শশীর চরিত্রের বিবর্তন || অজিত দেবনাথ




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

পুতুল নাচের ইতিকথা- 


শশীর বাবা গোপাল কাশী যাবে  বলে শশীর কাছ থেকে অনুমতি নিল। কয়েক দিনের মধ্যেই তার বাবা ফিরে আসবে। তাই শশীর পক্ষে এখন আর গ্রাম ত্যাগ করা সম্ভবপর হল না। বাবার অনুমতিতে সে সম্মতি জানাল। কিন্তু শশীরও এই গ্রামে থাকতে আর ভালো লাগে না। কুসুম  চলে যাওয়ার পর মনটা যেন কেমন উদাস হয়ে উঠেছে। কোনো একটা নতুন জিনিসের খোঁজে মনটা কেমন যেন চনমন করে ওঠে। এতদিনের চেনা গ্রামটা তার কাছে অচেনা হয়ে উঠল। ' মন তো শশীর  কখন চলিয়া গিয়াছে দূরতর দেশে নবতর জীবনযাপনে, এখন শুধু বোঁচকা ঘাড়ে সেখানে পৌঁছানো বাকি।'  পুনর্মিলন কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ...."আনন্দ মাঝারে সব উঠিতেছে ভেসে ভেসে, আনন্দে হতেছে কভু লীন...."

 এ তো উপনিষদের সেই বাণী, 'আনন্দরূপমমৃতং যদ বিভাতি।'


তবে কি শশীর মন বিবাগী হয়ে উঠেছে? নতুন দেশে যাওয়ার চিন্তা তার মনে এল কেন? জীবনটা কি আবার নতুন করে শুরু করতে চাইছে? সেটা তো গাওদিয়া গ্রামে থেকেও শুরু করা যায়। কিন্তু যেখানে কুসুম নেই,  সে গ্রাম প্রাণহীন। সেই গ্রামে যেন নতুন করে সূর্য ওঠে না। চেনা রাস্তাঘাট কেমন যেন অচেনা লাগে। ঘাসের উপর শিশিরবিন্দু ঢেউ খেলে না। পাথরের মতো নিষ্প্রাণ একটা জগৎ। চেনা মানুষগুলো কেমন যেন অচেনা ঠেকে। এই গ্রামের বাইরে কে আছে যে তার মনের দুঃখ  ঘুচাতে পারে। না থাকুক। এখানে যে গাছের পাতায় পাতায় কুসুমের শ্বাস-প্রশ্বাস মিশে আছে। আর তালবনের সেই ভূপতিত তালগাছটা যেখানে শশী বসেছিল, আর আঁচলে বাঁধা চাবির বোঝা দোলাতে দোলাতে কুসুম এসেছিল। সেই তালবনের ছায়ায় কি কুসুমের স্মৃতি এখনো দুরন্ত শিশুর মতো শশীকে ডেকে নেয়? এখন শশী বুঝতে পারে কুসুম তার মনের ক্যানভাসে কতটা আঁচল পেতে শুয়েছিল। একটা গ্রাম্যমেয়ের জন্য তার মনের ভিতরে এত তোলপাড়, এত কষ্ট! কিন্তু কুসুম যখন এই গ্রামে ছিল তখন কি সে তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিল? তবে সে এখন এত দুঃখী কেন! কুসুমের চলে যাওয়া যেন নদীর তীর থেকে নৌকোয় চেপে স্রোতে ভেসে যাওয়ার মতোই এক প্রকার বিচ্ছেদ। যারা বিদায় জানাতে আসে তারা কেমন যেন করুণ চোখে তাকিয়ে থাকে, চোখ থেকে টুপটাপ জল ঝরে, আবার এক সময় চোখের জল মুছে ঘরে ফিরে যায়। আর ওই নৌকাটি যে ভেসে গেল সেটাও কেমন যেন ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। এক সময় শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে। এই স্মৃতি যে একপ্রকার ভ্রান্তি তা কিছুতেই শশী বুঝতে চায় না। যদিও বা বুঝতে পারে, তবু পুনরায় সেই ভ্রান্তির পাশেই ফিরে যায়। শশীর মনের অবস্থা অনেকটা 'পোস্টমাস্টার' গল্পের রতনের মতোই। বিচ্ছেদের বেদনায় রতনের চোখে জল আসে। সে মনে মনে ভাবে পোস্টমাস্টার নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। সেই ক্ষীণ আশাকে সম্বল করে পোস্ট-অফিসের চারদিকে ঘুরতে থাকে। সেখান থেকে সে কিছুতেই সরে যেতে পারেনি। এখানে রবীন্দ্রনাথের মানসীর সেই পঙ্‌ক্তিগুলোর   কথা মনে পড়ে, 'কে আমারে যেন এনেছে ডাকিয়া,

এসেছি ভুলে। 

তবু একবার চাও মুখপানে, 

নয়ন তুলে।'

শশী জানে কুসুম কোনওদিনই ফিরবে না। ফেরা সম্ভবও নয়। অনেক অভিমান নিয়ে কুসুম গ্রাম ত্যাগ করেছে। যে কুসুম বেঁচে আছে সেটা তো তার অতীতের ছায়া মাত্র। তবু কেন শশীর মনে এত ব্যাকুলতা? সেও কি এক প্রকার ভ্রান্তি নয়? এটাকে আমরা নিজের তৈরি করা একটা কল্পনা জগৎ বলতে পারি(created image). যার সঙ্গে এক সময় বাস্তবের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই সম্পর্কের কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধু মনের কোণে পড়ে আছে তার স্মৃতিটুকু। একটা ধূসর স্মৃতিকে শশী তবু পুনর্নির্মাণ করতে চাইছে। তবে সে কুসুমের সঙ্গে দেখা করতে তার বাপের বাড়িতে চলে যাবে সে কথাও সে ভাবছে না। বুকের মধ্যে একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করে। সে ভাল করেই বুঝতে পারে এ ব্যথা শরীরের নয়। এমন দুর্দিন তার জীবনে আর কখনো আসেনি। ভিতরটা একেবারে রিক্ত, শূন্য হয়ে গেছে। কোনো কিছুতেই আর আগের মতো করে মন বসাতে পারছে না। সারা জীবন ধরে কত মানুষের চিকিৎসা করে এসেছে। অনেকে সুস্থ হয়েছে। আবার কেউ কেউ হয়নি। তবু গ্রামের মানুষ তাকে দেবতার দৃষ্টিতে দেখে। গ্রামের এত মানুষের ভালোবাসা এক নিমিষে অর্থহীন হয়ে গেল। সমস্ত গ্রামটা যেন কুসুমের মায়াজালে ঘেরা। এখানে 'শেষ খেয়া'র সেই গভীর আকুলতা মনে পড়ে,

'দিনের আলো যার ফুরালো, সাঁঝের আলো জ্বললো না।'

কুসুমের কথা মনে পড়লেও শশীর আর এই গ্রামে থাকা চলে না। কারণ উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই, 'না গেলে তার যেন চলিবে না, যাইতে সে যেন বাধ্য। কে যেন গাঁ হইতে তাহাকে তাড়াইয়া দিতেছে, থাকিবার উপায় নাই।'

শশীর  বাবা গোপাল আর ফিরে আসেনি। অতএব, শশীর পক্ষে আর গ্রাম ত্যাগ করা সম্ভবপর হয়নি। গ্রাম ত্যাগ করার সমস্ত আয়োজন ধীরে ধীরে বাতিল হয়ে গেল। আবার সে হাসপাতালে ফিরে আসে। রোগী না দেখলে আর চলবে না। কিন্তু এ শশী যেন অন্য শশী। বাজিতপুর থেকে ফেরার সময় তার মন  কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। এখানে কোলরিজের 'দ্য রাইম অফ দি এনশ্যেন্ট মেরিনার' এই লাইনগুলোর কথা মনে পড়ে,The ice was there ,the ice was there. The ice was all around.It cracked and growled, and roared and howled, like noises in a swound."এখন সে শুধু মানুষ খুঁজে বেড়ায়। চোখের সামনে যেসব মানুষ ছিল, আর যারা হারিয়ে গেছে তাদের কথাও মনে পড়ে। যাদবের বাড়ির দিকেও চোখ তুলে তাকায়। পরানের ভিটের দিকেও তাকায়। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। শুধু শূন্যতা, যেন এক অসীম শূন্যতা গ্রাস করে রেখেছে। তালবনের দিকে শশী ফিরেও তাকায় না। আর সূর্যাস্ত দেখার শখ চিরদিনের জন্য জীবন থেকে মুছে গেছে। এইখানে বুদ্ধদেব গুহের মাধুকরী উপন্যাসের  পৃথুর কথা মনে পড়ে যখন সে  কুর্চির চিঠি হাতে পায়।পৃথু খানিকটা স্বগতোত্তির সুরে বলেছিল, 'আদর যত্ন, ভালোবাসার ব্যাপারটাই বড় গোলমেলে। কোথায় যে কার জন্যে আদরের ভাত বাড়া থাকে, স্নেহ, প্রীতি, ভালবাসা, তা অলক্ষ্যে থেকে সব যিনি দেখেন, তিনিই একমাত্র জানেন। যেখান থেকে পাওয়ার ছিল, সেখান থেকে শূন্যতা নিয়ে ফিরতে হয় আর যেখানে প্রত্যাশার কিছুমাত্রও ছিল না সেখান থেকেই পূর্ণ হয়ে ফেরে।" 

তবে কি শশীর লোকান্তরের পথে যাত্রা শুরু হল? এই উপন্যাসে কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত দেননি। তবে শশীর মনের অবস্থা দেখে বোঝা যায় যে সে কিছু একটা খুঁজছে। নিজের ভিতরে কাউকে খুঁজছে। বিষাদের মধ্যেও জীবনের গভীর রস আস্বাদ করতে চাইছে। তার ভিতরে এক বোধ জাগ্রত হয়। শশী কিন্তু জীবন থেকে পালিয়ে যায়নি। গ্রাম ছেড়েও অন্য কোথাও যায়নি। সমস্ত দুঃখ মাথা পেতে নিয়ে সত্যের মুখোমুখি হয়েছে।  সে গভীর দুঃখে আক্রান্ত। তবু তাকে পাহাড় প্রমাণ প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল। লেখকের কথায়, আজকাল শশী হাঁটে না, মন্থর পদে হাঁটিতে হাঁটিতে গ্রামে প্রবেশ করে। এই মন্থরার  মধ্যেই জীবনের গভীর বাণী নিহিত আছে। নিজের স্বরূপ জানবার ইচ্ছেও লুকিয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের গানে আমরা পাই, "জানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান,

বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ