নিবন্ধ | দীপান্বিতা রায়




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


আধ্যাত্মিকতা ও বিজ্ঞান
দীপান্বিতা রায়

"আধ্যাত্মিকতা" শব্দটি আধ্যাত্বিক শব্দ থেকে এসেছে। যেটি সংস্কৃত শব্দ "আধ্যাত্ম+ইক" থেকে জাত। এর থেকে প্রাপ্ত অর্থ গুলি হল

১. আত্ম সম্বন্ধীয়, আত্মিক, spiritual
২. ব্রম্ভ বিষয়ক, 
৩. মানসিক অর্থাৎ আধ্যাত্মিক চিন্তা, আধ্যাত্মিক সাধনা।

      আর" বিজ্ঞান" শব্দটির অর্থ হল বিশেষ জ্ঞান, তত্ত্ব জ্ঞান অথবা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার দ্বারা লব্ধ প্রণালীবদ্ধ জ্ঞান।
      যে বিশেষ জ্ঞানের দ্বারা সঠিক অভ্যাসে জীবনকে পরিচালিত করার; একটি পন্থা বা মার্গ র্নিদর্শন করা হয়, তাই হল যোগ।
       যোগ হলো একটি জীবন দর্শন, যোগ আত্মানুশাষণ ও বটে, যোগ হলো একটি জীবন পদ্ধতি, যোগ হলো ব্যাধিমুক্ত, সমাধি যুক্ত জীবনের সংকল্পনা। যোগ হলো আত্মপ্রচার এবং আত্মদর্শনের শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক পদ্ধতি বা বিদ্যা।
       যোগ ব্যক্তিত্বকে বামন থেকে বিরাট বানানোর বা সমগ্র রূপে নিজেকে রূপান্তরিত বা বিকশিত করার আধ্যাত্মিক বিদ্যা।
       যোগ মাত্রই এক বৈকল্পিক চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, পড়ন্ত যোগের প্রয়োগ পরিণামের প্রতি আধারিত একটি এমন প্রমাণ যা ব্যাধি কে নির্মূল করে । অতএব, এটি একটি সম্পূর্ণ বিদ্যা। প্রাণায়ম শুধু শরীরের বা শরীরের রোগের নয়, বরঞ্চ মানসিক রোগের চিকিৎসা শাস্ত্র।
      আমরা জানি, সুস্থ শরীরের ভিতর থাকে সুস্থ মন। যার মন যত সুস্থ সে সবকিছুকে ততো তাড়াতাড়ি অতিক্রম করতে পারে। আধ্যাত্বিকতার মধ্যে রয়েছে নিজেকে সঠিকভাবে চেনার উপায়, যে নিজেকে চিনতে পারে, জানতে পারে, তার অপরকে চেনা বা জানার প্রয়োজন হয় না। আধ্যাত্মিক চেতনার মূল উৎস হলো নিজের মনকে শান্ত রাখা। যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের ইন্দ্রিয়কে স্থির রাখতে পারে, সেই সকল সমস্যা থেকে সমাধানের পথ নির্ণয় করতে পারে।
        সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ডের নির্মাণ পৃথিবী, অগ্নি, বায়ু, জল আকাশ তত্ত্বের দ্বারা হয়েছে আর এই পাঁচটি তত্ত্বের মূলেও একটি তত্ত্ব হল বা সর্বত্র বিদ্যমান, আর তা হলো প্রাণ।
"আ বাত বাহি ভেষজং বি বাত বাহি যদরূপঃ
ত্বং হি বিশ্বভেষজো দেবানাং দূত ইয়সে ।"
 (ঋগ্বেদ ১০:১৩৭:৩)

অর্থাৎ প্রাণ হলো ভেষজ এবং অক্সিজেন একটি মেডিসিন। এটির নানাভাবে ভিতরে প্রবাহমান হয়। এবং এটি শুধু ঔষধি নয়, এটি বিশ্ব ভেষজ পূর্ণ চিকিৎসা।

      'আধ্যাত্মিকতা' আরেকটি মূল বিষয় হল-ব্রহ্মবিদ্যা।

প্রাণ ই আচার্য এবং ব্রাহ্মণ।
যিনি ব্রহ্মকে জানেন এবং জানাতে পথপ্রদর্শক হন, তাকে ব্রাহ্মণ বলা হয়। যদি আমাদের মনের অন্ধকার দিক গুলিকে আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি, তাহলে আমাদের চেতনাবোধ জাগ্রত হবে। সেই থেকেই গড়ে উঠবে সুসমাজ। যদি কোন ব্যক্তির শারীরিক রোগের সঙ্গে সঙ্গে ডিপ্রেশন বা সিজোফ্রেনিয়ার মতো ভয়ঙ্কর মানসিক রোগে আক্রান্ত হন তাহলে তার এই সমস্যার মধ্যে রয়েছে প্রধান কারণ ভয়। আধ্যাত্মিকতা এমন একটি পথ যা ভয়কে জয় করতে সাহায্য করে। এই আধ্যাত্মিকতা র প্রধান সোপান হল প্রাণ।
     প্রাণের আয়াম অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ হলো প্রাণায়াম। প্রাণায়াম করার ফলে মনের যে অসৎ, অবিদ্যা এবং  ক্লেশরূপী তমসা বন্ধ করের আবরণ থাকে তা ক্ষীণ হয়ে যায় । স্থূল রূপে প্রাণায়াম শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত ব্যায়ামের একটি পদ্ধতি। যার দ্বারা ফুসফুস বলিষ্ঠ হয়, রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা শোধরাবার ফলে সমগ্র ভাবে আরোগ্যতা ও দীর্ঘ আয়ু র লাভ পাওয়া যায়।
       শরীর বিজ্ঞাননুসারে, মানুষের দুটি ফুসফুস‌ই শ্বাস কে ভিতর গ্রহণ করবার সেই যন্ত্র যাতে বায়ু পূর্ণ হয়ে সমস্ত শরীরের বিভিন্ন অংশে উৎপন্ন মলিনতা কার্বনিক গ্যাসকে শরীর থেকে বাইরে বের করতে সাহায্য করে। যদি এই ক্রিয়া ঠিকঠাকভাবে হতে থাকে তাহলে ফুসফুস ক্রমশ মজবুত হয়ে ওঠে, আর রক্ত শোধনের কার্য চলতে থাকে।

     প্রাণায়ামের প্রভাব শুধু শরীরকে সুস্থ রাখার ক্ষেত্রেই নয়, এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে আমাদের চিন্তা ধারায়। প্রানের দ্বারা যখন চিন্তাধারার শুদ্ধ হয়ে যায় তখন ব্যক্তির আচার-ব্যবহার ও শুদ্ধ ও পবিত্র হয়ে যায়। তাই প্রাণায়ম কৃত ব্যক্তি হিংসা, অপরাধ, চুরি, বেইমানি, দুরাচার, বা ব্যভিচার ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়ে সংযম এবং সদাচারের রাস্তায় এগিয়ে চলে। সে একজন সংবেদনশীল চরিত্রবান ব্যক্তি রূপে রূপায়িত হয়। আজকের যুগে এর খুবই দরকার। বেড়ে চলা অবিশ্বাস হিংসা, অপরাধ, ভ্রষ্টাচার, বেইমানি, দুরাচার এর বিপক্ষে প্রণায়াম হল সেই পথ আধ্যাত্মিকতা  ও বিজ্ঞানের দুই বাহু কে একত্রিত করার ফসল, এবং একমাত্র সমাধান।জীবনকে আরো পবিত্রতার দিকে ত্বরান্বিত করার পন্থা। প্রাণ আমাদের পরম পবিত্র ব্রম্ভ পর্যন্ত নিয়ে যায়। পরম সত্যি ও পরম আমোদ কে অনুভূত করায়। রোগের নিবৃত্তি করে সমাধি অর্থাৎ উপলব্ধির। আত্মবোধ, আত্ম জ্ঞান, আত্মার দর্শন, জীবন মুক্তি, অনাসক্তি, ও স্থিত প্রজ্ঞতার উপলব্ধি করায়, এই আধ্যাত্মিকতা ও বিজ্ঞানের ফসল প্রাণায়ম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ