পোস্ট বার দেখা হয়েছে
অস্ট্রেলিয়া থেকে চার বছর পর সদ্য দেশের মাটিতে পা রেখেছে আকাশ। এয়ারপোর্টএ দুবার পরীক্ষার পর হাতে একটা স্লিপ দিয়ে বললো, আপনি হোম কোয়ারেন্টাইন এ অথবা নিজের ঘরে থাকবেন ১৪দিন। ১৪ দিন নিজের ঘরের থেকে বের হবেন না। পরিবারের কাউকে স্পর্শ করবেন না।নিজের বাথরুম বাড়ির অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দেবেন না। আর যেটা খাবেন নিজের ঘরে বসেই খাবেন।
আকাশের নিজের শরীরে একটু কষ্ট হচ্ছিল। এ সব কিছু শোনার পর আকাশ বাড়ি ফিরে এলো, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আকাশের বাবা, মা, স্ত্রী পিউ ও আদরের ছোট্ট ফুটফুটে চার বছরের ছেলে নীল এইভাবে যে ওকে দেখবে, কেউ আশাই করতে পারিনি।
বাড়ি ফিরে নীরবে ঘরে প্রবেশ করে আকাশ।তারপর পোশাক বদলিয়ে ভালো করে স্যানিটাইজ করে নেয়।তারপর ঘরের টেবিলে ঢেকে রাখা খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ে। পাশের ঘর থেকে ছোট্ট নীল ফোন করে আদো আদো কণ্ঠে বলে, পাপ্পা আমি তোমাল কাছে যাবো।তারপর পিউ ফোনটা নিয়ে বলে কতদিন ধরে অপেক্ষা করে আছি, তোমার সঙ্গে একটু মন খুলে কথা বলবো। আর ভালো লাগছে না গো.....
আকাশ সান্ত্বনা দিয়ে বলে একটু অপেক্ষা করো, মাত্র তো দু'টো সপ্তাহ। আমি তো আছি তোমারই পাশে।
মন খারাপ করে ঘুমিয়ে পড়ে আকাশ। সকালে প্রচন্ড ক্লান্তি নিয়ে ঘুম ভাঙে ।মাথাটা ভার হয়ে রয়েছে।গলায় অল্প অল্প ব্যথা অনুভব করছে। দরজার ওপাশ থেকে মা ও বাবা দুজনেই কথা বলে আকাশের সঙ্গে বিষণ্ণ মুখে।মায়ের চোখে জল ছলছল করছে।
পিউ ও দূর থেকে জলখাবার টা দিয়ে বাইরে থেকে কথা বলে।কিভাবে যে দিন গুলো অতিক্রম করছে আকাশ, ভাবলে তার বুকের মধ্যে ব্যাথা করে উঠছে।
এইভাবে কখন যে১৩দিন পার হয়ে গেলো, নিজেই জানে না আকাশ। ও ভেবেছিল Unlucky 13 ওভার করতে পারলেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে।তাই অনেক রাত ধরে আকাশ...পিউ ও আদরের নীলের সঙ্গে কথা বলে ঘুমিয়ে পড়ে।
পিউ আনন্দে চিৎকার করে ভগবানকে ধন্যবাদ জানায়।আর বলে অপেক্ষার দিন শেষ।কালকেই ১৪দিন পূর্ণ হবে, আর আকাশ ওদের ঘরে আসবে। একটা ভীষণ চাপা আনন্দের পারদ পিউয়ের মনের মধ্যে ওঠানামা করতে থাকে।
সকাল হতেই আকাশ ওঠার চেষ্টা করে, কিন্তু প্রচন্ড গা গরম। উঠতে পারে না। ওদিকে পিউ স্নান সেরে আকাশের ঘরে জলখাবার রেখে আকাশকে সুপ্রভাত জানিয়ে একটু মিষ্টি হেসে চলে যায়।আকাশের মুখেও হাসি থাকে, কিন্তু সেই হাসিটা খুব মলিন।
আজকে খুব আনন্দের দিন। আজ সারা বাড়ি উৎসবে মেতে উঠেছে।নীল খুব আনন্দ করছে, তার পাপ্পার বুকে মাথা রেখে আদর খাবে বলে।আকাশের বাবা, মায়ের মুখেও হাসি।
মধ্যাহ্ন ভোজ করার সময় আকাশ তখন আর বিছানা থেকে শরীরটাকে টেনেতুলতে পারে না। নিজের কপালে হাত দিয়েই চমকে ওঠে আকাশ। যেনো পুড়ে যাচ্ছে। গলায় প্রচন্ড ব্যাথা। কিরকম আতঙ্কিত চোখে দরজার বাইরের দিকেতাকিয়ে থাকে, তার আদরের ছোট্ট নীলের মিষ্টি মুখ দেখার আশায়।ঠক ঠক করে কাঁপতে থাকে তার সারা শরীর। কোনো উপায়ে হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে দরজাটা লক করে ওখানেই লুটিয়ে পড়ে আকাশ।সে আজ ধরাতলে শায়িত।
ওদিকে নীল গুটি গুটি পায়ে এসে দরজায় নক করে আর বলে পাপ্পা....পাপ্পা... আমি তোমাল কাতে দাবো।আকাশ কোনো সাড়া না দেওয়ায়, নীল ছুটে গিয়ে মাকে ডেকে বলে পাপ্পা কতা বলচে না। সঙ্গে সঙ্গে পিউ ছুটে এসে দরজা ঠেলে দেখে আকাশ অঘোরে মাটিতে পড়ে রয়েছে। তাকে ডেকে কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ায় শরীরে হাত দিয়ে ডাকতে গিয়ে চমকে ওঠে পিউ। দেখে তার শরীর হিমশীতল বরফের মতো। পিউ সঙ্গে সঙ্গে শ্বশুর শাশুড়িকে খবর দিয়ে , স্থানীয় ডাক্তারকে ডেকে আনে। ডাক্তার আকাশের পার্লস টিপে নির্বাক হয়ে যায়। ডাক্তারবাবুকে জানতে চাওয়ার আগেই তিনি দুঃসংবাদ টি জানিয়ে নীরবে চলে যান।
এই দুঃসংবাদটি শুনে পিউ চিৎকার করে কেঁদে বলে, "আমার ছোট্ট নীল যে তার পাপার কাছে, তার পাপার বুকে মাথা রেখে আদরের অপেক্ষায় আছে। আমি আজ ওর পাপার অপূর্ণ আদর কি করে মেটাবো ভগবান......!"এই বলে নীলকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যায়। ছোট্ট নীল দিশে হারা চোখে একবার তার পাপার দিকে আর একবার তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, মা..... পাপ্পা আমায় আদল কলবে না.....।
*************************
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ভালোবাসার প্রিয়জন বা আপনজনকে কেড়ে নিতে কোনো দ্বিধা বোধ করে না।এটাই তার শেষ জবানবন্দী।

1 মন্তব্যসমূহ
অসামান্য
উত্তরমুছুনকথামালার গাঁথুনী