একটি ঝড়ের রাত ও বাঁশিওলা | পৌষালী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


একটি ঝড়ের রাত
    ও
বাঁশিওলা
       


আজকের সন্ধ্যে বড়ই নির্মোহ। যত কিছু সাধ আহ্লাদ সবকিছুই কাল ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। আজ এ মুহূর্ত বড়ই শান্ত। কোনরকম কোন শব্দ নেই। চারিধার বড়ই নিস্তব্ধ, নির্জনতার পোশাক পরেছে। কয়েকটা কাক কা'কা' করে ডেকে যাচ্ছে অবিরত, খুঁজে বেড়াচ্ছে ওর নিজস্ব বাসস্থান আজ যা আর নেই। খড়কুটো বেঁধেছিল সামনের ওই রাধাচূড়ার বুকে।নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে বাসাখানি। ছানাগুলোর কোন অস্তিত্বই নেই। থাকবে কি করে স্বয়ং রাধাচূড়াই তো নুয়ে পড়েছে পাশের অট্টালিকার গায়ে। হ্যাঁ, রাধাচূড়ার সেই ফুলের সম্ভারগুলোর আজ কোনো চিহ্ন টুকুই নেই। একটাও ফুলকে ছাড়ল না। শূন্যতা সেখানে। অনাথ হয়ে গেছে গাছটা।যেখানে তাকানো যাচ্ছে শুধু নেই নেই। সবখানেই যেন অভাবের চিহ্ন। সব ছারখার হয়ে গেছে। সামনের ওই কুঁড়ে ঘরটায় বারো কি তের বছরের আধ ময়লা ছেলেটা তার মা'কে নিয়ে থাকত। মা রাস্তার যত ধূলো ময়লা,কাগজ পরিস্কার করত। কাগজ কুড়ানির ছেলেটাও মায়ের সাথে হাতে হাত লাগিয়ে কাগজ কুড়োত। ওই ছোট্ট অপরিস্কার কুঁড়ে ঘরটিই ছিল একমাত্র ওদের সম্বল। অর্ধেক দিনই অর্ধাহারে কাটত মা'য়ে পো'য়ে। স্কুলের নামগন্ধ নেই, পরনে জীর্ণ ছিন্ন বস্ত্র, রোগা, ময়লা, অর্ধেক দিন স্নান না করা অপরিস্কার জামা পরে কাটিয়ে দেওয়া ছেলেটি যে বড্ড ভালো বাঁশি বাজাতো।ওর বাঁশির সুরধ্বনিতে রাতের নিশুতি অন্ধকার, মিষ্টি সুরেলা সুরে ছেয়ে থাকত। আর সামনের অট্টালিকা বাড়ির এগারো কি বারো বছরের বাচ্চা মেয়েটার ভারী ভালো লাগত কাগজ কুড়ানির ছেলেটির বাঁশির আওয়াজ। রোজ রাতে ওর বাঁশির আওয়াজে চোখ বুজে আসতো মেয়েটির। মেয়েটি রোজ বারান্দায় বসে সামনের ওই রাধাচূড়া গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ছেলেটার বাঁশির আওয়াজ শুনতে পেত। এক একটা বাঁশির সুরে সুরে ও রাধাচূড়ার গায়ে স্বপ্ন বুনতো। রোজ সকালে অট্টালিকার মস্ত বারান্দায় ওই বাচ্চা মেয়েটি মুখ বাড়িয়ে দেখত ওর বাঁশিওলাকে, মায়ের সাথে কাগজ কুড়োতে। ওরও ইচ্ছে হত নেমে যেতে প্রাসাদ থেকে পথের মাঝে ওদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাগজ কুড়োতে। কিন্তু পথ ও প্রাসাদের মাঝে যে বিস্তার প্রাচীর। শুধু মুগ্ধ দৃষ্টিতে ওর রাতের বাঁশিওলার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারতনা। ওই চেয়ে চেয়ে দেখাই ওর একমাত্র একান্ত দামি সম্বল ছিল। সে ছিল সুখের যাপন।
সহ্য হলোনা এই সুখ। সেদিন রাতে তাড়াতাড়ি মা ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল মেয়েটাকে। তাই সেই রাতে আর বাঁশির আওয়াজ শুনতে পায়নি মেয়েটি। সকালে উঠেই রোজের নিয়মে বারান্দায় গিয়েছিল রাধাচূড়াকে দেখবে বলে। নেই... নেই সেই সাধের প্রাণের কাছের রাধাচূড়াটি আর নেই। ভেঙে নুয়ে পড়েছে। একটি ফুল পর্যন্ত নেই। আর সেই বাঁশিওলার ওই ছোট্ট কুঁড়ে ঘর সেও ভেঙে মাটিতে পড়ে আছে। গাছের ডাল ভেঙে ছোট্ট কুঁড়ে ঘরের ভেতর আছড়ে পড়েছে। বিশাল গাছের ডালের তলায় চাপা পড়ে আছে দুটো অনামী প্রাণ। তাদের না থাকায় হয়ত খুব কারোর যায় আসবে না। দৈনন্দিন জীবনে কারোরই মনেতে দাগ কাটবে না ওদের এই অঘোরেই প্রাণটা বেরিয়ে যাওয়ায়। কিন্তু ওই বাচ্চা মেয়েটা যে সবার অলক্ষ্যেই ওই নোংরা অর্ধেক দিন স্নান না করা আধপেটা, সারারাস্তায় কাগজ কুড়িয়ে বেড়ানো ছেলেটাকে যে নিজের ছোট্ট জগতের একান্ত বাঁশিওয়ালা ভেবেছিল, যে ওর বাঁশির এক একটা সুরের সঙ্গে নিজের ছোট ছোট স্বপ্ন নকশিকাঁথায় বুনেছিল তার যে গায়ে খুব লেগেছে। তার যাপনে যে খুবই যায় এসেছে। সে কাঁদতেও পারছেনা। সে চিৎকার করে কাউকেই নিজের দামি হারানোর কথা বলতে পারছে না। আর সে যে কখনো কোনদিনও ওই বাঁশির সুরধ্বনি শুনতে পাবে না। এ কান্নার যে কোনোই রঙ নেই। এ ব্যথার যে কোনই নাম নেই। ওই নিষ্পাপ নিরীহ বাঁশিওলার প্রাণের মতো চাপা পড়ে যাবে ওর টুকরো টুকরো কষ্টের ভগ্নাংশ। এরকমভাবেই কত প্রাণ, কত স্বপ্ন, কত ছোট ছোট ইচ্ছে চাপা পড়ে যায় কেউই তার কোনো হদিশই রাখেনা। কোনো অভিধানের পাতায় এই কষ্ট নামক শব্দের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়না। অবলীলায় হারিয়ে যায় নীরব ছোট প্রাণগুলো। হয়ত ওই রাধাচূড়া আবার নতুন করে ফুলে ফুলে ভরে উঠবে। ওই এগারো বারো বছরের বাচ্চা মেয়েটাও কুঁড়ি হয়ে ফুটে বিকশিত করবে তার সৌন্দর্যের সৌরভ কিন্তু কখনোই কোনো কিছুরই বিনিময়ে বাঁশিওলা আর ফিরে আসবে না। ফিরে আসেনা। ফেরা হয়েও না। যে যায় চিরতরেই চলে যায়, নিংড়ে নিয়ে যায় সবটুকুই। নিঃস্ব রিক্ত করে রেখে যায়। যেটুকু পড়ে থাকে শুধু হাড় পাঁজরা। এক অমোঘ অনুভূতি আকাশে বাতাসে হাওয়ার মত ঘুরপাক খায়।

আর যেন কোনো বাঁশিওলার প্রাণ এভাবে অকালে ঝরে না যায়। আর যেন কোনো স্বপ্ন ফুটে ওঠার আগেই ঝরে না যায়।।

এ যন্ত্রণা ব্যাখ্যা করা বড়ই দূরহ। এ কষ্টের সঙ্গে যাপন করা কল্পনাতীত। শুধুই জাবর কাটা কোনো এক একলা মুহূর্তে নির্জন সন্ধ্যায় এক নীল আলোয় ঘেরা বারান্দায় চাঁদকে সাক্ষী রেখে একা...একা..শুধুই একা...একেবারেই একা...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ