সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ – ৮ জুলাই ২০০৩)




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

সুভাষ মুখোপাধ্যায় 
(১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ – ৮ জুলাই ২০০৩)

  

।। কবিতা। ।


একটি সংলাপ 

মেয়ে: তুমি কি চাও আমার ভালবাসা ?
ছেলে: হ্যাঁ, চাই !
মেয়ে: গায়ে কিন্তু তার কাদা মাখা !
ছেলে: যেমন তেমনিভাবেই চাই ।
মেয়ে: আমার আখেরে কী হবে বলা হোক ।
ছেলে: বেশ!
মেয়ে: আর আমি জিগ্যেস করতে চাই ।
ছেলে: করো ।
মেয়ে: ধরো’ আমি কড়া নাড়লাম ।
ছেলে: আমি হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যাব !
মেয়ে: ধরো’ তোমাকে তলব করলাম ।
ছেলে: আমি হুজুরে হাজির হব ।
মেয়ে: তাতে যদি বিপদ ঘটে ?
ছেলে: আমি সে বিপদে ঝাঁপ দেব ।
মেয়ে: যদি তোমার সঙ্গে প্রতারণা করি?
ছেলে: আমি ক্ষমা করে দেব ।
মেয়ে: তোমাকে তর্জনী তুলে বলব, গান গাও ।
ছেলে: আমি গাইব ।
মেয়ে: বলব,কোনো বন্ধু এলে তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দাও।
ছেলে: বন্ধ করে দেব ।
মেয়ে: তোমাকে বলব, প্রাণ নাও ।
ছেলে: আমি নেব ।
মেয়ে: বলব, প্রাণ দাও ।
ছেলে: দেব ।
মেয়ে: যদি তলিয়ে যাই ?
ছেলে: আমি টেনে তুলবো ।
মেয়ে: তাতে যদি ব্যথা লাগে ?
ছেলে: সহ্য করব ।
মেয়ে: আর যদি থাকে বাধার দেয়াল ?
ছেলে: ভেঙ্গে ফেলব ।
মেয়ে: যদি থাকে একশো গিঠঁ ?
ছেলে: তাহলেও ।
মেয়ে: তুমি চাও আমার ভালবাসা ?
ছেলে: হ্যাঁ, তোমার ভালবাসা ।
মেয়ে: তুমি কখনোই পাবে না ।
ছেলে: কিন্তু কেন ?
মেয়ে: কারণ, যারা ত্রীতদাস আমি তাদের কখনই ভালবাসি না ।

=====

লোকটা জানলই না 

বাঁ-দিকের বুক পকেটটা সামলাতে সামলাতে
হায়! হায়! লোকটার ইহকাল পরকাল গেল!
অথচ আর একটু নীচে হাত দিলেই
সে পেতো আলাদ্বীনের আশ্চর্য প্রদীপ,
তার হৃদয়!
লোকটা জানলোইনা !
তার কড়ি গাছে কড়ি হল।
লক্ষ্মী এল রণ-পায়ে
দেয়াল দিল পাহাড়া
ছোটলোক হাওয়া যেন ঢুকতে না পারে!

.
তারপর একদিন
গোগ্রাসে গিলতে গিলতে
দু'আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে-
কখন খসে পড়েছে তার জীবন-
লোকটা জানলই না!

====

হাত বাড়িয়ে রেখেছি~

তোমার ঘৃণার দিকে
আমি ফিরিয়ে রেখেছি
আমার ভালোবাসার মুখ
যেখানে গতি বলতে শুধুই ঘুরপাক
এগোনো মানেই দেওয়ালে মাথা ঠেকে যাওয়া
সংগ্রামের আরেক নাম যেখানে নিজেকে ভাঙা
তুমি সেই অন্ধগলিতে দাঁড়িয়ে
বিপন্ন চোখের আগুনে চাইছ
আমাকে ভস্ম করে দিতে
আর আমি
তোমার অভিশাপগুলো লুফে নিয়ে
ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছি আমার শুভেচ্ছা
আমি গলা তুলে জানান দিচ্ছি
খোলা রাস্তার কোন মুখে
আমি তোমারই জন্যে দাঁড়িয়ে
হাত বাড়িয়ে রেখেছি---
অন্যদিকে মুখ ফিরিয়েও
তুমি আমার হাত যাতে ধরতে পারো।।

====

আমরা যাবো 

জলের কলে টিপ্ টিপ্
টিপ্ টিপ্ |

এখুনি বাসন-ধোয়া জলে
নিজের মুখ দেখবে
ধোঁয়ায় ধোঁয়াকার আরও একটি সকাল |

ততক্ষণ শানবাঁধানো অন্ধকার
দেয়ালে-দেয়ালে মাথা খুঁড়ে মরুক |
আর আমরা জলের কলে শুনি -
চোখ বড়-বড় করা আকাশের নীচে
পাথরের নুড়িতে-নুড়িতে লাফিয়ে-পড়া
এক দিগভ্রান্ত দামালো নদীর কলতান |

তারপর সারাটা দিনমান মানুষ
পায়ে চাকা বেঁধে চলুক !
যেখানে বন্দে মাতরম্ বলে মানুষ জীবন দিয়েছিল
কাটা হাত নিয়ে সেখানে ইেটে যাক
কাঠের পা |

জলের কলে টিপ্ টিপ্
টিপ্ টিপ্ |

আমরা বলেছিলাম যাব
সমুদ্রে |
নদী বলেছিল যাবে
সমুদ্রে |
আমরা বলেছিলাম যাব
সমুদ্রে |

আমরা যাব ৷

=====

ফুল ফুটুক না ফুটুক

ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।

শান-বাঁধানো ফুটপাথে
পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ
কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে
হাসছে।

ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।

আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে
তারপর খুলে –
মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে
তারপর তুলে –
যে দিনগুলো রাস্তা দিয়ে চলে গেছে
যেন না ফেরে।

গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে
একটা দুটো পয়সা পেলে
যে হরবোলা ছেলেটা
কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত
– তাকে ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো।

লাল কালিতে ছাপা হলদে চিঠির মত
আকাশটাকে মাথায় নিয়ে
এ-গলির এক কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে
রেলিঙে বুক চেপে ধ’রে
এই সব সাত-পাঁচ ভাবছিল –

ঠিক সেই সময়
চোখের মাথা খেয়ে গায়ে উড়ে এসে বসল
আ মরণ ! পোড়ারমুখ লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি !

তারপর দাড়ম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ।
অন্ধকারে মুখ চাপা দিয়ে
দড়িপাকানো সেই গাছ
তখন ও হাসছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ