ভৌতিক উপলব্ধি বনাম শক্তির উপাসনা নজরুলের ভাবনা ও স্বাধীনতা || কাকলী দাশগুপ্ত




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

দীপাবলির রাতে প্রেতাত্মাদের বা অতৃপ্ত আত্মাদের প্রতি যে ভয় বা অলৌকিক ধারণা থাকে, তাকে একদিকে যেমন তুলে ধরা যায়, তেমনই অন্যদিকে এই রাতে দেবী কালী বা অন্যান্য দেবীর শক্তির আরাধনার মাধ্যমে সেই ভয়কে জয় করার বিষয়টিও দেখানো যেতে পারে।


ভৌতিক উপলব্ধি এবং শক্তির উপাসনা দুটি ভিন্ন ধারণা, যেখানে ভৌতিক উপলব্ধি সাধারণত অশুভ আত্মা বা অতিপ্রাকৃত সত্তার সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে শক্তির উপাসনা হলো ঐশ্বরিক শক্তিকে পূজা করা, যা সনাতন ধর্মে আত্ম-উপলব্ধি এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। শক্তির উপাসনা আধ্যাত্মিক মুক্তি এবং জাগরণের উৎস, যা মহাজাগতিক শক্তির সঙ্গে একাত্ম হতে সাহায্য করে, যেখানে ভৌতিক উপলব্ধি সাধারণত ভয় এবং নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত। 


*ভৌতিক উপলব্ধি*


*ধারণা:* 

এটি এমন একটি বিশ্বাস যেখানে মানুষ অতিপ্রাকৃত বা অশুভ সত্তা, যেমন ভূত, প্রেতাত্মা, বা অশুভ শক্তির উপস্থিতির অনুভূতি পায়।

*অভিজ্ঞতা:* 

ভৌতিক উপলব্ধির সঙ্গে প্রায়ই ভয়, আতঙ্ক এবং নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার সঙ্গে অতিপ্রাকৃত সংযোগের অভিজ্ঞতা জড়িত থাকে।

*প্রতিকার:* 

লোকবিশ্বাস অনুসারে, ভূত তাড়ানোর জন্য বেজ বা ঝাড়ফুঁক, মন্ত্র বা তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপ, এবং নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের ব্যবহার করা হয়, যেমন গরুর গোবর বা মূত্র। 


*শক্তির উপাসনা*

*ধারণা:*

 এটি একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন যেখানে ঐশ্বরিক শক্তিকে পরম সত্তা হিসেবে পূজা করা হয়। সনাতন ধর্মে এই শক্তিকে প্রায়শই দেবী রূপে পূজা করা হয়। 

*অভিজ্ঞতা:*

 এই উপাসনা আধ্যাত্মিক মুক্তি, জাগরণ এবং রূপান্তরের একটি পথ। এটি মহাজাগতিক শক্তির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে আত্ম-উপলব্ধিতে সাহায্য করে। 

প্রতিকার: শক্তির উপাসনায় বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, যেমন পূজা, যজ্ঞ এবং মন্ত্র জপের মাধ্যমে দেবীর কাছে সাহায্য চাওয়া হয়। এর লক্ষ্য হলো অশুভ শক্তি থেকে মুক্তি লাভ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন করা। 


*মূল পার্থক্য*

*উদ্দেশ্য*:

 ভৌতিক উপলব্ধি সাধারণত ভয় বা অশুভ থেকে মুক্তির সঙ্গে জড়িত, যেখানে শক্তির উপাসনার উদ্দেশ্য হলো আধ্যাত্মিক মুক্তি এবং জাগরণ লাভ করা।

*প্রকৃতি:* 

একটিকে নেতিবাচক বা ভয়ের বিষয় হিসেবে দেখা হয়, অন্যটি ইতিবাচক এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ হিসেবে বিবেচিত হয়।

*প্রয়োগ:*

 ভৌতিক উপলব্ধির প্রতিকার হিসেবে সাধারণত লোক-প্রচলিত পদ্ধতি বা ঝাড়ফুঁকের উপর নির্ভর করা হয়, যেখানে শক্তির উপাসনা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে গঠিত। 


 নজরুলের ভাবনা ও স্বাধীনতা আন্দোলন - 

দীপাবলিকে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে না দেখে, এটিকে নজরুলের মানবতাবাদী ও জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। কারণ, নজরুল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে এক মানুষ হিসেবে দেখতেন এবং তার কবিতা ও গানে স্বাধীনতার এক অন্যরকম সুর ছিল, যা এই উৎসবের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।

উদাহরণস্বরূপ, নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার মতো একটি শক্তির রূপ এখানে তুলে ধরা যেতে পারে, যা পরাধীনতার অন্ধকার থেকে মুক্তি চেয়েছিল।

জনপ্রিয়তা ও প্রতিবাদ: 

তাঁর লেখাগুলি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে "ধূমকেতু" পত্রিকার মতো প্রকাশনাগুলি দ্রুত শেষ হয়ে যেত, যা ব্রিটিশ সরকারকেও বিচলিত করত। 

এইভাবে, নজরুলের ভৌতিক ভাবনা ছিল একাধারে বিপ্লবী, সাম্যবাদী এবং ব্রিটিশ বিরোধী, যা তাঁকে স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছিল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ