শ্রদ্ধার্ঘ্য : ভগিনী নিবেদিতা || জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

কে তুমি, যিনি পশ্চিম থেকে এসে, জ্বেলে দিলে 

পূবের প্রদীপ?

কে তুমি, যিনি বিদেশের মাটিতে জন্ম নিয়েও  

ভারতবর্ষকে করলে একান্ত আপন ?

কে তুমি ভারতবাসীর সেবা ও স্বাধীনতার জন্য 

উজাড় করলে নিজেকে ?


তুমি— মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল,

কিন্তু ইতিহাস তোমায় চিনল— ভগিনী নিবেদিতা নামে,

এক রক্তমাংসের মানুষ, 

অথচ আলো ও আত্মত্যাগের জীবন্ত প্রতিমা।


তুমি জন্মেছিলে আয়ারল্যান্ডের

ড্যানগানন নামের ছোট্ট শহরে।


এক ধর্মযাজকের কন্যা,

তবু ধর্ম তোমার কাছে ছিল মানবতা।

জাতি নয়, দেশ নয়— মানুষের সেবাই একমাত্র ঈশ্বর সেবা।

মাত্র ১০ বছর বয়সে পিতার মৃত্যুর পর  দাদামশাই, আয়ারল্যান্ডের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী হ্যামিলটনের কাছেই বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা শেষ করে দশ বছর শিক্ষকতা করে, খ্যাতি অর্জন করেছ তুমি। 


সবুজবেলা থেকেই তোমার চোখে ছিল প্রশ্ন,

শিক্ষাগ্রহণে ছিল আলোর সন্ধান


কিন্তু সমাজের পাহাড়প্রমাণ গোঁড়ামি তোমায় রেখেছিল শ্বাসরুদ্ধ করে। 


আর ঠিক তখনই—

১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন শহরের এক পারিবারিক বেদান্ত আলোচনার আসরে 

তুমি শুনলে এক বজ্রকণ্ঠের আহ্বান,

স্বামী বিবেকানন্দের কণ্ঠস্বর—

যিনি বললেন, “তুমি যদি সত্যকে জানতে চাও,

তবে অনুভব করতে শেখো।"


সেই আহ্বানে তুমি ভেসে এলে,

পাড়ি দিলে সাগর, মহাদেশ, 

আর ভারতবর্ষ, মাতৃভূমি হয়ে উঠল তোমার।


১৮৯৮ সালের এক ভোরে

কোলকাতা বন্দরে নেমে এলে তুমি, তোমায় বরণ করলেন স্বামী বিবেকানন্দ,

নতুন জীবনের দীক্ষায়।

সেই দিনই  নবজন্ম সূচিত হলো তোমার।


তুমি বুঝলে—

নারী জেগে না উঠলে জাতির হয় না বিকাশ।

অশিক্ষা না মুছলে আসে না স্বাধীনতা।


তোমার কর্মযজ্ঞ শুরু হল

বাগবাজারের গলিতে—

ছোট্ট মেয়েদের হাতে খাতা, রঙতুলি, সূচ-সুতো,

আর তাদের হৃদয়ে স্বপ্নের শিক্ষা।


তুমি শেখালে—

সেলাইয়ের ফোঁড়ে যেমন জোড়া লাগে কাপড়,

তেমনি আত্মবিশ্বাস জুড়ে দেয় একটা জাতিকে।


তুমি বললে—

“নারীর মুক্তি আসবে তখনই,

যখন সে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে।”


প্লেগ মহামারী, দুর্ভিক্ষ, বন্যা—

সব জায়গায় নিজের শরীরকে উপেক্ষা করে তুমি ঝাঁপিয়ে পড়লে,

যেন এক জীবন্ত জননী,

যেন এক করুণাময়ী দেবী।


তুমি বিদেশিনী,

তবু তোমার হৃদয়ে জ্বলে উঠল আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষ।


তুমি বললে,

“স্মরণ রেখো, সমগ্র ভারতবর্ষই তোমার স্বদেশ।”

বঙ্গভঙ্গের উত্তাল দিনে

তুমি বিপ্লবীদের দাঁড়ালে পাশে

কলমে, ভাষণে, সাহসের আলোয়।

তোমার লেখা, আহ্বান

যুবকদের হৃদয়ে জ্বালিয়ে দিল অগ্নিময় শপথ।


তুমি শুধু কৃতী শিক্ষিকা নও,

তুমি বিপ্লব, তুমি স্রষ্টা, তুমি প্রেম।

তুমি ছিলে সংগীত ও শিল্পকলার এক যথার্থ অনুরাগী।


তোমার কলম লিখেছে —

The Master As I Saw Him,

Cradle Tales of Hindustan,

Kali The Mother

The Vision of Siva


আরো কত গ্রন্থে ফুটেছে তোমার দেশপ্রেম 

ও মননশীলতার সুর।

তোমার প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে তৎকালীন স্টেটসম্যান, মডার্ন রিভিউ, অমৃতবাজার পত্রিকা, 

প্রমূখ সংবাদপত্রে। 

তুমি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছো 

রবীন্দ্রনাথের  তিনটি ছোট গল্প।  

রবীন্দ্রনাথ তোমাকে সম্বোধন 

করেছেন 'লোকমাতা ' নামে।


শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ধর্মপত্নী মা সারদার আশীর্বাদধন্যা ছিলে তুমি। 

তিনি তোমায় আদর করে ডাকতেন' খুকি '


স্বামীজি তিরোধানের আগে

তোমায় আহ্বান করেছিলেন বেলুড় মঠে।

যত্ন করে খাওয়ানোর  পর, 

মুছিয়ে দিয়েছিলেন তোমার হাত।

যেন অনন্ত আশীর্বাদ অর্পণ করলেন তোমার আগামীর যাত্রাপথে।


১৯১১ সালের এক শারদ প্রভাতে,

দার্জিলিঙের পাহাড়ে স্বাস্থ্য উদ্ধারে গিয়ে 

মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তুমি নিঃশব্দে 

মিলিয়ে গেলে অনন্তে।


কিন্তু তোমার নাম, তোমার আত্মত্যাগ

আজও প্রজ্বলিত হয়ে আছে 

ভারতবর্ষের হৃদয়ে।

যেন মাতৃভূমির সন্তানদের জন্য

অন্তহীন এক দীপশিখা।


তুমি বলেছিলে—

“যখন সংগ্রামের আহ্বান আসবে,

তখন যেন নিদ্রায় না থাকো।”

আর আমরা আজও শুনি সেই আহ্বান।


হে আলোকময়ী ভগিনী, 

তুমি আজও জেগে আছো

আমাদের প্রবাহিত রক্তে, উৎকর্ষে

মানবতার যাত্রাপথে। 


আমাদের প্রতিটি ভোরের 

চিরন্তন স্বপ্নগাথায়।


---------------------------------------------

২৭.১০.২০২৫, কোলকাতা

Copyright reserved.

ভগিনী নিবেদিতার জন্ম দিবস- ২৮ অক্টোবর ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ



Photo Courtesy - Google


---

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ