পোস্ট বার দেখা হয়েছে
জীবন্ত কিংবদন্তী—সুন্দরের সাঁকো
অলিপা পাল
নিশ্চিন্তে আর থাকা গেল না তোপসে— লকডাউনে অবশ্য অতিমারির প্রাবল্যে
গোড়া থেকেই ফেলুদা সহ গোটা সত্যজিৎকে সঙ্গী করেই গৃহবন্দি বাঙালি। তাই বলে তো আর ঘোরা বন্ধ যায় না ৷ ঘুরে আসা তো যেতেই পারে লংড্রাইভে,অসীম সঞ্জয় হরি শেখরদের সঙ্গী করে পালামৌ এর জঙ্গল ! বলার অপেক্ষা রাখে না সত্যজিৎ রায় এর অরণ্যের দিনরাত্রি-র এডভেঞ্চারস ভ্রমণ—যেখানে অসীম ওরফে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বাংলোর চৌকিদারকে মিথ্যা পরিচয় জানিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত ঘুষ দিয়ে বাংলোয় আশ্রয় ম্যানেজ করার সময় নিজেই অস্ফুটে বলে 'থ্যাংকস গড ফর কোরাপশন ',কিম্বা বাংলোর নির্ভার আড্ডায় অসীমের মুখে সেই বিখ্যাত উক্তি 'যত বার উঠবে..তত নামবে' বাঙালি দর্শক গল্প শুনতে ভালবাসে ৷সত্যজিৎ রায়ের গল্প বলার মুন্সিয়ানা তর্কাতীত ৷ এবং সেই বলনের মধ্যেই তিনি প্রোথিত করে দেন তাঁর আন্তরিক বক্তব্য ৷
সত্যজিতের সঙ্গে তাঁর মানসপুত্রের আলাপ ১৯৫৬ সালে। যাঁর পরিচালনায় মোট ১৪টি ছবিতে কাজ করেছেন সৌমিত্র।
সৌমিত্রের মনন, নিরন্তর অতৃপ্তিই তাঁকে সত্যজিতের সারাজীবনের সঙ্গী করে তুলেছিল।সৌমিত্র নিজে থেকেই বুঝতে পারত— 'আমি কী চাই',সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন সত্যজিৎ। আর লিখেছিলেন,'তার প্রতি আমার নির্ভরশীলতা আমার শিল্পীজীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় থাকবে'। উল্টোদিকে সৌমিত্র লিখেছিলেন,সারাজীবনে মানিকদার ছবিতে আমি প্রাণ খুলে,স্বাধীনতা নিয়ে অভিনয় করতে পেরেছি। স্বাধীনতা গ্রহণ করার যে আত্মবিশ্বাস,তা ওঁর কাছেই পেয়েছি'।
নাহারগড় কেল্লায় শ্যুট চলছে। ভিড়ে ঠাসা। কেল্লার উপর থেকে ডক্টর হাজরাকে নীচে ফেলে দেওয়া হবে।তোপসে ওরফে সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায় সহ অনেকেই দড়ি দিয়ে লোক আটকাচ্ছিলো। তোপসে আর ফেলুদার শ্যুটিং ছিল না সে দিন। ও মা! তোপসে দেখে,ওর সৌমিত্র কাকু (অবশ্য সিনেমায় ফেলু দা)লোকেশনে দড়ি ধরে লোক সামলাচ্ছেন! ভাবা যায়? তখন কিন্তু উনি খ্যাতির শীর্ষে। মেক আপ ভ্যানে এখনকার অভিনেতাদের মতো বসে আছেন,এমন নয়! উত্তমকুমার সম্পর্কে তোপসে জানতে চাইলেই বলতেন,'এই তোদের এক কথা! ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের মতো যেন আমাদের লড়াই! জানিস,উত্তমবাবু অসম্ভব স্নেহ করতেন আমায়। আমি যে কত কী পেয়েছি ওঁর থেকে। তুই যেমন ফ্যান,আমিও তেমনই উত্তমকুমারের ফ্যান!' খুব সহজ করে কথা বলতেন সৌমিত্রকাকু,শ্যুটিং ফ্লোরে যেমন তোপসেকে আগে থেকে বলে দিতেন কি ভাবে সংলাপ বলবে।সৌমিত্রকাকুর সঙ্গে আদানপ্রদানটাই সেরকম হয়ে গিয়েছিল। একদিন ফ্লোরে তোপসেকে বলেছিল, 'ফেলুদার আসল শক্তি তার মগজাস্ত্র । তাই অভিনয়ের যা কিছু,চোখ দিয়ে বোঝাতে হবে।' খুব রেগে যেতেন কলটাইমের চেয়ে কেউ দেরি করলে। 'পোস্ত' ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তোপসে,ওঁর সঙ্গে। ৯টায় কলটাইম।তোপসে ৯টা ১৫ মিনিটে ঢুকলো। সৌমিত্রকাকু বেশ কড়া গলাতেই বললেন, 'আমাদের তো ৯টায় কলটাইম। দেরি করা একদম ঠিক নয়।' তোপসের বয়স তখন কিন্তু ৫৮। আর উনি হয়ত ৮২।উনি ফেলুদা ! ওঁর থেকেই শেখা যায় নিয়মানুবর্তিতা কতটা জরুরি ৷
কিংবদন্তি শিল্পী,বহুমুখী প্রতিভা, জ্ঞান ও মেধার দুরন্ত সমন্বয়— এ সব কিছুর বাইরে দক্ষ জীবনবোধ ৷
জীবনকে দেখার দৃষ্টিকোণ,তাকে গভীর ভাবে খোঁজার চেনার উপলব্ধি করার দর্শন।
ভারতে ওঁর মতো ধ্রুপদী অভিনেতা খুবই বিরল। সত্যজিতের ছবির ধারক-বাহক তো ছিলেনই—
অশনি সংকেত -এর শুটিংয়ের আগেই বীরভূমের গ্রামে হাজির হলেন সৌমিত্র। সত্যজিতের সঙ্গে। সেখানকার মানুষজন আর তাদের জীবনযাপন দেখার ইচ্ছে নিয়ে। সত্যজিৎ গিয়েছিলেন নিজের অভ্যাসবশত লোকেশন খুঁটিয়ে দেখতে। আর সৌমিত্র নিজের নোটবুকে নানা ধরনের নোট নিচ্ছিলেন। গ্রামের লোকের কমন ম্যানারিজম-কী ভাবে তারা গা চুলকোয়, হাঁটে, কাঁধে গামছা রাখে, উবু হয়ে বসে ইত্যাদি। সঙ্গে নিজের কিছু চিন্তাভাবনাও লিখে রাখছিলেন। যা একজন অভিনেতার কর্মপদ্ধতির পরিচয় দেয়। পরিচয় দেয় মানসিকতারও। লোকেশন দেখার সময় লিখছেন, অদ্ভুত সব গ্রাম— সুন্দর...। আবার পরে যখন শুটিং করতে যাচ্ছেন, তখন লিখছেন 'সামনে অনাহার। এই কোমল শ্যামল নিস্তরঙ্গতার মধ্যে মৃত্যুর পদসঞ্চার শোনা যায়৷' পড়তে-পড়তে মনে হয় উপনিবেশের কালে জন্মানো সৌমিত্র আমাদের পরাধীন অস্তিত্বের ভিতর সঞ্চারিত স্বদেশ জিজ্ঞাসার কোনও পাঠ তৈরি করছেন।
লেজিয়ঁ দ্য নর,কম্যান্দর দ্য লার্দ্র দে আর্ত্ এ দে লের্ত্র-এ ভূষিত সৌমিত্র চিত্রনাট্য শোনার পর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ পেত,কোথায় কী ভাবে জীবনের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি হয়েছে,সেটা আগে খুঁজে বার করতেন। গল্পের প্লট চলন চরিত্র আবেগ অনুভূতি এ সব পরের আলোচনা।
ময়ূরাক্ষী ছবির একটি দৃশ্যে আক্রান্ত সুশোভন ওরফে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হাসপাতালে যাওয়ার আগে বাড়ির চাবিটা একজনকে দিয়ে বলছেন,'ফিরায়ে দিনু দ্বারের চাবি, রাখি না আর ঘরের দাবি... সবারে আমি…' নিজের মতো তৈরি করে বললেন, 'সবারে আমি টাটা করে যাই!'
পদ্মভূষণে ভূষিত সৌমিত্রের ডাকনাম পুলু। সমিত ভঞ্জকে নিয়ে ডুয়ার্সের জঙ্গলে যখন গৌতম ঘোষের 'আবার অরণ্যের' শুটিং চলছে, তখন সমিত ক্যানসারের অন্তিম
সীমায় ৷ সমিতের একটি আবেগপ্রবণ সংলাপ ছিল,'এই নদী, অরণ্য সব থাকবে,শুধু আমি থাকব না।'সংলাপের পরেও নিজেকে সামলাতে পারেননি সমিত ভঞ্জ। সেই সময় তাঁর প্রিয় পুলুদাই এগিয়ে এসেছিলেন, বুঝিয়েছিলেন সমিতকে।এটা তো থাকার জায়গা নয়। এটা আসা ও যাওয়ার মাঝখানে কিছু সময় কাটানোর স্থান। তাঁর কথায় তখনকার মতো শান্ত হয়েছিলেন সমিত। সৌমিত্র নিজেও,একই ভাবে নিজস্ব সময় কাটিয়ে বিদায় নিলেন।
বাঙালির সংস্কৃতি প্রবহমানতার ইতিহাসে থেকে গেল তাঁর জীবন। মনে করতেন সৃষ্টি সংস্কৃতি নির্মাণের মধ্যে যে মানুষ নেই সে মৃতপ্রায়। কেবল শারীরিক ভাবে বেঁচে থাকা ছিল তাঁর কাছে মূল্যহীন। সৃষ্টির সব ক্ষেত্রেই মগজাস্ত্রের আলোকিত নির্মাণ রেখে গেলেন তিনি।
দাদা সাহেব ফালকে পাওয়া সৌমিত্রের উত্তমকুমার হয়ে ওঠা হয়নি । অন্য অনেক তারকাদের মতো কমার্শিয়াল ছবিতে দাপিয়ে কাজ করেছেন এমনও নয়। তবু বেলাশেষে তিনি সৌমিত্র! তাঁর একমাত্র সম্পদ অ্যাকাডেমিক ইনটেলিজেন্স। অভিনয়ে বুদ্ধির সংযত ঝলক। ওই মগজ দিয়েই শিখেছিলেন ক্যামেরার সামনে অবিচল থাকার বোধ। বাংলার আর কোন অভিনেতা স্বাভাবিক আলাপে প্রতিস্পর্ধী, মনোগঠন, দার্ঢ্য, দ্বিত্ব বা বিদ্যাবত্তা'র মতো শব্দ ব্যবহার করেন? কার বাচনভঙ্গিতে থাকে গভীর অধ্যয়নের ছায়া? কখনও তিনি রবীন্দ্রনাথের রাজা আবার কখনও সত্যজিৎ রায়ের প্রদোষচন্দ্র মিত্র। 'ময়ূরবাহন' থেকে 'ময়ূরাক্ষী' ৷ 'ক্ষিদ্দা' থেকে 'উদয়ন পণ্ডিত'। বাঙালি তাঁকে ঘিরে সব আশা দু’হাত ভরে মিটিয়েছে।
তুমি সুস্থ থাক / এই মানচিত্রে আজও তুমিই তো সুন্দরের সাঁকো! রোগশয্যায় আচ্ছন্ন সত্যজিৎ রায়ের উদ্দেশে লেখা তাঁর কবিতার লাইন বলেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। 'সুন্দরের সাঁকো' শব্দবন্ধটুকু যে তাঁর প্রসঙ্গেও অত্যুক্তি নয়, মৃত্যু পরবর্তী টাটকা আবেগ ছাপিয়েও এটুকু মানেন তাঁর অনুরাগী'রা।
সত্যিকারের আইকন সহজে পাওয়া যায় না ৷ এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি আদর্শ-যিনি উদাহরণ-যিনি প্রভাবশালী-যিনি অনুসরণযোগ্য-যিনি নক্ষত্র অথচ যিনি স্পর্শাতীত নন। এই সমস্ত গুণ এক জন মানুষের মধ্যে দেখতে পেলে তবেই তাঁকে আইকন বলা,আইডল বলে স্বীকৃতি দেওয়া, না হলে নয়। জাতি হিসেবে বাঙালির বড় সৌভাগ্য যে,এমন ব্যক্তিত্ব সে বড় কম পায়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, সেই প্রাপ্তির ভাঁড়ার শূন্য হয়ে আসছে দ্রুত। যে ভান্ডারের শেষতম উজ্জ্বলতা নিয়ে চলে গেলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে,জৌলুস আর মেধার এমন সংমিশ্রণ,তারকা ও মানুষের এমন সহাবস্থান,জনপ্রিয় ও প্রিয় জনের এমন মেলবন্ধন বাঙালি এর আগে পায়নি।
গত এক মাস সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই চোখে পড়েছে তাঁর সুস্থতা কামনায় ছেয়ে যাওয়া দেওয়াল। শেষ কবে এক জন বাঙালির অসুস্থতায় বিশ্বের তামাম সম্প্রদায় এমন আন্তরিক ভাবে উদ্বেল হয়েছিল,মনে পড়ে না। তাঁর ছবিতে,তাঁর অভিনীত সিনেমার দৃশ্যে সকলে ভরিয়ে তুলছিলেন নিজেদের স্যোশালমিডিয়ার পাতা,প্রতি নিয়ত তাঁর স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ পাচ্ছিল,অসহায়ের মতো প্রার্থনায় অজানার দিকে নিজেদের আর্তি ভাসিয়ে দিচ্ছিল একটা গোটা জাতি। ভালবাসার এই আশ্চর্য বিস্তার খুব কম মানুষের জন্য আসে পৃথিবীতে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সেই ভালবাসা পাওয়ার মতোই ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
ভারী হয়ে আসা মনখারাপের মধ্যে চোখে পড়েছিলো সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দায় তাঁর জন্য শুভেচ্ছায় উপচে ওঠা দেওয়াল,তাঁর নামটা কিন্তু দেখা যায়নি কোথাও— এ বড় অদ্ভুত ! হ্যাঁ প্রায় কোথাওই তাঁর নিজের নাম ছিল না। ছিল তাঁর চরিত্রদের নাম।অজস্র মানুষ চাইছিলেন 'উদয়ন পণ্ডিত' সুস্থ হয়ে উঠুন—পাঠশালা বন্ধ হবে না ৷ বহু জনের প্রার্থনা বাঙালির 'অপু' যেন অপরাজিত থাকেন চিরকাল,অগণিত লোকের আশা, চারুলতা-র 'অমল' যেন দ্রুত বাড়ি ফেরেন, অনেকের চাহিদা 'ফেলুদা'-কে সল্ভ করতেই হবে এবারের কেস ওঁর মগজাস্ত্র
দিয়ে ৷ আবার বহু মানুষ যেন পাড়ে দাঁড়িয়ে ক্ষিদ্দা'-কে চেঁচিয়ে বলছিলেন 'ফাইট ক্ষিদ্দা ফাইট'! তবুও—
খেল খতম ৷৷

4 মন্তব্যসমূহ
খুব ভালো। অনেক তথ্য পেলাম দিদি।
উত্তরমুছুনখুব ভালো। অনেক তথ্য পেলাম দিদি।
উত্তরমুছুনখুবই ভালো লাগলো ! এত তথ্য সমৃদ্ধ 👍
উত্তরমুছুনভীষণ ভালো তথ্য সমৃদ্ধ লেখা
উত্তরমুছুন