পোস্ট বার দেখা হয়েছে
( ১৫০ তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি)
----------------------------------------------------
হুগলির দেবানন্দপুরে সরস্বতীর তীরে,
অভাব–অনটনের ঘরে জন্ম নিল এক শিশু, শরৎচন্দ্র।
ডাকনাম - ন্যাড়া, নাটু
কিন্তু ভাগ্যের অদৃশ্য লিপি বলছিল অন্য কথা….
যেখানে কালি-কলমে জ্বলে উঠবে এক জাতির আর্তি, স্বপ্ন।
দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবার,
মতিলাল চট্টোপাধ্যায়ের অস্থিরচিত্ত, উদাসীন জীবন,
মৃণালিনী দেবীর স্নেহমাখা কোলে
গড়ে উঠল বালক—
যার শৈশব কেটে গেল তীব্র অনটন আর ধারাবাহিক সংগ্রামে।
ভাগলপুরে ছাত্রবৃত্তির আলো পেলেও,
কলেজের কুড়ি টাকার ফি দিতে না পেরে
থেমে গেল পড়াশোনা।
কিন্তু প্রতিভা যে হার মানে না কখনো !
ভবঘুরে জীবনে সে খুঁজে চলল মানুষের বেদনা,
খুঁজে ফিরল সমাজে লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, অবহেলিত মুখ ...তাদের জীবন সংগ্রাম.....
রেঙ্গুনে, একদিন, ঝড়-বৃষ্টির রাতে এক সুন্দরী তরুণী
হঠাৎই আশ্রয় নিল তার ঘরে। শরৎচন্দ্র রাতে ফিরে দেখলেন, ঘরে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ। অনেক ডাকাডাকির পর দরজা খুলে কান্নায় ভেঙে পড়ল মেয়েটি।
জানালো - বাড়িতে নিত্য মদের আসরে তার দরিদ্র বাবা এক বুড়ো ধনী মদ্যপের সাথে তার বিয়ের কথা চূড়ান্ত করে, অগ্রিম নিয়েছেন টাকা। আজ আসবে সেই মদ্যপ।
শরৎচন্দ্র শান্ত কন্ঠে বললেন—
“নিশ্চিন্তে এই ঘরেই থাকুন, আমি আজ রাতে অন্যত্র চলে যাচ্ছি। কাল সকালে আসবো।
পরের দিন ওই বাড়ির বাসিন্দা ঘোষাল বাবুর সঙ্গে বললেন কথা।
কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার অনুরোধে অবশেষে শরৎচন্দ্র বিয়ে করলেন শান্তিলতাকে।
দু’ বছরের মধ্যেই বার্মা মুলুকে প্লেগ, মহামারীর আকার ধারণ করল। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু।
শরৎচন্দ্র হারালেন স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র।
ডুবে গেলেন বিষাদ সাগরে।
তাঁর উপন্যাসের পাতায়
দেবদাসের অপূর্ণ প্রেম,
চরিত্রহীনের সামাজিক বিদ্রূপ,
গৃহদাহের অগ্নি,
শ্রীকান্তের ভবঘুরে জীবন—
সবখানেই বেজে ওঠে মানবমনের অন্তহীন আর্তি।
“পথের দাবী”-র আহ্বান,
ছিল বিদ্রোহের, মুক্তির, স্বাধীনতার ডাক।
দেশসেবার অগ্নিশপথে জ্বলতে থাকা এই কথাশিল্পী
ছিলেন সাহিত্যের সৈনিক,
ছিলেন কংগ্রেসের নেতা,
ছিলেন বিপ্লবীদের সাথী।
তিনি বলেছিলেন—
“দেশসেবা কথার কথা নয়,
এ সাধনা, এ ত্যাগ, এ প্রাণ বিসর্জনের পথ।”
তিনি আরো বলেছিলেন—
“ভগবান যে চোখ দুটো দিয়েছেন
সেগুলো খুলে রেখো—
ঘড়ির চেন, হীরের আংটি না থাকলেও
মানুষকে ছোট করে দেখো না।”
আহা! কী মানবিক, কী সহজ সরল...
নিজে ছিলেন চিররুগ্ন, আর্থিক অনটনে ক্লিষ্ট,
তবু অন্যের বেদনা দেখলে সাধ্যমত ঝাঁপিয়ে পড়তেন...
সেই যন্ত্রনাই হয়ে উঠতো তার কলমের প্রেরণা।
১৯৩৮ সালের জানুয়ারির এক সকালে
চির বিদায় নিলেন শরৎচন্দ্র।
বাংলা কথাসাহিত্যেকে দিয়ে গেলেন এক অনন্য দীপ্তি। তাঁর সাহিত্যকীর্তির অনুবাদ হল বহু বহু ভাষায়।
আজও যখন আমরা পড়ি মহেশ,
দেখি ক্ষুধার্ত গরুর চোখে কৃষকের দুঃখ,
অথবা পড়ি অভাগীর স্বর্গ,
মনে হয়—শরৎচন্দ্র আমাদের হৃদয়ের অন্তঃস্থলে
শাশ্বত আসনে অমলিন, চিরজীবী।
তিনি শুধু কথাশিল্পী নন,
তিনি মানুষের শিল্পী।
অসহায়ের বন্ধু, নিপীড়িতের কণ্ঠস্বর,
সাহিত্যের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র
সাধারণ মানুষের আপনজন...
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
তিনি বলতেন - " মানুষের মরণ আমাকে বড় আঘাত করে না, করে মনুষ্যত্বের মরণ দেখিলে।"
আসুন, স্বদেশকে ভালোবাসি,
গড়ে তুলি হিংসা–দুর্নীতি মুক্ত মানবিক সমাজ।
সবার জন্য সমান ন্যায়, সমান অধিকার
তাহলেই শরৎচন্দ্রের কলমের স্বপ্ন পাবে পূর্ণতা...
আমাদের শ্রদ্ধা নিবেদন হয়ে উঠবে সার্থকতায় ভাস্বর।
--------------------------------------------
কোলকাতা ১৫.০৯.২০২৫
Photo - Google

0 মন্তব্যসমূহ