, সেই প্রাণ সম্বন্ধীয় সত্য- যা প্রচলিত সব ধর্মোপদেশের সারমর্ম- যা ব্রহ্ম (ব্রহ্মাণ্ডের) বিষয় বস্তু।
এবার দেখে নেওয়া যাক বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অভিধানে কী লেখা আছে-
বিজ্ঞান /বিশেষ্য পদ/ বিশেষ জ্ঞান, পরীক্ষা প্রমাণ যুক্তি ইত্যাদি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বা লব্ধ জ্ঞান বা বিদ্যা।
যার অর্থ জ্ঞান যা পরীক্ষা বা প্রমাণ সাপেক্ষ। আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই ব্রহ্মাণ্ডে একটি- যা চিরসত্য, শ্বাশত (eternal truth)
"জন্মিলে মরিতে হইবে"-
তাই যদি আমার এই প্রবন্ধের ইতি টেনে বলি-
"আধ্যাত্মিকতা বিজ্ঞান স্বীকৃত"
কারণ একমাত্র শ্বাশত সত্য "প্রাণ" সম্বন্ধীয় যুক্তি যাকে আধ্যাত্মিক বলা হয়- আর যা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সাপেক্ষ- প্রাণ শক্তির আধার।
কিন্তু এতো সহজ নয় কারণ দিনের পর দিন বিজ্ঞান ও টেকনোলজি অনিয়ন্ত্রিত ভাবে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৃদ্ধি আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছে, কেউ জানি না। আমরা চারদিকে তাকালে দেখতে পাই ডেভলাপার্স, নির্মাতা, বিতরণকারী এবং ক্রেতাগণ সর্বাধুনিক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বড় জিনিসের পিছনে পাগলের মত ছুটছে। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানবজাতির বর্তমান অবস্থা হল বাচ্চাকে চকলেটের দোকানে ছেড়ে দেবার মত। আজ আমরা বিছানায় শুয়ে শুয়ে যে কোন খাবার, দেখার বা শোনার জিনিস অর্ডার করতে পারছি এবং সেটা আমাদের দরজায় পৌঁছে যাচ্ছে। নতুন বা পুরোন কোন জিনিস কেনার জন্য আজ আমাদের বাইরে দোকানে যেতে হয় না। সবরকম জিনিসের জন্য ওয়েবসাইট আছে। ইন্টারনেট জগতে বিপ্লব নিয়ে এসেছে যেটা ভাল কথা। এখন আমরা আঙুলে ক্লিক করে যে কোন জিনিস কিনতে পারি, একটি জিনিস ছাড়া – সে হল প্রেম।আজ আমাদের এয়ারকণ্ডিশন, বাড়ী, গাড়ী এবং অফিস আছে।
কিন্তু এর সাথে আরেকটি সত্যি তিলে তিলে আমাদের শেষ করে দিচ্ছে তা হলো। দুর্বল আত্মিক শক্তি (inner power)। তাই অনেকে তাদের এয়ারকণ্ডিশন ঘরেও ঘুমাতে পারে না এবং তার জন্য তাদের ঘুমের বড়ি খেতে হয়। কেউ কেউ এয়ারকণ্ডিশন বাড়ীতে আত্মহত্যা করে। এসবের অর্থ কী? শুধুমাত্র বাইরের আরাম থেকে আমরা মনের শান্তি লাভ করতে পারি না। সে জন্যে আমাদের মনকে এয়ারকণ্ডিশন করতে হবে। জিমিং, কৃত্রিম সৌন্দর্য বর্ধক বিজ্ঞান সুন্দর চেহরা, খুব অল্প সময় সর্বশ্রেষ্ঠ বাড়ি, বর্ণালী জীবনের সুখ, বৈভব, আসবাবপত্র সব দিচ্ছে- অথচ সম্পূর্ণতার অভাবে আত্মগ্লানি, আত্মহত্যার পথ প্রশস্ত করছে।
এমন একটি সময়- একমাত্র আধ্যাত্মিকতা ও আত্মজ্ঞান সাহায্য করতে পারে।
নিজের স্থিতির সম্বন্ধে খুব ভাল করে না জেনে আত্মদর্শনের স্থানে প্রদর্শন, ও সত্যি মতামত বা আত্মচিন্তনের জায়গায় পর-চিন্তন,আত্মপ্রকাশের জায়গায় কৃত্রিম বিকাশে ভুলে যেতে বসেছি বিজ্ঞান শুধু কোলাহল নয়, বিজ্ঞান ঘুরে দেখা- নিজেকে খুঁজে পাওয়া।
সমাজের কী অবস্থা? জীবনের দ্রুতগতির পাল্লায় পড়ে মানুষ মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেছে; তাদের গুরুত্ব আমরা তুচ্ছ করে দিই। ব্যক্তিগত স্তর থেকে আন্তর্জাতিক স্তর পর্যন্ত আমরা সবরকম সংঘাত এবং অধার্মিক কর্মের পশ্চাতে যুক্তি খাড়া করতে চাই। তারপর, আমাদের সেই যুক্তি আমরা অবশিষ্ট সমাজের উপরে চাপিয়ে দিই। অনাদি কাল থেকে পৃথিবীতে নানা সমস্যা রয়েছে। যুগ যুগ ধরে যুদ্ধ, সংঘাত, জাতিভেদ ও সামাজিক মর্য্যাদা জনিত বৈষম্যে এবং পরিবারিক কলহে সমাজ ভুগেছে। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন সম্বন্ধে অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গী ছিল। অন্তরে তাঁরা তিনটি জিনিস সম্বন্ধে জাগরূক ছিলেন:
মানবজাতি, প্রকৃতি এবং এক অদৃশ্য শক্তি যা তাদের সামঞ্জস্যপূর্ণ রূপে ঐক্যবদ্ধ করে রাখে।
জীবন সম্বন্ধে তাঁদের দৃষ্টি শুধুমাত্র ব্যক্তিবিশেষ এবং প্রকৃতির স্থূল অস্তিত্ব হিসাবে ধরত না। তাঁরা বিশ্বাস করতেন এক শক্তি প্রকৃতি এবং সমস্ত জীবের ভিত্তি – এক অদৃশ্য শক্তি যা সমস্ত প্রাণীকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করে। এই শক্তিকে তাঁরা জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করতেন। তাঁরা এও বিশ্বাস করতেন যে সমস্ত প্রকৃতি এবং ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি জীব নানা আকার ও আকৃতির মুক্তোর মত সৃষ্টির একসূত্রে গাঁথা। তাই তাঁরা সকলের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া, পরস্পরের যত্ন নেওয়া এবং সমবেদনা অনুভব করার উপরে এত গুরুত্ব দিতেন। এই মানসিকতাকে আজ আমরা আদিম নাম দিয়েছি এবং তাঁদের জীবনধারণের পদ্ধতিকে বর্জন করেছি। কারণ আমরা আধ্যাত্মিক মতবাদকে ধর্মীয়, সামাজিক, জাতীয়তাবাদ মনে করি। তাকে আত্মদর্শনের প্রক্রিয়া মনে করি না।
আমরা বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে বাস করি। এই গ্রহের যেখানেই আমরা যাইনা কেন, আমাদের ইন্টারনেট চাই। কিন্তু ইন্টারনেট কানেকশানের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ইনার-নেট কানেকশান নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। আধ্যাত্মিকতা আমাদের শেখায় কেমন করে আমাদের অন্তর্জগত এবং বহির্জগত দুটোই ম্যানেজ করতে হয়। যে সাঁতার জানে, তার পক্ষে সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা করা আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা; কিন্তু যে সাঁতার জানে না, সে মুহূর্তের মধ্যে ডুবে যাবে।
সময় চলে এসেছে বিচ্ছিন্ন ভাবে যদি আমরা দুটো না ভেবে সম্বন্বয়ে এগিয়ে যাওয়া। এবার দেখতে হবে বিজ্ঞান সম্মত গভীর চিন্তনে 'আমি' কে? আর এই 'আমি' পরিচয় যদি পাওয়া যায় তবে- 'আমিত্বের দর্প চূর্ণ হবে আর 'আমি' হারা হয়ে ডিপ্রশনের ওষুধ খেতে হবে না। এই আমির পরিচয়ের জন্য কোন বাইরের জগতের 'বাবা', গুরু,ফকির,কর্তার দরকার পরে না। শুধু আত্মচিন্তন ও আত্মদর্শনের দরকার হয়।
সেল্ফি ক্যামেরায় যেমন বাইরের আমিকে চিনে, আমরা অনেকটা আত্মতুষ্ট হতে পেরেছি। ঠিক তেমন সেল্ফ স্টাডি করে মূলভিত্তি যা বলি শিকড়ের অনুসন্ধানে বিজ্ঞানের আধারের সহযোগে আমরা নিশ্চিত অনেকটা উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারবো।
"বাহির পাণে চোখ মেলেছি- এবার হিয়ার মাঝে হিরের খোঁজ করে,ঝিনুকের ভিতর আসল মুক্ত সন্ধান হোক। বিজ্ঞানে আধ্যাত্মিক বিকাশ হোক।"

1 মন্তব্যসমূহ
অপূর্ব প্রকাশে মুগ্ধ হলাম। সুচিন্তিত বিশ্লেষণ এবং উপসংহার মনে রাখার মত।
উত্তরমুছুন