পোস্ট বার দেখা হয়েছে
ইতিহাস যেখানে থমকে যায়,
শব্দ নিজেই নত করে মাথা
সেখানেই দাঁড়িয়ে আছেন
স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ।
তিনি কোনো অলৌকিক কাহিনির নায়ক নন,
তিনি সেই মানুষ—
যাঁর স্পর্শে সাধারণ দিনও পরিণত হয় সাধনায়।
যাঁর নীরবতা উচ্চারণের চেয়েও গভীর, বর্ণময়।
নদী একদিন দেবী হয়—
সরস্বতী যেমন জলে জলে জ্ঞান বয়ে আনে,
তেমনি এক মানবজীবন
কর্মে, ত্যাগে, শৃঙ্খলায়
একটি চলমান আশ্রমে রূপ নেয়—
সে বরেণ্য জীবনই,
স্বামী প্রণবানন্দ।
তিনি শিখিয়েছিলেন—
ধ্যান মানে পালিয়ে যাওয়া নয়,
ধ্যান মানে জীবনকে পূর্ণতায় গ্রহণ করা।
সংযম মানে সংকোচ নয়,
সংযম মানে শক্তির সঠিক ব্যবহার।
যে মানুষটি বলেছিলেন—
“ত্যাগই জীবনের মূলমন্ত্র”,
তিনি জানতেন,
ত্যাগ দুর্বলতার নাম নয়,
ত্যাগ হল সর্বোচ্চ সাহসের পরিভাষা।
শরীর, মন ও হৃদয়—
এই ত্রয়ীর সমবিকাশেই
জন্ম, মনুষ্যত্বের।
এই দর্শন কোনো গ্রন্থে আটকে থাকেনি,
এ দর্শন নেমে এসেছে
গ্রাম থেকে নগরে,
আশ্রম থেকে সমাজে,
ব্যক্তি থেকে জাতির চেতনায়।
তিনি দেখেছিলেন মানুষকে—
ধর্মে নয়, মানুষে।
জাতিতে নয়, যন্ত্রণায়।
তিনি জানতেন,
যে সমাজ মানুষের দুঃখ বোঝে না,
সে সমাজ কোনোদিন ঈশ্বরকে চিনতে পারে না।
তাই তাঁর সাধনা ছিল
শুধু ধ্যানের আসনে নয়—
রোগীর শয্যায়,
শিক্ষার আলোয়,
অনাথের চোখের জলে,
সমাজের ভাঙা মেরুদণ্ডে।
ভারত সেবাশ্রম সংঘ
শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—
এ এক জীবন্ত চলমান আদর্শ।
এখানে সেবা কোনো দয়া নয়,
সেবা এখানে কর্তব্য।
এখানে মানুষ সাহায্য পায় না,
মানুষ সম্মান পায়।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
ধর্ম যদি সমাজকে জাগাতে না পারে,
তবে সে ধর্ম মৃত।
আধ্যাত্মিকতা যদি মানুষের কল্যাণে না আসে,
তবে সে কেবল আত্মতৃপ্তির বিলাস।
যে যুগে মানুষ স্বার্থসিদ্ধিতে বিভক্ত,
সে যুগে তিনি বলেছিলেন—
“বহুজনে হিতায়, বহুজনে সুখায়।”
এই একটি বাক্যেই
লুকিয়ে আছে তাঁর সমগ্র জীবন দর্শন।
তিনি বলতেন - "কানে মন্ত্র ফুঁকে সম্প্রদায় গড়ার জন্য আমার আসা নয়। আমার আবির্ভাব, আমার তপশ্চর্যা, আমার কর্মচক্র- প্রবর্তন সমগ্র ভারতের জন্য, সমগ্র হিন্দু জাতির জন্য।
আমার সংঘের মূল উদ্দেশ্য - ধর্মের ভিত্তিতে ভারতীয় জাতি ও সমাজের পুনর্গঠন।"
তিনি ছিলেন না কোন মঞ্চের বক্তা।
তিনি ছিলেন চরিত্রের ভাষ্যকার।
নিজের আচরণেই
শিক্ষা দিয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি।
তাই আজও,
যখন চারপাশে বাড়ে শব্দের দূষণ
নৈতিকতা নামে তলানিতে
তখন তাঁর শাশ্বত যাপনচিত্র
একটি অনির্বাণ দীপশিখা হয়ে
পথ দেখায় আগামীকে।
তিনি চলে যাননি,
কারণ যাঁরা আদর্শ হয়ে ওঠেন
তাঁদের কখনও মৃত্যু হয় না।
তাঁরা সময় শরীরে
অমরত্বের ঐশ্বর্য নিয়ে বেঁচে থাকেন চিরকাল।
শ্রীমৎ প্রণবানন্দজী মহারাজ—
একটি নাম নয়,
একটি দায়িত্ব।
তিনি একটি অনির্বাণ লোকশিক্ষক।
তিনি একটি স্মৃতি নন
একটি শাশ্বত আহ্বান।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনে
আরও একটু সংযম,
আরও একটু করুণা,
আরও একটু সাহস
জাগিয়ে তোলার আহ্বান।
যতদিন মানুষ মানুষ হতে চাইবে,
যতদিন সেবা ধর্ম হয়ে থাকবে,
ততদিন এই নাম—
উচ্চারিত হবে পরম শ্রদ্ধায়
নীরবে অনুসৃত হবে
আলোকবর্তিকার মতো।
অন্ধকার ভেদ করে চলবে আবহমান।
অনন্তে মিশিয়ে দেবে চন্দন সুরভী।
--------------------------------------
লেখক, সাহিত্য সম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পঞ্চম প্রজন্ম।
২৪ জানুয়ারি ২০২৬
কোলকাতা

0 মন্তব্যসমূহ