পোস্ট বার দেখা হয়েছে
তোমার বোধে জাগ্রত ...
দে ব লী না
“সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম আনন্দরূপমমৃতম্ যদ্বিভাতি”---
এই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রতিদিনের ধ্যানের মন্ত্র।তার সমস্ত জীবন ও বিপুল সৃষ্টি ধারা এই উপনিষদীয় ভাবনারই ফলশ্রুতি।ছেলেবেলায় পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ রাতে ঘুম থেকে তুলে ঠাণ্ডা জলে স্নান করিয়ে ছোট্ট রবিকে শ্লোক আবৃত্তি করাতেন আর পরিচয় করিয়ে দিতেন বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে। উপনিষদের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের সেই তখন থেকেই শুরু আর সারাজীবনের সমস্ত চড়াইউৎরাইয়ের পথে যা পাথেয় করে বাবামশায় তখনই দুহাতে সাজিয়েদিয়েছিলেন। সারাজীবনে সেই শিক্ষা কখনো তাঁকে ত্যাগ করে যায়নি।
যত দিন গেছে, যত কষ্ট পেয়েছেন , যত বিচ্ছেদ সয়েছেন; আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরেছেন উপনিষদের আশ্রয়কে।তাঁর জীবন এক অখণ্ড উত্তরণ, উপনিষদ সেই জীবনের ভিত্তিভূমি তৈরি করে দিয়েছিল সেই শৈশবেই।
“আমার জীবনের মধ্যে কিসের জোয়ার আসিতেছে জানিনা--- ঈশ্বরের দিকে তাকাইয়া আছি”--
গীতাঞ্জলির গানগুলি লেখার সময় বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলতেন, “গীতাঞ্জলির ভিতর দিয়ে আমি আমার বড়-আমিকে প্রকাশ করেছি, যার সঙ্গে এই প্রতিদিনের আমিটার অনেক তফাৎ। যখন পুত্রশোকাতুরা মা, কি অল্পবয়সী বিধবা মেয়ে আমাকে এসে বলে যায় যে আমি তাদের জীবনে শান্তি দিয়েছি তখন বুঝি, গীতাঞ্জলি শুধুই যদি কবিতা হতো, তাহলে জনসাধারণের মনে এমন করে স্থান পেতুম না , কারণ কয়জনই বা কবিতা বোঝে? এই বড় জায়গায় মনকে পৌঁছে দিতে উপনিষদ আমাকে সাহায্য করেছে”--।
ইন্দিরা দেবীকে লিখলেন,
“এই কবিতাগুলি আমি লিখব বলে লিখিনি--- এ আমার জীবনের ভিতরের জিনিস--- এ আমার সত্যকার আত্মনিবেদন--- এর মধ্যে আমার জীবনের সমস্ত সুখ দুঃখ সমস্ত সাধনা বিগলিত হয়ে আপনি আকার ধারণ করেছে”।
১৯১৩ যখন তিনি মনোনীত হলেন নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য এবং ১৯১৪র ২৯শে জানুয়ারি রবীন্দ্রনাথের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে আসলেন লর্ড কারমাইকেল। বিশ্বসভায় কবির সিংহাসন পাতা হল। দেশ জুড়ে কবিকে সম্বর্ধনার ঢেউ উঠল। আর কবি গাইলেন,
“এ মনিহার আমার নাহি সাজে/ এরে পরতে গেলে লাগে, এরে ছিঁড়তে গেলে বাজে/ ... ঐ দিকে যে মন পড়ে পড়ে রয়, মন লাগেনা কাজে”।।
রবীন্দ্রনাথের সারাজীবনের বেশিরভাগ কাব্য জুড়ে শুধুমাত্র ' আমি ' র খোঁজ। এই ‘আমি’ আসলে কে ? যে ‘তুমি’কে খুঁজে বেড়ায় ? সেই ‘তুমি’ই বা কে?
"আমি তারেই খুঁজে বেড়াই যে রয় মনে,আমার মনে।
সে আছে ব'লে
আমার আকাশ জুড়ে ফোটে তারা রাতে,
প্রাতে ফুল ফুটে রয় বনে আমার বনে॥"
কবি তার আগুন্তি কাব্যে ও কবিতায় জীবনস্বামী, প্রভু, নাথ, সুন্দর, অন্তর্যামী, রাজা, প্রিয়, বন্ধু, পরানসখা--- কত নামেই ডেকেছেন তাঁকে।
আর তাঁর ‘আমি’ সেই পরমের কাছে পৌঁছতে চায় কখনো, কখনোবা ছোট্ট ‘আমি’র বলয় থেকে বেরিয়ে এসে মিশে যেতে চায় এক ‘মহা-আমি’র মধ্যে।
" মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে
আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে ॥
তুমি আছ, বিশ্বনাথ, অসীম রহস্যমাঝে
নীরবে একাকী আপন মহিমানিলয়ে ॥"
আবার লিখছেন ...
" এত আলাে জ্বালিয়েছ এই গগনে
কী উৎসবের লগনে।
সব আলােটি কেমন ক’রে
ফেল আমার মুখের ’পরে,
আপনি থাক আলাের পিছনে॥"
তার কাব্যে প্রেম ও পূজা মিলেমিশে হয়েছে একাকার। কোথাও চলে তাঁর সঙ্গে নিত্য বোঝাপড়া, কোথাও নিঃশর্ত আত্মনিবেদন, কখনো.... অনন্ত অপেক্ষা----
"আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার,
পরানসখা বন্ধু হে আমার।
আকাশ কাঁদে হতাশ সম,
নাই যে ঘুম নয়নে মম,
দুয়ার খুলি হে প্রিয়তম,
চাই যে বারেবার।"
জগত তাঁর কাছে আনন্দময়। ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতেন প্রকৃতি ও জীবের মধ্যে, নারী পুরুষের প্রেমে। উপনিষদে যাকে বলে, “সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”। তিনি বলতেন, তত্ত্ববিদ্যায় আমার কোনও অধিকার নেই। দ্বৈতবাদ অদ্বৈতবাদের কথা উঠলে আমি চুপ করে থাকি। আমি কেবল অনুভবের কথা বলি, আমার মধ্যে যে অন্তর-দেবতা আছেন, তিনি সেই আনন্দ- প্রেম আমার সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আমার সমস্ত সত্তা, আমার অতীত ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এই লীলার আমি তো কিছুই বুঝিনা , শুধু সেই নিত্য এই প্রেমের লীলা চলে আমার অন্তরে....
“আলোকের অন্তরে যে আনন্দের পরশ পাই,
জানি আমি তার সাথে আমার আত্মার ভেদ নাই।
এক আদি জ্যোতি – উৎস হতে
চৈতন্যের পুণ্য স্রোতে
আমার হয়েছে অভিষেক, ললাটে দিয়েছে জয়লেখ,
জানায়েছে অমৃতের আমি অধিকারী;
পরম-আমির সাথে যুক্ত হতে পারি
বিচিত্র জগতে
প্রবেশ লভিতে পারি আনন্দের পথে”।
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথই প্রথম নান্দনিকতা নিয়ে এলেন, যিনি সাহিত্য রচনার প্রথাগত বৃত্ত হতে মুক্ত হয়ে তার রচনায় বিশুদ্ধ নন্দনতত্ত্বের উত্তরণ ঘটান। শুধু তথ্য নয় তার সাথে ভাব ও অনুভবের রসধারা মিশিয়ে কবি তার সৃষ্টিকর্মকে প্রতিষ্ঠা করেন। সৃষ্টির সমস্ত রূপের সার্থকতা আসে আনন্দে। আর সুন্দরের বিকাশ যখন অখন্ড ও সামগ্রিকভাবে প্রকাশিত হয় তখন সেই সৌন্দর্য সত্য, মঙ্গলময় ও আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে। “সত্যের যথার্থ উপলব্ধি মাত্রই আনন্দ, তাহাই চরম সৌন্দর্য”-রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে সত্য সুন্দর ও আনন্দের স্বরূপ অভিন্ন। বিশ্ব প্রকৃতির রূপের মধ্যেই তিনি অরূপ রতন পেলেন।
‘সত্য ও সুন্দরের’-পথে থাকাই হলো ধর্ম। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যকে কখনো সাম্প্রদায়িক সীমা মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যতত্ত্বের মূলে রয়েছে ‘মিলন তত্ত্ব’। তাঁর কথায়-“যা জ্ঞানের বিষয় তা প্রকৃত পক্ষে সাহিত্য পদবাচ্য হতে পারে না। ভাবের বিষয়ই একমাত্র সাহিত্য। অপর ক্ষেত্রে যা সাময়িক প্রয়োজন মিটিয়ে শেষ হয়ে যায় তা হলো প্রয়োজনীয় সাহিত্য।”
রবীন্দ্রনাথের মতে সাহিত্যের অন্তর্নিহিত সত্য সুন্দর, সত্য-আনন্দের ধারা- একবার মানুষের মনে প্রবেশ করলে সে প্রাত্যহিক গ্লানিও আবর্জনা হতে মুক্তি পায়-তার মন উত্তরোত্তর মহত্তর জীবনের সন্ধানে অনন্ত তৃষ্ণা নিয়ে ছুটে চলে , এ অন্বেষণের কোন সীমা নেই। তাই তো তিনি বলেন-
"অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে।
নির্মল করো উজ্জ্বল করো,
সুন্দর করো হে।
জাগ্রত করো, উদ্যত করো,
নির্ভয় করো হে।
মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে।
অন্তর মম বিকশিত করো,
অন্তরতর হে।"
বাংলা সাহিত্যের ঋষি পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আদতেই শিশুর মতো সরল ও কল্পনার রঙে জারিত একটি মন। তাই তাঁর শিশুতোষ কবিতা ও ছড়া গুলি শিশু ও কিশোর মন ও ভাবনাকে সহজেই প্রভাবিত ও উর্বর করে তোলে, প্রকৃতির নানা রূপ - রস - গন্ধের এমন সুন্দর উপমায় বর্ণনা যা পড়ে শিশু মন কল্পনার রঙিন ডানা মেলে দেয় সহজেই । তাদের চঞ্চল - সরল ভাবনাগুলো ভরপুর আত্মবিশ্বাস ও প্রাণশক্তিতে ভরে ওঠে।
যেমন বীরপুরুষ কবিতায় বলছেন শিশু মনের এক অসম্ভব সাহসী আত্মবিশ্বাসী গল্পঃ ,ছোট্ট ছেলে যে তার মাকে নিয়ে যাচ্ছে অনেক দূরে , পথে দস্যু ডাকাতের কাছ থেকে বীরত্বের সাথে লড়াই করে মাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে।
” মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে,
তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা চ’ড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।”
ছোটদের মতো তাঁর মনটাও যখন যা দেখেছেন তাই করতে চেয়েছেন বা হতে চেয়েছেন।
তিনি লিখেছেন –
“” যখন যেমন মনে করি তাই হতে পাই যদি,
আমি তবে এক্ষুণি হই ইচ্ছামতি নদী।”
অথবা,
” মা যদি হও রাজি,
বড় হলে আমি হব খেয়াঘাটের মাঝি। ”
এভাবে বার বার সরল বিশ্বাস ও রামধনুর রং হয়ে তিনি ছোটো ও কিশোর মনে এক বর্ণিল আলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন।বিশেষ কোন বয়েস , স্থান - কাল নয়, তার চিন্তা ও চেতনার নব নব দিক ও ভাবনা যা প্রতিমুহূর্তে আমাদের সকলকে উদ্বুদ্ধ করেছে , আমাদের ভরসা দিয়েছে।
শেষ ভাষণেও তিনি নবজীবনের মানবতার জয়গান গেয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু চেতনা প্রবন্ধে তিনি বলেন-“মৃত্যুর মধ্যে যে শোক, সেই শোকের শত যন্ত্রণা ছাপিয়েও এই যে ঐকান্তিক প্রেম, এই প্রেমের শক্তিই আমাদের সংলগ্ন করে রাখে জীবনের প্রবহমনতার সংগে।”
তার কাছে মৃত্যু সে চির নতুনের দূত , উত্তরণ সে আঁধার থেকে আলোর পথের “অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো”। জীবনের শত ধারার স্নানে সকল অপূর্ণতা ,নির্দৃষ্টের সীমানা পার করে সে অনির্দিষ্ট - অমর। কবির অনুভবে মৃত্যু জীবনেরই আর এক নাম। জন্মজন্মান্তর অনন্ত যাত্রাপথের পথপ্রদর্শক ,কখনো সে মহাকালের মহামিলনদূত
কখনো সে রহস্যময়তায় ঘেরা,তবুও সে সর্বতাপ বিমোচনকারী অনিন্দ্যসুন্দর! এই অনাবিল অনন্তের ধারা মৃত্যু পরবর্তী অবস্থায় পর্যবসিত হয়।
" জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণা ধারায় এসো।
সকল মাধুরী লুকায়ে যায়, গীতসুধারসে এসো॥
কর্ম যখন প্রবল-আকার গরজি উঠিয়া ঢাকে চারি ধার
হৃদয়প্রান্তে, হে জীবন নাথ, শান্ত চরণে এসো॥"
কবির চেতনায় মৃত্যু আদতে জীবনের’ই এক অধ্যায়। মরণের স্রোতে বারবার ধৌত হয়েই জীবনের অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্তি ঘটে মানুষের।
‘‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবু শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।"
এই গানটির আলোকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচিন্তায় নান্দনিকতার সফল উপস্থিতিই স্পষ্ট।
তিনি আমাদের কাছে এক মহীরূহের মতো। যাঁর দর্শনের ছায়া মেলে ধরেছে তাঁর উপন্যাস এ, গানে কবিতায়। আর সেই সাহিত্যই জীবনের বিভিন্ন পদক্ষেপে উজ্জিবীত করে চলেছে আমাদের প্ৰতিনিয়ত। সুখ হোক বা দুঃখ, অবসাদ বা সামাজিক অবক্ষয়,প্রেম বা বিরহ সমস্ত ক্ষেত্রে জীবনী শক্তিতে উদ্বুদ্ধ করে তাঁর লেখা। শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ দিনে নয়, বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে রোজ উদযাপন করে, জন্মের উৎসবই হোক বা প্রতিদিনের যাপনেই হোক কিংবা মহাপ্রয়ানের বিষণ্ণ মুহূর্তে।





4 মন্তব্যসমূহ
খুব সুন্দর বিশ্লেষণ ।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ হয়েছ আলোচনা
উত্তরমুছুনঅ সা ধা র ন
উত্তরমুছুনএ শ্রদ্ধাঞ্জলি বেশ সুন্দর
উত্তরমুছুন