একজন কবির দ্রষ্টা সত্তা বড় না স্রষ্টা সত্তা বড়? উভয় সত্তার কি সংঘর্ষ হয়? কবিকে কি দ্রষ্টা বলাও যায় না? || তৈমুর খান




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

একজন কবির সত্তা নিয়ে প্রশ্নটি বেশ গভীর এবং দার্শনিক। কাব্যতত্ত্বের চিরন্তন বিতর্কের একটি বড় জায়গা হলো এই দ্রষ্টা (Seer) বনাম স্রষ্টা (Creator) দ্বন্দ্ব।

​সহজভাবে বলতে গেলে, একজন কবির মধ্যে এই দুটি সত্তাই অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে থাকে, তবে তাদের কাজের ধরন ভিন্ন।


দ্রষ্টা সত্তা বনাম স্রষ্টা সত্তা: কোনটি বড়?


​এটি আসলে "ডিম আগে না মুরগি আগে"র মতো বিতর্ক। তবে সাহিত্যের বিচারে দুটির গুরুত্ব দুইভাবে দেখা হয়:

​দ্রষ্টা সত্তা (The Seer): কবি যখন 'দ্রষ্টা', তখন তিনি ঋষির মতো। তিনি সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থাকা সত্য, সৌন্দর্য বা মহাজাগতিক রহস্য দেখতে পান। তাঁর অন্তর্দৃষ্টি (Intuition) দিয়ে তিনি যা দেখেন, তা-ই কবিতার মূল উপাদান বা 'দর্শন'।

​স্রষ্টা সত্তা (The Creator): যা তিনি দেখলেন, তাকে যখন শব্দ, ছন্দ এবং অলংকারের মাধ্যমে একটি শিল্পরূপে রূপান্তর করেন, তখন তিনি 'স্রষ্টা'। অর্থাৎ, দ্রষ্টা জোগান দেন কাঁচামাল, আর স্রষ্টা তা দিয়ে নির্মাণ করেন প্রাসাদ।

​সিদ্ধান্ত: একজন বড় কবির ক্ষেত্রে কোনোটিই ছোট নয়। তবে দ্রষ্টা সত্তাকে অনেক সময় ভিত্তি ধরা হয়, কারণ দর্শনহীন সৃষ্টি কেবল শব্দ নিয়ে খেলা হতে পারে, কিন্তু সার্থক কবিতা নয়। আবার সুন্দর দর্শন যদি সুচারুভাবে সৃষ্টি (Crafting) করা না যায়, তবে তা কবিতা না হয়ে নিছক দর্শনতত্ত্ব হয়ে পড়ে।


উভয় সত্তার মধ্যে কি সংঘর্ষ হয়?


​হ্যাঁ, অধিকাংশ কবির জীবনে এই সংঘর্ষ বা দ্বন্দ্ব অনিবার্য।

​প্রকাশের সীমাবদ্ধতা: দ্রষ্টা কবি যা অনুভব করেন বা দেখেন, তা অনেক সময় এতটাই অতীন্দ্রিয় বা বিশাল যে প্রচলিত ভাষায় তা প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এখানেই স্রষ্টার সাথে দ্রষ্টার সংঘর্ষ শুরু হয়। স্রষ্টা চান ব্যাকরণ ও ছন্দের শৃঙ্খল, আর দ্রষ্টা চান অসীম মুক্তি।

​আবেগ বনাম কৌশল: দ্রষ্টা কবি আবেগে আপ্লুত হতে পারেন, কিন্তু স্রষ্টা সত্তাকে সচেতনভাবে কলম চালাতে হয়। এই আবেগ আর কৌশলের ভারসাম্য রক্ষা করাই কবির জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ।


কবিকে কি দ্রষ্টা বলা যায় না?


​অবশ্যই বলা যায়, এবং প্রাচীনকাল থেকেই কবিদের 'ঋষি' বা 'Visionary' বলা হয়েছে।

​অতীন্দ্রিয় দর্শন: সাধারণ মানুষ যা দেখেও দেখে না, কবি তা অনুভব করেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা জীবনানন্দ দাশ—তাঁরা প্রকৃতির এমন কিছু সত্য আমাদের দেখিয়েছেন যা আগে অলক্ষিত ছিল।

​ভবিষ্যৎ দর্শন: অনেক সময় কবিরা তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে আগামীর ইঙ্গিত দেন। এই দূরদর্শিতার কারণেই কবিকে 'দ্রষ্টা' বলা হয়। সংস্কৃততে একটি কথা আছে— 'নানাঋষিঃ কুরুতে কাব্যম্' অর্থাৎ, ঋষি (দ্রষ্টা) না হলে কবি হওয়া যায় না।

 অর্থাৎ দ্রষ্টা-সত্তার ভূমিকা : অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন দেখা, অনুভব করা এবং সত্য উদ্ঘাটন করা।

স্রষ্টা-সত্তার ভূমিকা: শিল্পী বা কারিগর শব্দ ও ছন্দের মাধ্যমে সেই অনুভূতিকে রূপ দেওয়া।

সারকথা হলো, দ্রষ্টা হলেন কবির 'চোখ' আর স্রষ্টা হলেন কবির 'হাত'। চোখ ছাড়া হাত অন্ধ, আর হাত ছাড়া চোখ পঙ্গু।


 বিষয়টি আরো খোলসা করার জন্য কবি জীবনানন্দ দাশকে আমরা উদাহরণ হিসেবে নিতে পারি।

জীবনানন্দ দাশের কাব্যদর্শনে দ্রষ্টা ও স্রষ্টার পারস্পরিক রূপটি অত্যন্ত গভীর। তাঁর কাছে কবিতা কেবল শব্দশিল্প নয়, বরং এক অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি।  জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে তাঁর এই দুই সত্তার সম্পর্ক নিচে আলোচনা করা হলো:

১. দ্রষ্টা-সত্তা (The Visionary)

​জীবনানন্দের 'দ্রষ্টা' সত্তা প্রকৃতির তুচ্ছাতিতুচ্ছ অনুষঙ্গের মধ্যেও এক মহাজাগতিক বা ঐতিহাসিক সত্য খুঁজে পায়। তিনি যখন বলেন, "সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি", তখন তিনি সেই বিশেষ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন 'দ্রষ্টা'দেরই ইঙ্গিত করেন। তাঁর দ্রষ্টা সত্তা সময়ের অতীত এক অন্ধকার বা বিপন্নতাকে দেখতে পায়।

​উদ্ধৃতি: "জীবনের জলে আমাদের ছায়া পড়েছে। সেইসব ছায়া আত্মরতির জটিল মুগ্ধতায় বিপন্ন ইশারা।" — এখানে কবি জীবনের গূঢ় সংকটের এক দ্রষ্টা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

২. স্রষ্টা-সত্তা (The Creator)

​দ্রষ্টা যা দেখেন, স্রষ্টা তাকে রূপ দেন ভাষায়। জীবনানন্দের স্রষ্টা সত্তা অত্যন্ত সচেতন। তিনি কবিতাকে একটি 'নির্মীয়মাণ কলা' বা শিল্প হিসেবে দেখতেন। তাঁর ভাষায়, কবিতা স্বকীয়তায় বেঁচে থাকে এবং সর্বদা নতুনত্বে এর সদ্গতি।

​উদ্ধৃতি: "কবিতা আত্মসত্যের মিরর অথবা মিরর পোয়েট্রি"। এখানে স্রষ্টা তাঁর আপন অস্তিত্বের "ছিন্ন খণ্ডগুলির আদিমতা, নীরবতা, ভয়ঙ্করতা" প্রতিফলিত করেন।

​৩. দ্রষ্টা ও স্রষ্টার মিলন ও সংঘর্ষ

​জীবনানন্দের ক্ষেত্রে এই দুই সত্তার মিলন ঘটে 'অভিজ্ঞতা' বা 'Tradition'-এর মাধ্যমে। তিনি টি.এস. এলিয়টের সুরেই বিশ্বাস করতেন যে, একজন কবির স্বতন্ত্র সৃষ্টির মধ্যেও তাঁর পূর্বপুরুষ বা মৃত কবিদের অমরত্ব বজায় থাকে।

​তবে সংঘর্ষ বাঁধে তখন, যখন বর্তমান বিশ্বের 'অসুন্দর' রূপটি কবির আয়নায় (কবিতায়) প্রতিফলিত হয়। কার্ল ক্রাউসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, পৃথিবী প্রতিদিন আয়নায় নিজের রূপ দেখতে গিয়ে আরও অসুন্দর হয়ে উঠেছে। দ্রষ্টা যখন এই কুশ্রিতা দেখেন, স্রষ্টা তখন সেই বিষণ্ণতাকেই কবিতায় রূপ দেন। ফলে তাঁর কবিতা "ছন্দ থেকে ছন্দ হারায়, মাধুর্য থেকে প্রতিহত হয়, বিমুগ্ধতার বদলে বিষণ্ণতা আবিষ্কার করে"।

​ মূলকথা হলো, জীবনানন্দ দাশের কাছে দ্রষ্টা সত্তা হলো সেই চোখ যা জীবনের 'বিপন্ন ইশারা' দেখে, আর স্রষ্টা সত্তা হলো সেই কারিগর যা 'মিরর পোয়েট্রি'র মাধ্যমে সেই বিপন্নতাকে ছন্দে বা ছন্দোহীনতায় ফুটিয়ে তোলে। তাঁর মতে, কবি হওয়ার জন্য এই সত্য উদ্ঘাটনের ক্ষমতা অপরিহার্য, তাই তিনি জোর দিয়ে বলেছেন— "কেউ কেউ কবি"। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ