কুয়াশা ঢাকা ভোর।। ইয়া সিন




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

ডিসেম্বরের শহর মানেই একটা শহর কুয়াশার অন্দরমহলে ডুবে যাওয়া। চৌদিকে ফিনফিনে একটা জাগ্রত সমুদ্র যেন শহরটাকে গিলে নেয় কিংবা বায়ুমন্ডলের মেঘকুঞ্জে ভাসমান পুরো শহর। অর্ধেক দেহ বিষম খেয়ে গিলে নিয়ে মাথা উঁচিয়ে কোনো রকমে মেঘ থেকে রেহাই মিলে বাকি অর্ধেক দেহের। দিনের আলোতে যতটা আহ্লাদিত সুন্দর দেখায়— রাতে ততটাই ভয়ানক। যেমনই বিদঘুটে অন্ধকার তিন-চার হাতের ভেতর সবকিছুই যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে হয়ে যায়।শহরের একমাত্র প্রকাণ্ড শিউলীতলা সংলগ্ন ধস্ত শ্যাওলা ধরা দেয়ালের ডিসেম্বরের জাগ্রতচিত্ত বাড়িটি আমাদের পাড়ার রাত প্রহরী গফুর মিয়ার। বাড়ির নামও আবার রেখেছেন— অন্ধগৃহ। তার বয়েসের তারতম্য সর্বাত্মক জনিত চোখের দৃষ্টি খেয়াল কিঞ্চিৎ হ্রাস পেয়েছে মাত্র। অথচ গফুর মিয়া মনে করেন রাতের বেলায় উনি চশমা ছাড়া বেশ স্পষ্ট দেখেন। তাই তিনি রাতের বেলায় চশমা ছাড়া চলেন। লোকটা তার বাড়িটার মতোই বেশ কাব্যিক— তেমন রহস্যে ভরা। রাতে কাঁধে যে ব্যাগটা যুক্ত করে বিশেষ সরঞ্জামে। একটা চায়ের ফ্ল্যাশ; ক'টা বই ঘেটেঘুটে ঘুম আবিষ্কার করার লক্ষ্যের ব্যবহৃত করেন টর্চলাইট। পড়ালেখায় খুব একটা আগুতে পারেন নি৷ অল্পতেই সংসারের ঝোলা বাবা তাকে বুঝিয়ে দিয়ে অবসরে গিয়েছেন। এখন নিতান্তই সঙ্গ দিয়েছে অবলা পঙ্গু স্ত্রী— জরি৷ নিঃসন্তানে এই যাত্রায় তিনি। 
জ্যোৎস্না কিংবা কুয়াশা অথবা বৃষ্টিস্নাতক রাতগুলো তার কাছে অনন্য ধারণার। উপভোগ করতে ভালোবাসেন সত্তায়িত্ব নিয়নে। যেমন ভ্রমের মধ্যে তিনি অধ্যায়ন করেন উৎকৃষ্ট পাখি চরিত্রে দণ্ডিত সেমিনার কক্ষে৷ শুনেছি আমাদের বকুলতলা পাড়ার অদ্ভুত গোপন একটা নামকরণও উনি করেছেন — ন্যাংটুপাড়া। 
আজকাল লোকের কানাকানি হচ্ছে; প্রায়শই শুনা যাচ্ছে এই খবর লোকমুখে। উনার বিশ্বাস; রাতে নাকি পুরো পাড়াকে খোলামেলা দেখায় ঠিক যেন ন্যাংটু মেয়েছেলের মতো। তাই উনার এরূপ উদ্ভট নামকরণ। 
এই বেখেয়ালি মানুষটাও রাতে কেমন যেন ভয়ংকর স্বভাবের হয়ে ওঠেন। কেমন কর্কশ গলা ঝেড়ে আওয়াজে পুরো পাড়া ঝনঝনিয়ে কেঁপে তুলেন৷ এমন আতঙ্কে কুকুরেও শোরগোল তোলে অমানিশার বিকট তরঙ্গে। তবে প্রকৃত অর্থে, উনি আসলে মানুষকে যতটা সাহসী দেখান; উনি এর থেকেও ভীষণ ভীতু। 
একরাতে গফুর মিয়ার জ্বরাক্রান্ত শরীর নিয়ে বেড়িয়ে পড়লেন ডিউটিতে। এলোমেলো ভঙ্গিতে পা ফেলছেন। কুয়াশা ভেঙে বেড়িয়ে আসা বেশ মুশকিল ছিলো। কি অমায়িক কুয়াশা গিলে নিচ্ছিলো একহাত দূরবর্তী দৃষ্টি ক্ষীণতা। মাটিতে পা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। গফুর মিয়ার আজ শরীর ভালো নেই সকাল থেকেই। কেমন যেন ম্যাচম্যাচ করছিলো শরীরটা সারাদিন। সকাল থেকে কিছু মুখে দেয় নি। বউয়ের ঘরে দু একবার গিয়েছিল খবরাখবর নিতে। মনে হয় না এই যাত্রায় বেশিদিন আর টিকবে না। 
গফুর মিয়া আজ আর কোনো সাড়াশব্দ করলেন না। চুপচাপ পাড়ায় পাড়ায় টহল দিতে লাগলেন। বারবার পা জড়িয়ে আসছে। আজ হাতে ঘড়ি নেই— ব্যাগে চা বই কিছু নেওয়া হয় নি। চা সারাদিন তুলনামূলক বেশি মাত্রায় খাওয়া হয়েছে। ফলে মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেছে। চোখে ক্লান্তি ঢলে আসে; পাতা ছোট হয়ে আসে। এমনতাবস্থায় শেষ রাতে প্রথম ভোরের উত্তীর্ণ বিস্তৃত কুয়াশার অন্তরালে উনি সিটি পার্কের মাঝামাঝিতে আচমকা খুব অবিশ্বাস্য— অদৃশ্য অলৌকিক কিছু একটা দেখতে পেলেন। খুব সাহস নিয়ে সজোরে বললেন; কে, কে ওইখানে। কিন্তু কোনো জবাব পেলেন না। পাঞ্জাবীর পকেট হাতিয়ে দেখলেন। আজ আবার চশমা আনা হয় নি৷ উনি খুব সাবধানে ধীর পায়ে এগুচ্ছেন। উনি যতই এগুচ্ছেন। ছায়াটা ততই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 
উনি চোখমুখ ঘঁষে পূণরায় দেখার চেষ্টা করলে কিন্তু কুয়াশার জন্য অস্পষ্ট দেখাচ্ছে। উনি ধীরেসুস্থে ফের একপা দুইপা করে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন আর দেখা যাচ্ছে না। তবুও ক্ষনেকবাদে মনে হলো কেউ উনাকে পিছন থেকে অনুসরণ করছে। উনি আতঙ্কে এইটুক হয়ে গেলেন। কাচুমাচু হয়ে পায়ের গতি বাড়াতে লাগলেন নতশিরে। পক্ষান্তরে একপর্যায়ে দৌড়াতে লাগলেন। 
উনি দৌড়াচ্ছেন। হটাৎ অস্পষ্ট আলোতে দেখা গেলো— ম্যানহোলে উল্টানো ঢাকনায় হোচট খেয়ে পড়ে গিয়ে জুতো ছিঁড়ে ফেললেন। টর্চটা ম্যানহোলের গিয়ে প্রবেশ করলো। এখন খালি পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দৌড়াচ্ছেন। বিশ্রামের নামই নেই— পা থেকে রক্ত ঝরছে, মুখে ফেনা আর কাঁদা লেপ্টে রয়েছে দাড়িতে। পথটা যেন এগুচ্ছে না। মাঝেমাঝে মনে হয় তিনি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে দৌড়াচ্ছেন। 
ঘুরেফিরে এক স্থানে উনি দাঁড়িয়ে আছেন পেছন থেকে প্রতিশব্দ ভেসে আসছে পায়ের— কেউ যেন প্রাণসরে দৌড়াচ্ছে; দৌড়াচ্ছে গফুরের পিছে পিছে। যত শব্দ বাড়ে, গফুর মিয়ার দৌড়ের গতির ততই প্রভাব ফেলে। কিন্তু প্রাণপণে দৌড়েও রক্ষে নেই উনার। পেছনের মানুষটা দ্রুতগতিতে, যেন তাকে গিলে ফেলবেন এক্ষুনিই৷ 
দৌড়াতে দৌড়াতে গফুর মিয়া হাত লেগে যাবে এমন অবস্থায় একটু নড়েচড়ে ওঠলেন। দেখলেন গা ঘামছে— জ্বর নেমেছে বধহয়। তাকিয়ে দেখলেন বেলা পড়েছে; দরোজায় একটা কুকুর দাঁড়িয়ে— তার লম্বা জিহবা বের করে, জোরে জোরে হাঁপাচ্ছে৷ উনি যে ভ্রমের মধ্যে দিয়ে কখন যে ঘরে এসে শুয়েছেন; উনার কিছুই মনে নেই৷

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ