দীপ্তাংশু রায় মুখার্জী - নিবন্ধ




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


নির্বাসিত যুদ্ধ

     আজ যখন আমরা সকলে অন্তরিন অবস্থায় নিজেদের ঘরে বসে লেখালিখি করছি তখন আমরা অজান্তেই এক রক্তস্নাত যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করে ফেলেছি। হ্যাঁ, ঠিকই আমাদের ঘরগুলোর মধ্যে রোজ জন্ম নিচ্ছে এক যুদ্ধ এবং সেই সূর্যাস্তের সামনে নিরস্ত্র দাঁড়িয়ে, বাড়িতে বসে বসে আমরা গুনছি পৃথিবীর মৃতদেহগুলোকে। এ এক চূড়ান্ত অসহায়তার সময়। এ এক চূড়ান্ত নিরাপত্তাহীনতার সময়। এ এক অঘোষিত যুদ্ধের সময়।
   
          একথা বলতেই মনে পড়ে যায় পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক লিও তলস্তয় - এর 'War & Peace' গ্রন্থের কথা। সেখানে রুশ লেখক বলছেন --- " The strongest of all warriors are these two – time and patience. "।  বর্তমানে এই করোনা বিধ্বস্ত পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এই কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই দুই অস্ত্র 'সময় এবং ধৈর্য' দিয়েই যুদ্ধ জয় সম্ভব। বাইরে পৃথিবীব্যাপী চলা অসুখের বিরুদ্ধে লড়াই এবং মনের ভেতরে দাগ ফেলা  নিরন্তর ক্ষতর নিরাময়।

           এখন আমরা সকলে একথা বেশ বুঝতে পারছি, যে প্রাক-করোনা পৃথিবী এবং পরবর্তী করোনা পৃথিবীর মধ্যে অনেক বাস্তবিক এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন আসতে চলেছে। প্রথমেই যে পরিবর্তন আমি খুব ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছি তা হল মানসিকতা ও ধারণার। ধর্ম, জাতি, সামাজিক ভেদাভেদ, সামাজিক স্তর, রাজনৈতিক পন্থা, আধুনিকতা ও মানবতাবাদ সমেত অনেক প্রশ্নের উত্তর বিষয়ে স্পষ্টতা লাভ হবে। এটি হয়তোবা করোনার ইতিবাচক দিক কারণ এর মাধ্যমে আমরা আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাকে পর্যবেক্ষণ ও
পুনর্মূল্যায়ন এত সুযোগ পাবো। দ্বিতীয়ত, আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা। করোনা পরবর্তী পৃথিবীর অর্থনীতি নিশ্চিত ধসের মুখে। বৃদ্ধির হার দ্রুতহারে নিম্নগামী। লগ্নি নেই এবং তার সঙ্গে চাকরির অনিশ্চয়তা তথা অভাব দেখা যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। বেহাল অর্থনীতির জন্য জার্মান অর্থসচিব আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছেন। ভারতের ক্ষেত্রে আগে থেকেই ছিল অর্থনৈতিক দূরাবস্থা যা ক্রমে মন্দার দিকে এগোচ্ছে। এবিষয়ে IMF এর ভবিষ্যৎবাণী আরও ভয় বাড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের।

             অর্থনীতির সঙ্গে সমাজের যোগ প্রকট ভাবে উপস্থিত। অর্থনীতির সংকটকালে তার প্রভাব সমাজকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। আবার, সামাজিক ব্যাধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থব্যবস্থা। করোনার প্রভাব যে সমাজে অত্যন্ত নেতিবাচক তা বোধহয় বলে দিতে হয় না। এই ভাইরাস লক্ষ প্রাণের সঙ্গে কেড়ে নেবে কারুর ভাত, কারুর চাকরি, কারুর সম্বল। সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। ভারতে প্রায় ৪০ কোটি মানুষ দরিদ্রসীমার নীচে নেমে আসবেন। অপুষ্টিতে  ভুগবে সদ্যোজাতরা, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ফলে এই মহামারীর প্রভাব যে কতটা ভয়াল হতে পারে তা এ থেকেই স্পষ্ট।

              তবে, এতো অন্ধকারের মধ্যেও আমরা দেখবো আলোর জায়গা। আকাশের মেঘ না দেখে, দেখবো বৃষ্টির স্নান। আসলে এই করোনাতেও এক বৃহৎ অবদান হলো আমাদের হোম কোয়ারেন্টাইন। এবং এই অবস্থায় আমরা যেন খুঁজতে থাকি আমাদের ছোটো খুশিগুলো। হাজার দুঃখ হাজার কান্নার মধ্যেও আমরা সময় দেবো আমাদের ফেলে আসা শৈশবকে। আমাদের ফেলে রাখা ওয়েল পেইন্ট, নাচের ক্যাসেট, ধুলোমাখা সেতার আর অবশ্যই উড়ন্ত কবিতার পাতাদের। আমরা চোখ মেলে দেখবোআজ যা এতদিন দেখিনি। পৃথিবীর সবুজ দেহ। বাড়ির চিলেকোঠার দুপুর, গাছের ডালে শৈশবের পাখি, অদেখা অচেনা ভালোবাসার সংকেত। এই ছোটো ছোটো খুশিগুলো যদি আমারা দেখতে পাই তবেই মনের সমুদ্র পেড়িয়ে পৌঁছাবো শান্তির বেলাভূমিতে।

                "তুমি যদি ভালোবাসো, ভালোবাসা পাবে... "--- শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই লাইন যেন এখন আমাদের হৃৎপিন্ড। আমরা পৃথিবীকে ভালোবাসবো, একে অপরকে ভালোবাসবো, শারীরিকভাবে একে অপরের থেকে দূরে থেকে। কিন্তু আমাদের চেতনা, আমাদের হৃদয় যেন এক বন্ধনে বাঁধা থাকে। এর নামই ভালোবাসা। তাই, এবার আমাদের দ্বায়িত্ব প্রত্যেক প্রাণ বাঁচানো এবং নিজেদের বিধিসম্মতভাবে সুস্থ রাখা।


                   তাই, প্রথমে যে যুদ্ধক্ষেত্রের কথা বলেছিলাম সেখানে ফিরে যাই। যদি চেয়ে দেখি, তবে সত্যিই অনেক মৃত্যু, অনেক নিহত দেহ এই সূর্যাস্তে। এই মৃতদের কথা কেউ জানবেনা। একদিন হয়তো এই মহামারী কেটে যাবে। এই মানুষেরা চুপিসারে ধুলোয় মিশে যাবে। কিন্তু আমরা যদি একটু ভালোভাবে দেখি তবে বুঝতে পারবো যে আমরা তাদের মরে যেতে দিইনি। তাদের ধুলো মিশে আছে এই পৃথিবীর আকাশে, বাতাসে। যে মৃত্যু উপত্যকা ইটালি, তার ব্যালকনিতে মিশে যাওয়া বেহালার সুরে আছে সেই ধুলো। আমাদের কবিতা, লেখার অক্ষরে মিশে আছে সেই ধুলো। এই কয়েকটা নিস্তব্ধ জিনিস শুধু জানে ----
    আমরা তাদের মরে যেতে দিইনি। দেবোনা কোনোদিন...



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ