পূর্ণেন্দু পত্রী




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

পূর্ণেন্দুশেখর পত্রী 
(ফেব্রুয়ারি ২, ১৯৩১ - মার্চ ১৯, ১৯৯৭) 


পূর্ণেন্দু পত্রী নামে সর্বাধিক পরিচিত; ছদ্মনাম সমুদ্রগুপ্ত) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, সাহিত্য গবেষক, কলকাতা গবেষক, চিত্র-পরিচালক ও প্রচ্ছদশিল্পী।

।। কবিতা। ।

যে টেলিফোন আসার কথা ছিলো

যে টেলিফোন আসার কথা সে টেলিফোন আসেনি। 
 প্রতীক্ষাতে প্রতীক্ষাতে 
 সূর্য ডোবে রক্তপাতে 
 সব নিভিয়ে একলা আকাশ নিজের শূণ্য বিছানাতে। 
 একান্তে যার হাসির কথা হাসেনি। 
 যে টেলিফোন আসার কথা আসেনি। 
 
 অপেক্ষমান বুকের ভিতর কাঁসন ঘন্টা শাঁখের উলু 
 একশ বনেরবাতাস এস একটা গাছে হুলুস্থুলু 
 আজ বুঝি তার ইচ্ছে আছে 
 ডাকবে আলিঙ্গনের কাছে 
 দীঘির পড়ে হারিয়ে যেতে সাঁতার জলের মত্ত নাচে। 
 এখনো কি ডাকার সাজে সাজেনি? 
 যে টেলিফোন বাজার কথা বাজেনি। 
 তৃষ্ণা যেন জলের ফোঁটা বাড়তে বাড়তে বৃষ্টি বাদল 
 তৃষ্ণা যেন ধূপের কাঠি গন্ধে আঁকে সুখের আদল 
 খাঁ খাঁ মনের সবটা খালি 
 মরা নদীর চড়ার বালি 
 অথচ ঘর দুয়ার জুড়ে তৃষ্ণা বাজায় করতালি। 
 প্রতীক্ষা তাই প্রহরবিহীন 
 আজীবন ও সর্বজনীন 
 সরোবর তো সবার বুকেই, পদ্ম কেবল পর্দানশীল। 
 স্বপ্নকে দেয় সর্বশরীর, সমক্ষে সে ভাসে না। 
 যে টেলিফোন আসার কথা সচরাচর আসে না।
 
======

হে স্তন্যদায়িনী 

তোমার দুধের মধ্যে এত জল কেন? 
 তোমার দুধের মধ্যে এত ঘন বিশৃঙ্খলা কেন? 
 
 রক্ত ঝরে না ভেজালে 
 কোনো সুখ দরজা খোলে না। 
 ময়ূরও নাচে না তাকে দু-নম্বরী সেলামী না দিলে। 
 হাতুড়ির ঘায়ে না ফাটালে 
 রাজার ভাঁড়ার থেকে এক মুঠু খুদ খেতে 
 পায় না চড়ুই। 
 স্বপ্নে যারা পেয়ে গেছে সচেতন ফাউন্টেন পেন 
 তাদেরও কলমে দেখ 
 সূর্য কীরণের মত কোনো কালি নেই। 
 
 হে স্তন্যদায়িনী 
 তোমার দুধের মধ্যে এত জল কেন? 
 তোমার দুধের মধ্যে প্রতিশ্রুত ভাস্কর্যের পাথর কেবল।
 
======

নিষিদ্ধ ভালোবাসার তিন সাক্ষী

তুমি যখন শাড়ির আড়াল থেকে 
 শরীরের জ্যোৎস্নাকে একটু একটু করে খুলছিলে, 
 পর্দা সরে গিয়ে অকস্মাৎ এক আলোকিত মঞ্চ, 
 সবুজ বিছানায় সাদা বাগান, 
 তুমি হাত রেখেছিলে আমার উৎক্ষিপ্ত শাখায় 
 আমি তোমার উদ্বেলিত পল্লবে, 
 ঠিক তখনই একটা ধুমসো সাদা বেড়াল 
 মুখ বাড়িয়েছিল খোলা জানালায়। 
 
 অন্ধকারে ও আমাদের ভেবেছিল 
 রুই মৃগেলের হাড় কাঁটা। 
 পৃথিবীর নরনারীরা যখন নাইতে নামে আকাঙ্খার নদীতে 
 তখন রুই মৃগেলের চেয়ে আরো কত উজ্জ্বল 
 দীর্ঘশ্বাস সহ সেই দৃশ্য দেখে বেড়ালটা ফিরে চলে গেলো 
 হাড়কাঁটার খোঁজে অন্য কোথা অন্য কোনখানে। 
 দ্বিতীয় সাক্ষী ছিল তোমার হত্যাকারী চোখ 
 আর তৃতীয় সাক্ষী আমার রক্তের সঙ্গে ওতপ্রোত শুয়ে আছে।
 
======

 বলো

১ 
 কে ডাকল? দরজা খুলি। কেউ নেই। পাতাবাহারের 
 ডালে-ডালে লুটোপুটি হাওয়ার হাসির খিলখিল। 
 হঠাৎ তোমার মুখ। বুকভর্তি দুপুরের খাঁ খাঁ। 
 বলো, কেন ভাঙলে নির্বাসন? 
 
 ২ 
 নিজের ব্যথার ছুঁচে নিজে আমি সেলায়ে-সেলায়ে 
 নকশি কাঁথার মতো। চতুর্দিকে প্রাণের প্রাণীর 
 প্রাত্যহিক দিনলিপি। প্রত্যেকের নিশ্বাসে-প্রশ্বাসে 
 মুহূর্তে-মুহূর্তে কাঁপা। একেই কি বলে সংলগ্নতা? 
 
 ৩ 
 উত্তরবঙ্গের জল, স্বদেশে ভাসানো বন্যজল! 
 রিলিফের নৌকো, দেখতে এত সাধ? সর্বস্ব হারানো 
 এক বাটি অন্নে নুয়ে, এ দৃশ্যে তো খল খল হেসেছ অনেক। 
 আর কোন ধ্বংসদৃশ্য, বলো, দেখে জিঘাংসা জুড়োবে? 
 
 ৪ 
 উড়ছে খরার ভস্ম উত্তরভারতে। ট্রেনে ট্রেনে 
 নিদ্রাহীন দেখে ক্লিষ্ট যার চোখ, সে কবিকে বলো 
 কিছু লিখে দিতে। জানি। প্রতিবেশী তারাও জানুক 
 কত খরা মুছে মুছে ছিড়ে গেছে আমাদেরও আঁচলের পাড়। 
 
 ৫ 
 শীতের পোশাকহীন বালিকার নগ্নশরীরের 
 হিহি কাঁপা, এই দৃশ্যে মানুষের দিনলিপি পড়ে নেওয়া যায়। 
 মাইকেলএঞ্জেলো এত গড়ে গেল পাথরে-পাথরে, 
 তবুও মানুষ তাঁর ভাস্কর্যের চেয়ে ঢের ম্লান রয়ে গেল। 
 
 ৬ 
 মেঘ-পঞ্চায়েত থেকে রিলিফের দুর্গত অঞ্চলে 
 রোদের কম্বল, খান, ত্রিপল কত কী পৌছে গেল। 
 ডাকবাকসে উপছে পড়ে খাম তবু, পোস্টকার্ড তবু। 
 অক্ষরের পরিবর্তে আর্তস্বর। বলো, কী লিখেছে? 
 
 ৭ 
 ডাকো, কাছে ডাকো, ডেকে বলো কী কী চাই। 
 বৃষ্টি চাও? বৃষ্টি পাবে জুই ফুল খসানো খরায়। 
 নাকি চাও কলমের কান্না মুছতে ব্লটিং পেপার? 
 শীতের চাদর? আমি কাঁথা বুনছি শোকের সুতোয়। 
 
 ৮ 
 মৃত্যু এসেছিল। তাকে একটু বোসো বলে সত্যবান 
 কাঠ কাটতে চলে গেল। আমিও তোমাকে সেইভাবে 
 চেয়ার এগিয়ে দিয়ে চলে যাবো চিরন্তন শিমূল-ছায়ায়। 
 তুমি কী সাবিত্রী হবে? ভালোবাসা? বলো, শুনে বাঁচি।। 
 
======


আশ্চর্য

একটি নারীর মাঝে অকস্মাৎ খুঁজে পায় কেউ 
 আশ্চর্যের নীলিমাকে। দৃশ্যহীন ঘন অন্ধকারে 
 নক্ষত্ররাজিরা গেছে আকাশে সোনালী শিল্প রুয়ে 
 তার স্নিগ্ধ সুষমার মোহাচ্ছন্ন ঘ্রাণ নিতে নিতে 
 ঘুমের মতন জাগে। ঘুমোতে দেয় না স্তব্ধতারে। 
 একে একে আবরণ পূজার ফুলের মতো ঝরে। 
 তারপর সেই দুটি অপরুপ লজ্জার ভঙ্গিমা 
 একে অপরের বন্য বাসনাকে বাহু দিয়ে বেঁধে 
 একে অপরের মুখে নিজের দেহের অন্ন দিয়ে 
 যে শয্যা স্রোতের মতো তাতেই নিদ্রিত থাকে শুয়ে। 
 
 একটি নারীর মাঝে অকস্মাৎ খুঁজে পায় কেউ 
 ক্ষণিকের নীলিমাকে। কঠিন প্রভাত খর রোদে 
 রজনীর খেলাধুলা দ্রুতহাতে যত দেয় ধুয়ে, 
 আবার পুষ্পিত হয়ে ওঠে তবু পৃথিবীর রাত। 
 
======

কথপোকথন ৭

-দেখ, ওই কচুপাতার ওপর জমে থাকা পানি 
 কী স্বচ্ছ, আর কেমন স্থির! 
 গতরাতের বৃষ্টির পরে 
 যতটুকু জল গড়িয়ে পড়লো নদী বা পুকুরে 
 তার থেকে ঢের স্বল্প হয়েও দৃষ্টিকারে 
 যেন জলের সৌন্দর্য মুক্তোর মত হবে… 
 -আমিও বেশ দেখি, বৃষ্টির পরে 
 সবুজে চোখ ফিরিয়ে আনি; সেদিন যখন 
 দৃষ্টিসীমায় পেয়ে গেছি কচুপাতা আশ্চর্য! 
 সে পাতাটায় জল ছিল না জানো? 
 তবে মুক্তোর মত মনে হলেও 
 ওই জলোমুক্তোয় মালা হবে না জেনো। 
 -বুঝলাম! মালা গাঁথবার স্বাদ 
 সে কখনও হয়নি আমার তবু 
 যদি কখনও গাঁথবার আকাঙ্খা পেয়ে বসে তখন 
 তোমার কথা যা হারিয়ে যাচ্ছে, যায় ক্রমাগত 
 তাকেই উপকরণ করে নেবো মালা গেঁথে… 
 -হু! কতহাজার জনের কতশত মালা, বুঝবে? 
 বুঝবে কোনটা কার? 
 -বুঝতে চাইব কেন? 
 যাকে চিনি না কিংবা যে অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে 
 তাকে আর কেন হাতরিয়ে খোঁজা 
 মনের শত আকাশে আকাশে 
 কেন বল তবে পিচ্ছলে পড়া! 
 -পিচ্ছলে তুমি পড়বে মনে রেখো.. 
 -না পড়লে হাত বাড়াবে কে, বল! 
 -থাক বাবা আর না, ওই কচুপাতাটা আনো 
 দেখো জল যেন না পড়ে যায়, সাবধানে- হ্যাঁ 
 -জল ধরে রাখবার ইচ্ছে আমার প্রবল 
 সে তুমি জানো, আর তাতেই দু’জনের তৃপ্তি 
 -তুমি না-অসভ্য!
 
======

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. আজীবন ও সার্বজনীন সেই টেলিফোন আর আর আসেনি...
    নিজের ব্যথায় ছুঁচ দিয়ে সেলাই নক্সিকাঁথার মত
    মালা গাঁথার স্বাদ কখন হয়নি...
    অপূর্ব প্রতি লাইন
    সমৃৃৃৃদ্ধ হলাম সংগ্রহে

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ সুন্দর সব লেখা সংযোজিত হলো ... সত্যি এসব লেখা পড়ে শেখা যায় প্রতিনিয়ত 🙏

    উত্তরমুছুন