' ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি ' || চিত্রা ভট্টাচার্য্য




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

'গানের পাখি গেছে উড়ে শূন্য নীড়

কণ্ঠে আমার নাই সে আগের কথার ভিড়

আলেয়ার এ আলোতে আর আসবে না কেউ কুল ভুলি।।

ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি ." 


 বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব হয়েছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের। কিন্তু সে আকাশে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত ধূমকেতুর পতন যে এত দ্রুত হবে তা অভাবনীয় ও চরম দুঃসংবাদের ।  অন্তর্যামী কবি বোধহয় চিকিৎসকদের আগেই বুঝেছিলেন  একদিন চিরতরে নীরব হয়ে যাবেন। অনুভবী কবি সে মর্মান্তিক ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় কবেই লিখেছিলেন সে হৃদয় বিদারক বেদনার কথা -'-গানের পাখি গেছে উড়ে শূন্য নীড় '।          


 ঘোরবিস্ময়ে স্তব্ধহয়ে দেখি ,মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যিক জীবনে কবি বাংলা কাব্য সাহিত্যের  অনন্য সৃষ্টির সম্ভারে যে প্রাচুর্যতা এনেছেন তা অতুলনীয় এবং অবিস্মরণীয়। বাংলা কাব্য সাহিত্যে সংগীতের নানা শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। তবু ও তিনি পরিচিত ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয়  দ্রোহের  কবি হয়ে। '                             কবি কাজী নজরুল অত্যন্ত সুপুরুষ ,সুগঠিত দেহ অপরিমেয় স্বাস্থ্য ও প্রাণখোলা হাসি ও সোচ্চার কণ্ঠের অধিকারী এক দিলখোলা মানুষটি  --১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে মারাত্মকভাবে স্নায়বিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ায় আকস্মিকভাবে তাঁর কর্ম জীবনের সকল সক্রিয়তার অবসান ঘটলো।   শৈশব থেকেই তাঁর কবিতা ও গান একদিন আপামর জনগণ কে বীরত্বপূর্ণ ও নিঃস্বার্থ কাজে আত্মনিয়োগ করতে কোটিকোটি মানুষকে প্রাণিত করেছিল । সেই চির দুর্দম বিদ্রোহী কবি ও এক সময় জীবনের কাছে হেরে গেলেন।  


  পশ্চিমবর্ধমানের আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ  (ইংরাজীর (১৮৯৯ সালের ২৫ মে )   পিতা কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুনের ঘরে আঁধার রাতের রাজা '' দুখু মিয়া '' জন্মনিলেন  যেন সমগ্র তমসাবৃত জাতির প্রতিনিধি হয়ে এক স্বর্ণোজ্জ্বল আলোরবর্তীকা হাতে নিয়ে ।   বিরল কবি প্রতিভা নিয়েই এই ধরার ধূলিতে এসেছিলেন নজরুল অত্যন্ত সাধারণ পরিবেশে মাটির সাথে মিশে।  মাতৃক্রোড় থেকেই  তাঁর কণ্টকাকীর্ণ পথে  চলার শুরু। বাস্তবের  দুনিয়ায়  টিকে থাকার লড়াইয়ের কঠিন সংগ্রামে রুক্ষ বন্ধুর পথপরিক্রমায় বালক নজরুল বারংবার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন।  বাল্যকালেই  দুখুমিয়া লেটোর দলে যোগদিয়ে  হাঁটে মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়িয়ে রোজগারের জন্য    সংগীতের জগতে প্রবেশ করে অবশেষে  খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছলেন।  তিনিই হলেন দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ মানব প্রেমিক, চির দুর্দম, বিদ্রোহী, আত্মভোলা, পরোপকারী ও স্বাধীনচেতা  চির দুর্দম বিদ্রোহী কবি  নজরুল। ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গে আজন্ম কাটালেও তাঁর জীবন সায়াহ্নের শেষ চার বছর কেটেছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র স্বাধীন বাংলা দেশের জাতীয় কবির সম্মানে।


  বিংশ শতাব্দীর বঙ্গ সাহিত্য সভায় অগ্নিবীণা হাতে কবির  প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ । তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রণী বাঙালী প্রেমিক কবি,ঔপন্যাসিক, নাট্যকার সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সুরকার সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সর্বদাই সোচ্চার।  বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্যসর্বাধিক পরিচিত। ১৯২০ সাল থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তাঁর সব রচনা সামগ্রীর সঠিক হিসেব না পাওয়া  গেলেও প্রায় ২৮০০  টি গান, ৯০০ টি  কবিতা , ১০০টি প্রবন্ধ ,৫৫টি গ্রন্থ.২৫ টি নাটক, ১৮ টি রাগ--রাগিণীর স্রষ্টা , ১ ৯ ৪ টি গজল ও ৪০০টি ইসলামী গান ও  ৫০টি শ্যামা সঙ্গীত ইত্যাদির রচনা করেছিলেন । কাজী নজরুল ইসলামের  বাংলা মননে,মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম।  তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।  স্ত্রী প্রমীলার পক্ষাঘাতজনিত অসুস্থতায় কবি  সাময়িক বিচলিত হলে ও ,সন্তান এবং মাতৃবিয়োগে ও তার কলম স্তব্ধ হয়নি , জীবনের অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রুখে দাঁড়িয়ে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা সহ্য করে সত্যের বাণী প্রচারে তিনি ছিলেন অকুতোভয়ী।  মাত্র ২৩ বছরের এত অল্প সময়ে এমন  বিভিন্ন ধারার সংস্কৃতি বহন করে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের জগতে সুর সংগীতের পূজারী হয়ে সাহিত্যের ভান্ডার কে এমন সমৃদ্ধ করার গৌরব একমাত্র  তাঁরই । তিনি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ দু’ বাংলাতেই  কবিতা,গান ও গজলে সমানভাবে সমাদৃত।   


কবির শেষ ভাষণে বলেছিলেন-- ' আমার কাব্য, আমার গান আমার জীবনের সেই অভিজ্ঞতার মধ্য হতে জন্ম নিয়েছে। যদি কোনদিন আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকিত্বের পরম শূণ্য থাকে অসময়ে নামতে হয়, তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না, আমি সেই নজরুল। সেই নজরুল অনেক দিন আগে মৃত্যুর খিড়কী দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে। মনে করবেন পুর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে একটি অশান্ত তরুণ এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল। যদি আর বাঁশী না বাজে, আমি কবি বলে বলছি নে, আমি আপনাদের ভালবাসা পেয়েছিলাম, সেই অধিকারে বলছি, আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন। '  


 -''যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়ত বা বড়বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামে। দেশপ্রেমী,ত্যাগী,বীর,বিদ্রোহী- বিশেষনের পর বিশেষন। টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পর মেরে। বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রার্থ্য দিনে বন্ধু তুমি যেন যেও না। যদি পার চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ কোর। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বলো বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি।''


মস্তিষ্কের দুরারোগ্য কঠিন ব্যাধিতে ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই অসহায় শিশুর মতোই এক সময় কবি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।  এর আগে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত পত্নী প্রমীলার চিকিৎসার জন্য কবি  মোটরগাড়ি বিক্রি  বালিগঞ্জের ভক্তের দান করা জমি, গ্রন্থাবলির কপিরাইট, রেকর্ড করা গানের রয়্যালটির টাকা সব খরচ করে ও সফল হয়নি।  দীর্ঘ দশ বছর এই নিপুন সুরের জাদুকরের সময় কাটে এঁদো ঘরের কোণে একাকী নীরব শয্যায় পড়ে থেকে প্রায় বিনা চিকিৎসায়। কবি  নজরুলের যে কণ্ঠ একসময় ব্রিটিশ রাজের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল ,ভিতে কাঁপন তুলেছিল, সেই কণ্ঠ আজ নীরব বাণী সংগীতহারা।কবির জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির সময় কেউ খবর রাখেনি কেউ আসেনি আন্তরিক সুহৃদ হয়ে রোগগ্রস্থের পাশে। সুখের পায়রা বন্ধুবৃত্ত সব উড়ে গেছে। পক্ষাঘাতে পঙ্গু অসুস্থ স্ত্রী প্রমীলাদেবীই একমাত্র সহায় সেবিকা।  


  এরপর ড;শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর উদ্যোগে বিদেশে (ভিয়েনায় ) চিকিৎসার সুযোগ এলেও    ১৯৫৩ সালেই ডাক্তাররা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন “বর্তমান অবস্থায় কোনো প্রকার সার্জারি করলে রোগীর জন্য তা হিতে বিপরীত হবে।  রোগী একরকম চিন্তাহীন, শান্ত, শিশুর মতন (childlike) অবস্থায় আছেন, তাকে সেভাবেই থাকতে দেয়া উচিত। এর চেয়ে ভালো হওয়া সম্ভব নয় ।  নজরুলকে সপরিবারে দেশে ফেরানো হলে অসুস্থ প্রমীলা দেবীর  আরো কিছুকাল ভোগান্তিরপর ১৯৬২ সালে মৃত্যুহলো।     ” অসহায় অস্থির  নিঃসঙ্গ কবি স্ত্রীর বিছানার শূন্য জায়গায় হাত চাপড়াতেন আর নিঃশব্দে কাঁদতেন। ভাষাহীন চোখে শুধু চেয়ে থাকেন বোধ বাকশক্তি হীন কবি। ''   


  ১৯৭২ সালের ২৪ মে নজরুলের ৭৩ তম  জন্মদিনে কবিকে বাংলাদেশ সরকার বিপুল সমারোহে ঢাকায় আনলেন । ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট একদিন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে আত্মহারা কবির জীবন প্ৰদীপ চিরতরে নিভে গিয়েছিল।  নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন কবি ।   বলাযায় এই মহাপ্রয়ানের অনেক আগেই ১৯৪২সালে আকস্মিকভাবে কাব্য ও সুরলোক থেকে তাঁর মানস মৃত্যু ঘটেছিল। তাঁর গানের অজস্র সুরের প্রস্রবণ , তাল লয় ছন্দ শব্দের ঝঙ্কার  চিরতরে স্তব্ধ হলো। নজরুল প্রতিভার  শুরু থেকে কর্ম জীবনের শেষ পর্বে আলোচনা বসলেও মনে হয় যেন কিছুই বলা হলো না। কবি জীবনীতে বারেবারে সে কথাই অনুরণিত হয়ে বিষাদের সুর বাজে ।  এই পৃথিবীর মানুষকে প্রাণ ঢেলে ভালবাসার পরিবর্তে একরাশ অভিমানের বোঝা বুকে বয়ে চিরতরে কবরের মাটিতে বিলীন হলেন দ্রোহের কবি প্রেমিক কবি নজরুল।: 

_____________________________________

তথ্য সূত্র ১) অরুণকুমার বসু/ নজরুল জীবনী/ আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা। 

২) ডঃ গৌতম দত্ত/ নজরুলের চিকিৎসা/ নজরুল                  ৩)নজরুল জীবনী করুণা ময় গোস্বামী                               ৪) নজরুল / রফিকুল ইসলাম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ