যোগাযোগ।। রাজা সাহেব মুখোপাধ্যায়।।




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

অরিত্রর খুব প্ল্যানচেটের নেশা।ছোট থেকেই একটু আধটু লাইব্রেরিতে ভূতুড়ে গল্প গুলো নাড়াচাড়া করতে গিয়ে বুঝেছিলো প্ল্যানচেটে প্রেতাত্মাদের আনা যায়।কিন্তু মৃত ভালো আত্মারা কি আদৌ ডাকে সাড়া দেয়?

প্রশ্নটা ঘুরপাক করতো।কারণ বহুদিন হলো অরিত্রর প্রিয় ঠাকুমা চলে গেছেন জীবনের ওই পারে।যখন বেঁচে ছিলেন,বেকার অরিত্র সব দুঃখ কষ্টের কথা একমাত্র ঠাকুমাকেই বলতো।কেউ জানতো না তাদের অন্তরঙ্গ কথাবার্তা।এক সময় হঠাৎ ঠাকুমা তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলো!

তারপর থেকে অরিত্রর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে ঠাকুমার কথা মনে পড়লেই!চোখ ভিজে যায়।ঠাকুমার মতো অনুভূতির স্নেহ যত্ন আর দেখা করতে গেলেই কৌটোর ভিতর থেকে বিস্কুট, নাড়ু আর তো কেউ দেয়নি ওকে!দেবেও না।এটা কোন বস্তু লাভ নয়,বরং অপার স্নেহের প্রকাশ।


এভাবে দশ বছর কেটে গেছে।অরিত্র একটা ছোট খাটো কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে চলে গেছে ঘর থেকে অনেক দূরে।মাঝে মাঝে ঘরের জন্য মন খারাপ হয়,বিশেষ করে মৃত ঠাকুমার জন্য আর তখন সে গভীর রাতে প্ল্যানচেটের সরঞ্জাম নিয়ে বসে পড়ে।কিন্তু কিছুতেই তার ঠাকুমার কণ্ঠ শোনার মনের ইচ্ছা পূরণ হয় না।কতবার মেসের বন্ধুকেও মিডিয়াম করে অনেক চেষ্টা করেছে,কিন্তু বিফলই হয়েছে।দিন চলে যায়..

কাজের শেষে একদিন খুবই সন্ধ্যা হয়ে যায় ফিরতে। পথেই একটা কালী মন্দির পরে।পাশেই একটা শ্মশান।একটি সরু নদী কুল কুল করে বয়ে গেছে।তার শব্দে যেন কত প্রেতাত্মারা কথা বলে!

এভাবে একদিন অরিত্র কাজ থেকে ফেরার পথে মন্দিরে বেশ কিছুক্ষণ বসে সময় কাটালো।নির্জনতার শান্তি তাকে বিবশ করে দিলো।কখন পুরোহিত সন্ধ্যা দিয়ে চলে গেছে তার খেয়ালই নেই!

হঠাৎ সম্বিৎ ফিরলো একজনের স্পর্শে।একটি বয়স্ক মহিলা,চাদর মুড়ি দিয়ে এসে ওকে ডেকে বললো," অরু !

কি এতো চিন্তা করিস দিন রাত?

চলে গেলে কেউ কি ফিরে আসে বাবা?

মন খারাপ করিস নে।"

চমকে উঠলো অরিত্র! এ নামে তাকে একমাত্র ঠাকুমাই ডাকতো।

সে প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেও,ভিতরের কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করে বসলো,"তুমি কে বুড়ি মা?"প্রদীপ টা একটু উসকে দিই দাঁড়াও।তারপর কথা বলছি।"

অরিত্র কালী মন্দিরের দাওয়ায় টিম টিম করে জ্বলা প্রদীপটার কাছে যেতেই একটা দমকা ঠান্ডা বাতাসে ওটা নিভে গেলো!

কিছুটা হতচকিত হয়ে অরিত্র পকেটে রাখা মোবাইলটা খুঁজতে গিয়েও পেলো না!

তখন ওই বুড়ি মা একটি চেনা খিল খিল শব্দে বলে উঠলো,"আর তোকে আলো জ্বালতে হবে না রে!তুই আমাকে চিনিস,আমিও তোকে।ওই চাঁদের আলোয় আমি তো তোকে বেশ চিনতে পারছি।এখন কাজ পেয়েছিস,তবু মুখখানা অমন শুকিয়ে গেছে কেনো রে?ভালো করে খাবি।"

অরিত্র আর যেন কিছুই কথা বলতে পারছে না,একেবারে স্থবির হয়ে বসে আছে।শুধু অবাক চোখে দেখছে একটা আঁধারের ছায়া অবয়ব নিয়েছে,কাঁপা গলায় ওকে স্নেহের ওষুধ ঢেলে দিচ্ছে আর দীর্ঘদিনের ক্ষত টা যেন সেরে উঠছে!একটা ভিন্ন আনন্দ,আবার চাপা আতঙ্ক,কৌতূহল তাকে ভিতরে অস্থির করলেও মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিশ্চল করে দিয়েছে।কিছুতেই উঠতে পারছে না।অরিত্র আর কোন কথা বলতে পারছে না দেখে,ওই ছায়া মূর্তি বলে উঠলো," তুই যখন চুপই আছিস,আমি যাই রে।তবে হ্যাঁ, বেশীক্ষণ এখানে থাকিস না।আজ একটু দূরের ওই পথের পাশেই ঝোপ টাই ওরা সবাই আসবে।যত পুরোনো হিসেব করবে।তার আগেই বাড়ী ফিরে যা।ইচ্ছে হলে আবার আসবে,আর একদিন দেখা হবে।"

তারপর সে তার ঝোলা থেকে কি একটা বের করে,নিজেই অরিত্রর ব্যাগে রেখে দিলো।তারপর হঠাৎ প্রদীপের আলোটা উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠলো আর একটি শীতল স্পর্শ অরিত্রর চিবুক ছুঁয়ে যেন কোথায় মিলিয়ে গেলো!

অরিত্রও যেন সঙ্গে সঙ্গে সম্বিৎ ফিরে পেলো।সাইকেল টা সে দ্রুত চালিয়ে যেন একটা ঘোরের মধ্যে ঘরে ঢুকলো।ঢুকেই মেসের বন্ধুটিকে বলে উঠলো,"ভাই,এক কাপ গরম চা দে তো" কি শিরশিরে হাওয়া লাগলো গায়ে!এখনো যেন ভিতরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে।"

তারপর অরিত্র আর ব্যাগ থেকে জিনিসপত্র বের করতে গিয়ে অবাক!

একটা কৌটো ভর্তি নারকেল নাড়ু,ঠিক যেমনটি তার ঠাকুমা তাকে দিতো বিজয়ার পর কৌটো থেকে বের করে।

সেই কৌটোয় এখনো যেন খুব সরু সরু আঙুলের দাগ!

অরিত্র চমকে উঠলো!

একেবারে চুপ।তার বন্ধু চা নিয়ে এসে ওকে ঝাঁকিয়ে দিলে,শুধু অস্ফুট স্বরে বললো,"ওরে,প্ল্যানচেট আর লাগবে না।ওই সব সরঞ্জাম তুই ফেলে দিস।আমি ঠিকানা পেয়ে গেছি।"

বন্ধু কিছুই বুঝলো না।শুধু যেন সিঁড়িঘরে একটি বিড়াল মায়াময় কণ্ঠে দেখে সম্মতি জানালো।আর একটি শিরশিরে বাতাস অরিত্রর চিবুক ছুঁয়ে জানলার পাল্লাটা সশব্দে খুলে দিলো।

অরিত্র দেখতে পেলো কালো মেঘের আড়ালে চাঁদটি যেন সেই সাদা চাদরের ছায়ার মতো খিল খিল করে হাসছে আর তার দিকে চেয়ে আছে!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ