পোস্ট বার দেখা হয়েছে
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
(জন্ম: নভেম্বর ২৫, ১৯৩৩ - মৃত্যু: মার্চ ২৩, ১৯৯৫)
ছিলেন ভারতীয় বাঙালি কবি, ওপন্যাসিক, লেখক ও অনুবাদক, যিনি জীবনানন্দ-উত্তর যুগের বাংলা সাহিত্যের একজন প্রধান আধুনিক কবি হিসেবে বিবেচিত। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত এবং আলোচিত ছিলেন। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত তার যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো কাব্যগ্রন্থ ইংরেজি এবং মৈথিলী বাষায় অনুদিত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
প্রথম উপন্যাস লেখেন কুয়োতলা।কিন্তু কলেজ - জীবনের বন্ধু সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে তার বনাঞ্চল - কুটির চাইবাসায় আড়াই বছর থাকার সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একজন সফল লিরিকাল কবিতে পরিণত হন। একই দিনে বেশ কয়েকটি কবিতা লিখে ফেলার অভ্যাস গড়ে ফেলেন তিনি। শক্তি নিজের কবিতাকে বলতেন পদ্য। ভারবি প্রকাশনায় কাজ করার সূত্রে তার শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজ বের হয়। পঞ্চাশের দশকে কবিদের মুখপত্র কৃত্তিবাস পত্রিকার অন্যতম কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তার উপন্যাস অবনী বাড়ি আছো? দাঁড়াবার জায়গা ইত্যাদি প্রকাশিত হয়। রূপচাঁদ পক্ষী ছদ্মনামে অনেক ফিচার লিখেছেন।
।। কবিতা। ।
জন্মদিনে
জন্মদিনে কিছু ফুল পাওয়া গিয়েছিলো।
অসম্ভব খুশি হাসি গানের ভিতরে
একটি বিড়াল একা বাহান্নটি থাবা গুনে গুনে
উঠে গেলো সিঁড়ির উপরে
লোহার ঘোরানো সিঁড়ি, সিঁড়ির উপরে
সবার অলক্ষ্যে কালো সিঁড়ির উপরে।
শুধু আমিই দেখেছি
তার দ্বিধান্বিত ভঙ্গি
তার বিষণ্ণতা।
জন্মদিনে কিছু ফুল পাওয়া গিয়েছিলো
এখন শুকিয়ে গেছে।
===
মেঘলা দিনে দুপুরবেলা যেই পড়েছে মনে
চিরকালীন ভালোবাসার বাঘ বেরুলো বনে...
আমি দেখতে পেলাম, কাছে গেলাম, মুখে বললাম : খা
আঁখির আঠায় জড়িয়েছে বাঘ, নড়ে বসছে না।
আমার ভয় হল তাই দারুণ কারণ চোখ দুটো কৌতুকে
উড়তে-পুড়তে আলোয়-কালোয় ভাসছিল নীল সুখে
বাঘের গতর ভারি, মুখটা হাঁড়ি, অভিমানের পাহাড়...
আমার ছোট্ট হাতের আঁচড় খেয়ে খোলে রূপের বাহার।
মেঘলা দিনে দুপুরবেলা যেই পড়েছে মনে
চিরকালীন ভালোবাসার বাঘ বেরুলো বনে...
আমি দেখতে পেলাম, কাছে গেলাম, মুখে বললাম : খা
আঁখির আঠায় জড়িয়েছে বাঘ, নড়ে বসছে না।।
=====
একবার তুমি
একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা করো–
দেখবে, নদির ভিতরে, মাছের বুক থেকে পাথর ঝরে পড়ছে
পাথর পাথর পাথর আর নদী-সমুদ্রের জল
নীল পাথর লাল হচ্ছে, লাল পাথর নীল
একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা করো ।
বুকের ভেতর কিছু পাথর থাকা ভালো- ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়
সমস্ত পায়ে-হাঁটা পথই যখন পিচ্ছিল, তখন ওই পাথরের পাল একের পর এক বিছিয়ে
যেন কবিতার নগ্ন ব্যবহার , যেন ঢেউ, যেন কুমোরটুলির সালমা-চুমকি- জরি-মাখা প্রতিমা
বহুদূর হেমন্তের পাঁশুটে নক্ষত্রের দরোজা পর্যন্ত দেখে আসতে পারি ।
বুকের ভেতরে কিছু পাথর থাকা ভাল
চিঠি-পত্রের বাক্স বলতে তো কিছু নেই – পাথরের ফাঁক – ফোকরে রেখে এলেই কাজ হাসিল-
অনেক সময়তো ঘর গড়তেও মন চায় ।
মাছের বুকের পাথর ক্রমেই আমাদের বুকে এসে জায়গা করে নিচ্ছে
আমাদের সবই দরকার । আমরা ঘরবাড়ি গড়বো – সভ্যতার একটা স্থায়ী স্তম্ভ তুলে ধরবো
রূপোলী মাছ পাথর ঝরাতে ঝরাতে চলে গেলে
একবার তুমি ভলবাসতে চেষ্টা করো ।
তিন পাহাড়ের কোলে
অন্ধকারে তিনপাহাড়ে ট্রেনের থেকে নেমে,
হাওয়া বিলাসী তিন জোড়া চোখ আটকে গেল ফ্রেমে।
জনমানবহীন স্টেশন, আকাশ ভরা তারায়,
এমন একটি বেশি আসলে সক্কলে পথ হারায়।
পথ হারিয়ে যায় যেদিকে, সেদিকে পথ আছেই,
ঝরনা, কাঁদর, টিলা পাথর বনভূমির কাছেই।
বনভূমির ওপারে কোন মনোভূমির দ’য়,
ফুসুর ফাসুর ঘুসুর ঘাসুর স্বপ্নে কথা হয়!
পুব আকাশে আস্তে ধীরে আলোর ঘোমটা খোলে,
শক্ত সবুজ ভেসেছে তিন পাহাড়ের কোলে ।
সহজ করে বাঁচা কি আর খাঁচাতে সম্ভব?
তিন পাহাড়ের নকশি কাঁথায় শিশুর কলবর।
=====
অবনী বাড়ি আছো?
দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছো?’
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে–
‘অবনী বাড়ি আছো?’
আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী
ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ি আমি
সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছ?’
====
দাঁড়াও
মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।
তোমাকে সেই সকাল থেকে তোমার মতো মনে পড়ছে
সন্ধে হলে মনে পড়ছে, রাতার বেলা মনে পড়ছে
মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।
এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালবেসে দাঁড়াও
মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।

3 মন্তব্যসমূহ
অসাধারণ কলম ।।। শ্রদ্ধা অবিরাম 🙏🙏
উত্তরমুছুনঅসাধারণ.... বিনম্র শ্রদ্ধা
উত্তরমুছুনঅসামান্য প্রতি কবিতা
উত্তরমুছুন