পোস্ট বার দেখা হয়েছে
পাবলিক সার্ভেন্ট — মানে কি ? কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের অধীনে যারা কাজ করে তারাই পাবলিক সার্ভেন্ট .... অর্থাৎ জনগণের চাকর/ভৃত্য! আমিও একসময় দীর্ঘ ৩৭ বছর জনগণের ভৃত্য হিসেবে কাজ করেছি। ভৃত্য হয়ে জনগণের কি সেবা করতে পেরেছি কি না জানি না , তবে আত্মসেবার ব্যবস্থা করতে পেরেছি , এবং এখনও দীর্ঘ পাঁচ বছর আগে অবসর গ্রহণের পরেও জীবন ধারণের খোরাকি পেয়ে যাচ্ছি ! যাব আজীবন!। তবে যতদিন জনভৃত্য ছিলাম., ঘর সংসার ঠিক করে দেখিনি, পারিনিও !
যাক সে সব কথা ফিরে আসি অবসর প্রাপ্ত দিনটিতে। সরকারী নিয়মানুসারে যেদিন অবসর গ্রহণ করার কথা পাঁচ বছর আগে পারিবারিক কারণে স্বেচ্ছায় অবসর (Volentary Retirement) নিলাম। সহকর্মীদের সাথে চোখের জলে ভেসে অবশেষে বিদায় নিলাম। ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ আমার সরকারী চাকুরী (Govt. Servant) থেকে অবসর। মনে পড়ে গেল সেই প্রথম দিন ৩ রা অক্টোবর ১৯৭৪ চাকুরী জীবন। একেবারেই নতুন পরিবেশ সবাই আমার থেকে অনেক বয়স্ক... অবশ্য আমরা কয়েকজন সম বয়সী ও... যাঁরা বয়স্ক তাঁদের মিস্টার অমুক /মিসেস অমুক বলে ডাকতে হবে, যাঁরা আমার কাকা বাবার বয়সী...
স্কুল পাস করে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ভাবলাম সমস্ত নিয়মের বন্ধন থেকে মুক্তি পেলাম... নাহ্ খুব ভুল ভেবেছিলাম বাড়ির করা শাসন তো শেষ হয় নি আর শেষ হাওয়ার নয় বিশেষ করে যখন আমি মেয়ে... বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাষণ আরো কড়া। সেই সকাল - সন্ধ্যে সময় মত পাঠ্য বই, নোটস লেখা - পড়া!! যেহেতু মেয়ে নিয়ম কানুন আর অনুশাসন একটু বেশীই কড়া। যাই হোক আমাদের স্কুলের কিছু আর নতুন বন্ধুদের সঙ্গে কলেজে বেশ কাটছিল। কলেজে আসার পর বাবা কিছু হাত খরচ প্রতি মাসে দিতেন। তাই দিয়ে মাঝে মাঝে ক্যান্টিনে খাওয়া আর লুকিয়ে সিনেমা দেখা, অবশ্যই মাকে বলেই সিনেমা দেখতে যেতাম। বেশ কাটছিল দিনগুলো। ১৯৭৪ সালে রেলওয়ে স্ট্রাইক হল। বাবা রেলওয়েতে চাকরী করতেন। বাবা স্ট্রাইকে জয়েন করেননি। স্ট্রাইকার বিরুদ্ধে ছিলেন। স্ট্রাইক করেননি যাঁরা তাঁরা রেলওয়ে মিনিস্ট্রি থেকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হল...
*১.... এক বছরের ইনক্রিমেন্ট*... কিংবা
*২... তাঁদের সন্তানদের চাকুরী*...
বাবার আর মাত্র চার বছর রিটার্মেন্টের বাকী ছিল তাই সন্তানের চাকুরী *অপট* করেছিলেন। দাদারা চাকরী করতো বলে তাই আমাকে চাকরি করার জন্য বাবা বললেন... বাবার মুখের উপর "না" বলার সাহস ছিল না। তাও সাহস করে একটু প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, এখন পড়া শুনা করছি, চাকরী করব না। যদিও জানতাম নাকচ হবে। যথারীতি নাকচ হলো আর আমার অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা দিয়ে পাস করে রেলওয়েতে ভর্তি হলাম। ৩রা অক্টোবর, ১৯৭৪ জয়েন করলাম.। আর সেই থেকে সরকারী ভৃত্য শুনতে খুব খারাপ লাগে, তাই না? কিন্তু আমাদের প্রিয় ভাষা ইংরেজিতে Government servant.।
যাকগে, ফিরে আসি সেই দিনটিতে যেদিন এই সরকারী অফিস থেকে অবসর গ্রহণ করলাম । জানিনা আদও অবসর থেকে মুক্ত হতে পারলাম কিনা! স্বামীর অসুস্থতার (শয্যাশায়ী) জন্য রিটায়ার্মেন্টের (Retirement) পাঁচ বছর আগেই স্বইচ্ছায় অবসর (Voluntary Retirement —V.R.S.) গ্রহণ করি।
আমার সুদীর্ঘ কর্ম জীবনের কর্ম ব্যস্ত জীবনের অবসানে এক বন্ধু আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বললেন "আজ থেকে তুমি মুক্ত বিহঙ্গ"। হায়রে মুক্ত হলাম কই! পাঁচ বছর ধরে শয্যাশায়ী স্বামীর জন্য স্বেচ্ছায় অবসর নিতে হল। অবসর গ্রহণের দিন দুপুরের পর থেকেই অফিস অচল —বিদায় সম্বর্ধনায় ব্যস্ত সবাই। আমার সহকর্মী বন্ধুরা সিক্ত চোখে বহু উপহার —ফুল, মিষ্টি, বই, কলম নানান উপহারে আমাকে ভরে দিয়েছিল। কত যে প্রশংসা বাণী!! আজও মনে পড়লে আনন্দে প্রবল জোয়ারে ভেসে যাই। আমার সহকর্মী কবি বন্ধু খুব সুন্দর স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। এত ভালবাসার প্রশংসা করেন মন ছুঁয়ে গেল।
আমার বিদায় সম্বর্ধনা প্রায় সমাপ্তির মুখে, এমন সময়ে এক অকালপক্ক জুনিয়র সহকর্মী মাইকের সামনে এসে অমায়িক ভাবে সকলের তরফ থেকে আমাকে কিছু বলার জন্যে অনুরোধ করিল.! বুঝিলাম., আমি এতদিন কঠোর হাতে প্রশাসনিক কাজ করেছি , আজ সেই অর্বাচীন সুমিষ্ট অনুরোধের মধ্যে দিয়ে প্রতিশোধ নিতে চায়.! আমি মনে মনে সীতাদেবীর মতো আকুল প্রার্থনা করিলাম. " হে ধরণী দ্বিধা হও. " ---- কিন্তু কলিকাল তো , ধরণী আমার কাতর আবেদনে সাড়া দিলেন না ! ইতোমধ্যে উপস্থিত সমস্ত সহকর্মীর আব্দার ক্রমশঃ বাড়তে লাগিল. -- কেহ কেহ গান গাইতে অনুরোধ করিল-- মনে মনে ভাবলাম দীর্ঘ ৩৭ বৎসর দাপটে অফিস প্রশাসন করে আজ হেরে যাব.? তাহা হয় না ! মনে মনে বাগদেবীকে স্মরণ করে আমার রাসভনিন্দিত কন্ঠে গান ধরলাম.! গান মুখরা করে অন্তরা থেকে ধরলাম. --
"পেয়েছি ছুটি বিদায় দেঁহ ভাই
সবারে আমি প্রণাম করে যাই।।
........
"অনেক দিন ছিলেম প্রতিবেশী ,
দিয়েছি যত নিয়েছি তার বেশী !
ফিরায়ে দিনু দ্বারের চাবি ,
রাখি না আর ঘরের দাবী !
সবার আজি প্রসাদ বাণী চাই.!
পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহো ভাই.,
সবারে আমি প্রণাম করে যাই. " ------
সবাই নির্বাক., সকলের চোখে জল ., আমার চোখেও আনন্দাশ্রু বয়ে যাচ্ছে । -- আমার অনুজেরা / সমবয়স্করা এসে আলিঙ্গন বদ্ধ করল.! আবার আর একটা গানের অনুরোধ করল। আমি গাইলাম. --
" ভরা থাক স্মৃতিসুধায় বিদায়ের পাত্রখানি --- "
এরপর সরকারী নিয়মানুসারে সব সহকর্মীদের চোখের জলে ভাসিয়ে অবসর নিয়ে গৃহবাসী হলাম.! মনে একটা তীব্র গোপন বাসনা ছিল. --- সুদুর বাল্যকাল থেকে , যতদূর স্মৃতি যায়., সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত স্মৃতির গভীরে অবগাহন করে আত্মকথন লিপিবদ্ধ করবো , সেটা আমার জীবনকাহিনী নয়., সকলের পাঠের জন্যও নয়., শুধুই আত্মতৃপ্তির জন্য.!
আরম্ভও করেছিলাম, কিন্তু বিধি ছিলেন বাম ! বিস্তৃূত কর্মজীবনে সংসারে সং সেজে থেকে আমার দুই ছেলে মেয়ের প্রতি যে অবিচার করেছিলাম., আমার না দেখা সর্বনিয়ন্তা ঈশ্বর তার শোধ নিলেন., আমার স্বামীকে সম্পূর্ণ ভাবে শয্যাশায়ী করে দিলেন.। তখন জনসেবা থেকে রেহাই পেলেও মুক্তি আমি পেলাম না — অবসরও পেলাম না। পরিপূর্ণ স্বামী ও সংসারের সেবার আত্মনিয়োজিত হলাম .! — জানি আমৃত্যু অবসর পাবো না।। আমার আত্মকথন কিছুদূর এগিয়েই থেমে গেল. --
নাঃ , আজ আর লিখতে পারছি না --- আজ আবার মনটা সেই পুরাতন স্মৃতিভারে আতুর --- মনের মধ্যে গুঞ্জরিত হচ্ছে ---- "
সেই পুরাতন হৃদয় আমার আজি,
পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি , -- " ----
আজ আবার মনটা সেই পুরাতন স্মৃতি ভারে ভরে গেল। জীবন যাত্রায় মৃত্যুর আগে অবসর নেই.।।।

0 মন্তব্যসমূহ