পোস্ট বার দেখা হয়েছে
ধুলোমাখা মানভূমের পথে,
বয়ে যেত তখন অদৃশ্য এক ঘূর্ণি,
নদীর মতো ধীর, কিন্তু তীব্র,
মাটির গহন থেকে ফুঁসে ওঠা মাতৃভাষার দাবী!
হঠাৎ একদিন
হিন্দি হাওয়া বইতে লাগল প্রশাসনিক নির্দেশে...
বাংলা ভাষার রুদ্ধ হল কন্ঠ।
মাটি ছুঁয়ে থাকা মানুষগুলো বলল—
“না, আমরা আমাদের ভাষা ছাড়ব না!”
বছরটা ১৯৪৯, সবে স্বাধীন হয়েছে দেশ।
টুসুর উৎসবে যেমন শস্যগীত বাজে,
ঠিক তেমনই শুরু হলো মানভূমে
ভাষার সত্যাগ্রহ।
লোকসেবক সংঘ নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এলো।
বঞ্চনার বিরুদ্ধে জ্বালাল মশাল।
গ্রাম থেকে শহর, পথ থেকে মঞ্চ—
বাংলার অধিকার ছড়িয়ে দিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
জানুয়ারির ভোরে টুসু গানের সুরে
শোনা গেল এক নতুন লড়াইয়ের ডাক—
“আমার ভাষা, আমার অধিকার।”
নারী, পুরুষ, কৃষক, ছাত্র—
সবাই মিশে গেল এক স্রোতে,
যে স্রোত ইতিহাসের অভিমুখ করলো বদল।
নতুন সত্যাগ্রহের নাম—
হাল–জোয়াল আন্দোলন,
কৃষকের হাতে প্রতিরোধের যন্ত্র,
চাষের ফাঁকে জন্ম নিল প্রতিবাদের গান।
এলো প্রান্তিক পর্ব—
টুসু সত্যাগ্রহ,
৯ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬,
যেখানে টুসু গান হয়ে উঠল দুর্বার আন্দোলনের শ্লোগান,
যেখানে উৎসব হয়ে গেল আন্দোলনের আগুন।
লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার, গুলি, অপমান
সবই এসেছিল,
কিন্তু ভাষার মাটিতে নিবেদিত মানুষগুলো
তাদের স্বপ্ন তুলে দিয়েছিল ভবিষ্যতের হাতে।
রাঘব, অতুল, ভবানী।
তাঁদের নাম আজো উচ্চারিত হয়
গভীর কৃতজ্ঞতায়
যেন শ্রদ্ধার এক বিনম্র প্রতিধ্বনি।
পাকবিরা গ্রাম থেকে পদযাত্রা শুরু,
৩০০ কিলোমিটার পথ—
রোদ, ধুলো, ক্ষুধা, তৃষ্ণা—
সব কিছু পেরিয়ে ১৭ দিনের অভিযান,
শেষে হাওড়া ব্রিজের বুকে পৌঁছে গেল
বাংলা ভাষার সেই দুর্বার বিজয়যাত্রা।
তারা বলেছিল—
“আমরা বাংলা, আমরা বাঙালি।”
সেই উচ্চারণে ছিল শতাব্দীর শক্তি,
যা ভেঙেছিল দমন আর অবহেলার প্রাচীর।
অবশেষে ১ নভেম্বর ১৯৫৬,
গড়ে উঠল নতুন জেলা — 'পুরুলিয়া,'
মানভূমের বিভাজনের মধ্য দিয়েই
জন্ম নিল স্বীকৃতি,
রক্তে লেখা এক নতুন ইতিহাস।
কিন্তু মানচিত্র বদলালেও
মানভূমের কণ্ঠস্বর আজো নিভে যায়নি—
সে স্পন্দিত হয় প্রতিটি টুসু গানে,
প্রতিটি গ্রামীণ ঢোলের তালে
প্রতিটি বাংলাভাষী হৃদয়ের অন্তরে।
ভাষা তো শুধু শব্দ নয়,
ভাষা এক নদী—
যার প্রতিটি ঢেউয়ে লুকিয়ে আছে মায়ের মুখ,
মাটির গন্ধ,
চিরচেনা উচ্চারণে মিশে থাকা ইতিহাসের পেলব স্পন্দন।
মানভূমের মানুষ শিখিয়েছে
ভাষা রক্ষা মানে অস্তিত্বের রক্ষা,
ভাষা ভালোবাসা মানে, নিজের সংস্কৃতিকে বাঁচানো।
তারা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল—
“আমার মায়ের ভাষা,
আমার প্রাণের পরিচয়।”
আজ যখন আমরা বাংলা বলি
নিত্যদিনের আলাপে, গানে, বইয়ে
তখন অজান্তেই উচ্চারিত হয় এইসব
সংগ্রামী মানুষদের নাম,
যারা অন্ধকারে মশাল ধরেছিল হাতে।
তাদের স্মৃতিতে আজও গেয়ে ওঠে মানভূম—
“টুসু রে টুসু, ভাষার টুসু,
তুই আমায় বাঁচাস ভাষার রোদে,
তুই আমায় শেখাস মাথা তুলে দাঁড়াতে।”
এই কণ্ঠস্বর চিরজীবী,
যেমন নদী বয়ে চলে তার উৎস ভোলে না,
তেমনি বাংলা ভাষা চিরদিন স্মরণ রাখবে
মানভূমের মাটি, মানুষ আর ভাষার প্রতি মমতার আগুন।
মাটির মানুষ, প্রনম্য ছিল তাঁরা
মাতৃভাষায় নিবেদিত মন-প্রাণ
নন্দিত আজ ধ্রুপদী বাংলা ভাষা
শ্রদ্ধা স্মরণে - মানভূম সংগ্রাম।
------------------------------------------
19.10.2025
কোলকাতা

0 মন্তব্যসমূহ