মহান ঐশ্বর্য্য || নীলাঞ্জনা ভৌমিক




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

 কোনো গল্প বা কাহিনী নয় আজ এমন একটা অনুভবের কথা শোনাবো যা অন্তরাত্মার গভীর মনন থেকে জাত। এই অনুভব আমাকে উপলব্ধি করতে বাধ্য করেছিল এই বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি অনু- পরমাণু কোথায় যেন একই সূত্রে গাঁথা। প্রতিটা মুহূর্তের কোনো চিন্তন যা চেতনা থেকে উদ্ভূত তা কোথায় যেন লেখা হয়ে যাচ্ছে। 

          খুব ছোট থেকে আমার মা এবং আমার বড়পিসিমার স্নেহকরস্পর্শে বেড়ে উঠছিলাম যাঁদের সান্নিধ্যে আমার আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ হয়। মায়ের হাত ধরে মন্দিরে গিয়ে পুজো দেওয়া আমার প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। মা বলতেন যতক্ষণ পুজো হবে ততক্ষণ দুচোখ বুজে একমনে ভগবানের চিন্তায় নিজেকে ডুবিয়ে দাও। আর আমার বড়পিসিমা যাঁর মাত্র পনের বছর বয়সে বিয়ে হয় আর তার মাত্র দশমাসের মাথায় তাঁর স্বামী অর্থাৎ আমাদের বড়পিসেমশায় মারা যান। যৌবন যখন তাঁর সবেমাত্র প্রস্ফুটনের মুখে তখন থেকে সংসারে থেকেও তিনি যেন সন্ন্যাসীনি।আমার বাবা তাঁকে শ্বশুড়বাড়ি থেকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন এবং বহু চেষ্টা করেন তাঁকে দ্বিতীয়বার সংসারী করার। কিন্তু তাঁকে কিছুতেই রাজি করানো যায় নি। আমরা দশ ভাইবোন অর্থাৎ আমরা চার ভাইবোন আর বাকি তিনপিসির ছয় ছেলেমেয়েরাই তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিলাম। আর একজন ছিলেন তাঁর নিত্যসঙ্গী - একটি কালো পাথরের শিবলিঙ্গ যাঁর মাথায় তিনি আমরণ জল ঢেলে গেছেন। যতদিন তিনি বেঁচেছিলেন আমার শিবভক্ত পিসিমা এই নিয়মের অন্যথা করেন নি। প্রতিবছর শিবরাত্রির দিনে চার প্রহরে ( দুধ,ঘী, দই, গঙ্গাজল ) চার বার রাত্রি জেগে শিবের মাথায় আমরা ( পাড়ার মেয়েরা আর আমি ) ঢালতাম। পুজো শেষ হতে রাত সাড়ে তিনটে বেজে যেত। 

আমার এত কথা বলার একটাই কারণ যে এই মহান দুই মানুষের সংস্পর্শে এসে আমার চেতনাও ধীরে ধীরে জাগ্রত হয়ে উঠছিল।

আমার বিয়ের বছর দশেক পর আমি আমার স্বামী আর দুই পুত্রকন্যার সঙ্গে দেওঘর বেড়াতে যাই। উদ্দেশ্য বৈদ্যনাথ ধাম অর্থাৎ বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির দর্শন করা। আমরা একদিন ভোরবেলা স্নান সেরে দুই পুত্রকন্যা এবং স্বামীর সঙ্গে মন্দির প্রাঙ্গনে উপস্থিত হলাম। এত ভীড় যে মন্দির গর্ভগৃহে ঢোকাই প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই একজন পাণ্ডার সাহায্য নিতে হল। তিনি পূজাপাঠের বন্দোবস্ত করে দেন। তারই প্রচেষ্টায় আমরা চারজন মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকে কোনোক্রমে পুজো দি। গর্ভগৃহের বিগ্রহ বেশ নীচে প্রায় মাটির কাছাকাছি। নীচু হয়ে বাবা বৈদ্যনাথের মাথায় জল ঢালতে হয়। ভক্তদের ভীড় যেন উপচে পড়ছে। তিল ধারণের জায়গা নেই। এরই মধ্যে পুজো সমাপ্ত করে বেড়িয়ে যাচ্ছিলাম হঠাৎ পাণ্ডা যিনি আমাদের সহযোগিতা করছিলেন তিনি আমার মাথাটা গর্ভগৃহের দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিয়ে বললেন -" মা আপনার মনে যা কামনা বাসনা আছে বাবাকে জানান।" আমি তখন একমনে বলতে লাগলাম -" হে ঈশ্বর তুমি আছো আমার এই যে বিশ্বাস তা আমাকে উপলব্ধি করাও । " আমি বার বার বলতে লাগলাম। কয়েক সেকেন্ড এইভাবে অতিবাহিত হল। হঠাৎ আমার মনে হল আমার সারা শরীরে যেন বিদ্যুত খেলে যাচ্ছে। সারা শরীর আমার কাঁপতে লাগল আর আমার দুচোখ থেকে অঝোরে জল পড়তে লাগল। এভাবে কিছুক্ষণ আমার ঈশ্বর, আমার আরাধ্য দেবতা আমাকে জানিয়ে দিলেন তিনি আছেন। সে যে কি স্বর্গীয় অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। কাঁদতে কাঁদতে গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে এলাম। আমার এই কিছুক্ষণের ঐশ্বরিক অনুভূতি,উপলব্ধির মুহূর্তের কথা আমার সারা জীবনের সঞ্চয়। এ অমূল্য ,এই পাওয়া আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। এই অলৌকিক স্বর্গীয় অনুভূতির ঐশ্বর্য্য আমার সারা জীবনের সঞ্চয় যা অক্ষয় যা অমর যা আমার কাছে রয়ে গেছে। মহাকাল তাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারেনি আজও।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ