কুঠিবাড়ি | অলিপা পাল




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


কুঠিবাড়ি
               

সকাল থেকে খানিকটা বদল আবহাওয়ায়৷ ভোররাত থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজছে কলকাতা৷ বৃষ্টি হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে৷যদিও বর্ষাকাল,নিম্নচাপ না হলে এখন বর্ষাতেও সেভাবে বৃষ্টির দেখা মেলে না ৷ দিনভর মেঘলা আকাশ এবং বৃষ্টি বজায় থাকবে বলেই পূর্বাভাস আবহাওয়া দফতরের৷
সুজয় অফিস যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছে ৷কিছুটা উৎকণ্ঠা ৷ সহকর্মীদের সাথে রাতের ট্রেনে যাবে শিমুলতলা ৷ পরে অফিসের কাজে রাঁচি ৷
বিভূতি ভূষণ লিখেছিলেন "পশ্চিমের সাঁওতাল পরগণা, দক্ষিণ বিহার বর্তমানে ঝারখন্ডের সিংভূম মধ্যপ্রদেশের অরণ্য প্রদেশ মানুষের প্রতি ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর৷খাওয়ার পর্যন্ত বিশেষ কোন ফল নেই "৷সেই পশ্চিমেই আদি অনন্তকাল ধরে বাঙালি বেড়াতে যায় না যায় চেঞ্জে ৷
বাঙালিও সারা বছর ছুটির ফাঁদে পা গলিয়েই আছে ৷
ছোট থেকে রাঁচি কথাটি কেবলমাত্র পাগল হয়ে যাওয়ার সঙ্গেই জড়িত ছিল lকেউ পাগল হয়ে গেলে বা পাগলের মতো কথাবার্তা বললে বা উল্টােপাল্টা কথা বার্তা বললে,বলাহত তোকে রাঁচিতে পাঠাতে হবেl স্কুল জীবনের বই থেকে জানা যায় রাঁচি শুধু পাগলদের জন্য নয় বরং প্রকৃতি পাগল, ভ্রমণ পাগল দের জন্যও একটি আদর্শ ও স্বাস্থ্য সম্মত জায়গাl দৈনন্দিন জীবনের কাজকর্ম, মানসিক চাপ আর দূষণ একেবারে পাগল করে তুলেছিল তখনই ভাবনায় আসে  একবার যেতেই  হবে রাঁচি, না হলে এই পাগলামি আর কমবে নাl সুজয় সহকর্মীদের সাথে বর্ষায় রাচি যাবে অফিসিয়াল ট্যুরে দিন পনেরো আগে ঠিক করেছিলো৷ ঝর্ণার দেশ রাঁচি, পাহাড়ের দেশ রাঁচি,জঙ্গলের দেশ রাঁচি  আর আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম ও তাদের ঐতিহ্যের দেশ রাঁচি শাল, পলাশ,মহুয়ার দেশ রাঁচি l

  সুজয় সহ দুই সহকর্মী বিজন ও কাকলি অফিস করে হাওড়া থেকে রাতের ট্রেনে উঠলো ৷ খাবার কিছু প্যাক করেই নিয়েছিলো ৷ সুজয় ও বিজন প্রায়ই কাছে পিঠে চলে যায়-শনি রবি বার সাথে আরেকটা দিন যোগ করে৷
কাকলির হঠাৎই ওদের সাথে আসা৷ কাকলির হ্যাসবেন্ড বিকাশদা ওদের সহকর্মী ছিলো বছর পাঁচেক আগে ক্যানসারে মারা যেতে চাকরিটা কাকলি পায় ৷ বিয়ের  আগে কাকলি ঝারখন্ড কোর্টে সবে প্যাক্টিস শুরু করেছিলো৷ সেই সূত্রেই সিনিয়রের সাথে কাকলির দেখা করতে আসা৷মাঝরাতে ট্রেন থেকে নেমে গাড়ি ঠিক করে কাছাকাছি হোমস্টেতে উঠলো ওরা ৷

বর্ষার জলে আরও সবুজ হয়ে উঠেছে ছোট ছোট পাহাড় আর সবুজের সমারোহ,ছোট খাটো জঙ্গল ইউক্যালিপ্টাস আর সারি সারি শিমুল গাছে ঘেরা—পশ্চিমের শিমুলতলা!চারপাশ ঘিরে প্রহরীর মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড় শ্রেণি—শান্ত স্নিগ্ধ নির্জন টিলা ৷শাল মহুয়ার অরণ্যে ঘেরা বৃষ্টি ভেজা লাল মোরামের গ্রামের পথ চলে গেছে৷ গাছ গাছালিতে ছাওয়া লাট্টু পাহাড় ৷পাহাড় ও  অরণ্যের মাঝে মনোরম পরিবেশে হলদিঝোরা আর অপার সৌন্দর্যের টেলবা নদী ৷অজস্র কুঠিবাড়ি বা ভিলা—যে গুলির বেশির ভাগেরই মালিক ছিলেন বাঙালি ৷তবে এখন মালিকানা হাতবদল হয়েছে৷ ঐতিহ্য থাকলেও বেশিরভাগ ভিলাই ভেঙে পড়েছে, দেখাশুনা করার লোকের অভাবে ৷ নতুন প্রজন্মের সকলেই দেশের 
বাইরে ৷আর হাতেগোনা কতগুলো ভিলা ঠিকঠাক আছে সেগুলো
সারিয়ে চলছে হোমস্টে ৷অনেক কুঠি আবার ভুতুড়ে কুঠি নামেও পরিচিত ৷

ব্রেকফাস্ট করতে করতে কাছাকাছি ঘোরার জায়গা সম্বন্ধে জেনে নিলো ওরা,কেয়ারটেকার লক্ষণের কাছ থেকে ৷একটু পড়েই কাকলি গেলো তার সিনিয়র উকিলের সাথে দেখা করতে ৷কাকলির এসব জায়গা ঘোরা অতএব ওরা দুজন বেড়িয়ে পড়লাে হোমস্টের গাড়িতে ৷

কাকলি টেবিলের একপ্রান্তে চেয়ারে বসে আছে,অন্য প্রান্তে ওর সিনিয়র উকিল একভাবে কাগজে লিখে যাচ্ছে৷কাকলির দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই,হয়তো পরের দিনের কোন গুরুত্বপূর্ণ কেস আছে কোর্টের ৷ এরআগে কাকলি গিয়েছিলো রাঁচি 
ইউনিভার্সিটিতে সার্টিফিকেট তুলতে ৷ দুপুরে হোটেলে ভাত খেয়ে ব্যাঙ্কে ওর এক্যাউন্ট ক্লোজ করে স্যারের বাড়ি আসতে প্রায় পৌনেছ'টা বেজেগেছে ৷

রাঁচি শহরটা দেখতে-দেখতে কত উন্নত হয়েগেছে-ঝা চকচকে রাস্তা সপিংমল,হাইজেনিক মার্কেট,উন্নত রেলওয়ে স্টেশন,আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর,স্টেডিয়াম কমপ্লেক্ম,ফ্লাই ওভার, সপিংমল,হোটেল,এছাড়াও আছে অগুন্তি দর্শনীয় স্থান ৷
জঙ্গল আর আদিবাসী অধ্যুষিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছোটনাগপুর মালভূমির কেন্দ্রস্থলে রাঁচি শহর ৷রাঁচি ছিলো ঝাড়খন্ড আন্দোলনের কেন্দ্র যেটি দক্ষিণ বিহার, উত্তর উড়িষ্যা,পশ্চিম পশ্চিমবঙ্গ, এবংছত্তিসগড় এর পূর্ব অংশের আদিবাসীদের এলাকা নিয়ে গঠনের দাবি হয়েছিল একসময় ৷

কাকলি বার-বার ঘড়ি দেখছে ৷সাতটা বাজতে চললো ৷এখনো স্যার একই ভাবে লিখে যাচ্ছে ৷কাকলি যে ফিরবে সেটা স্যারের হয়ত খেয়াল নেই শুধু ঢোকার সময় ইশারায় বসতে বলেছে ৷ এদিকে এখনো সেভাবে ক্যাবের প্রচলন হয়নি ৷ এখান থেকে প্রায় ত্রিশ মিনিট লেগে যাবে রাচি শহর এ 
হোটেলে যেতে ৷ হোমস্টের গাড়িতে সুজয় বিজন এতক্ষণে চলে এসেছে রাঁচি হোটেলে ৷ শিমুলতলার হোমস্টের মালিকের হোটেল রাঁচিতে ৷

কম বয়সী একটা ছেলে খুব ব্যস্ততার সাথে ঘোরাঘুরি করছে ৷ কাকলির মনে হলো স্যারের আন্ডারে কাজ শিখছে ৷ওর চোখের চাউনি ভীষণ স্থির ,নাম জিজ্ঞেস করায় এমন ভাব করল যেন শুনতেই পায়নি ৷ কাকলি ভেবে ছিল  ছেলেটার থেকে জেনে নেবে কোন গাড়ির ব্যবস্থা আছে কিনা হোটেলের লাগোয়া বাজারে যাওয়ার জন্য ৷মনে-মনে কাকলির রাগই হলো যদিও মুখে কিছু প্রকাশ করলো না ৷ বাইরে একভাবে মুশল ধারায় বৃষ্টি হয়ে চলেছে ৷এখন কাকলির মনে হচ্ছে এসে ভুলই করেছে, দীর্ঘদিন স্যারের সাথে কোন যােগাযোগ নেই,তাই ভেবেছিল এত কাছে এসেছে যখন দেখা করে যাবে ৷ কাকলি টেবিলের উপর একটা ভারি কাঁচের পেনদানি নাড়চাড়া করছিলো, আচমকা পেনদানি বিকট শব্দে মাটিতে পড়ে টেবিলের তলায় চলে গেল,ওটা তুলতে গিয়ে আবার হাত থেকে পড়ে যায় ৷ মেঝে থেকে নিচু হয়ে ওঠার সময় ঘরের সিলিংয়ের দিকে চোখ যেতেই কাকলি শিউরে ওঠে,দেখে জুনিয়র ছেলেটা গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলছে!কাকলির মুখ দিয়ে কোন কথা বেড়চ্ছে না,শুধু হাত নেড়ে স্যারকে ডাকার চেষ্টা করে, হঠাৎ দেখে চারিদিকে অন্ধকার,পুরোনো একটা পোড়ো বাড়িতে কাকলি একা ৷ কোন রকমে উঠে দাঁড়ায়৷ আপ্রাণ চেষ্টা করে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে ৷কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকারে দরজা হাতড়ে খুঁজতে দেয়ালে ধাক্বালেগে জড়িয়ে যায় বিষাক্ত মাকড়সার জালে৷ চারিদিকে গমগম করে কানে বাজতে থাকে স্যারের কণ্ঠস্বর "এ ভাবে তো না বলে চলে যাওয়া যায় না"৷

সন্ধ্যার মুখে মুখেই সুজয় ও বিজন চল এসেছে রাঁচি হোটেলে, রিসেপশনে বসেই লক্ষণের সাথে চা সিঙারা আর ছানার মুড়কি সহযোগে সন্ধ্যাকালীন জলখাবার সারলো ৷কিন্তু কাকলি
ফেরেনি দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ল 
ওরা ৷যে সব কাজে যাবে,মিটিয়ে এতক্ষণে তো ফিরে আসার কথা!চিন্তা হচ্ছে দেখে লক্ষণ নিজেই জানতে চাইল বাংলা হিন্দি মিশিয়ে কোথায় গেছেন ম্যাডাম ?ব্যাঙ্ক, ইউনিভার্সিটির কথা বলল সুজয়৷শুনে লক্ষণ বলল তবে তো অনেক আগেই চলে আসার কথা ! উকিলের বাড়ি যাওয়ার কথাটা সুজয়ের মাথাতেই ছিলো না ৷বিজন বলে উঠল  advocat  Mr.chakrobortty সাথে দেখা করবে বলেছিল তো কাকলি!তখন সুজয়েরও মনে পড়ে গেলো সোমনাথ চক্রবর্তী!
নামটা শুনে লক্ষণ যেন আঁতকে উঠলো! ধপ করে বসে পড়লো!ওর ঘোর কাটতেই চটপট উঠে হাত ঘড়িতে প্রায় সাতটা ত্রিশ দেখেই গাড়ির চাবি নিয়ে উদ্বেগ জড়ানো গলায় বললো তাড়াতাড়ি আসুন!
লক্ষণের এই ভাবে ওদের নিয়ে বেড়িয়ে আসা দেখে ওরাও  রীতিমতো ঘাবড়ে গেছে ৷উর্দ্ধশ্বাসে গাড়ি ছুটে চলেছে ৷ লক্ষণের মুখ থমথমে,ভ্রুতে ভাঁজ৷ কোথায় যাচ্ছে জানতে চাওয়াতে লক্ষণ কোন উত্তর দিলনা ৷  বড়রাস্তা থেকে গাড়ি হঠাৎ বাঁক নিয়ে নেমে গেল লাল পাথুরে রাস্তায়, টাল সামলাতে-সামলাতে আরো মিনিট দশেক যাওয়ার পর বড় গেটের সামনে গাড়ি থামালো লক্ষণ ৷বৃষ্টি থেমে 
গেছে কিছুক্ষণ হল৷গাড়ির হেড লাইটে যেটুকু দেখা যায় আগেকার দিনের পুরনো দ্বোতলা বাড়ি ৷বাড়ির সামনে ছোট বড়ো ঝোঁপ হয়ে আছে ৷ আগাছার জঙ্গল ৷ কেমন একটা বুনো জল পচা পাতা পচা গন্ধ নাকে এসে লাগছে,সাথে লাগাতার ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ৷বোঝাই যাচ্ছে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ৷
গাড়ি থেকে নেমেই লক্ষণ হাতে বড়ো টর্চ নিয়ে চিৎকার করে বহেনজী বলে, 
যত জোড়ে সম্ভব ডাকতে থাকলো ৷
এতক্ষণে পরিস্কার বোঝাগেল কাকলির বিপদ ৷গাড়িতে আসতেই অনুমান হয়েছিলো ওদের ৷বুকের মধ্যে ধরাশ করে উঠলো সুজয়ের ৷ সুজয় বিজন কাকলির নাম ধরে চিৎকার করতে লাগলো ৷ বাড়ির দিকে যেতে গিয়েই ঝোঁপের পাশ থেকে গোঙানির শব্দ ভেসে এলো ৷ লক্ষণ সঙ্গে-সঙ্গে টর্চের আলো ফেলতে,ওরা দেখে কাকলি মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে,মাথা পাশে কাত করা,মুখ দিয়ে গ্যাজা গড়িয়ে পড়ছে ৷বিজন হাত ধরে দেখে বললো বেঁচে আছে ,সঙ্গে-সঙ্গে ওরা তিন জন ধরাধরি করে কাকলিকে গাড়িতে তুলে কাছেই  হসপিটালের আই সি ইউ তে ভর্তি করলো ৷ওরা সারারাত বসে থাকলাে ওয়েটিং রুমে ৷ সকালের দিকে জ্ঞান ফিরতে ডাক্তার বাবু জানালেন বিপদ কেটে গেছে ৷ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনে দিয়ে ওরা ফিরবে হোটেলে স্নান খাওয়া করতে ৷পথে আসতে-আসতে লক্ষণ বলল উকিল বাবু তিন বছর আগে ঐ বাড়িতে আত্মহত্যা করেছিলো ৷ওনার স্ত্রী বহু বছর আগেই মারা গেছেন ৷ বছর চারেক আগে ওনার ছেলে সবে ওকালতি পাশ করে উকিল বাবুকে বিভিন্ন কেসে সাহায্য করছিলো ৷সেই সময় উকিল বাবুর কিছু শত্রু তৈরি হয়ে যায় ৷যে ভাবেই হোক ওনার ভদ্র শান্ত ছেলেকে কেউ বা কারা রেফ কেসে ফাঁসিয়ে দেয় ৷ জেল পর্যন্ত হয়৷ উকিল বাবু অনেক বড়-বড় উকিল এনেও ছেলেকে নিরপরাধ প্রমান করতে পারেনি ৷যেদিন জামিনে ছাড়া পায়,ঐ দিন রাতে অসম্মান সহ্য করতে না পেড়ে ওই বাড়িতে সিলিং ফ্যানে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে ৷ সকালে ছেলেকে ওই  অবস্থায় দেখে উকিল বাবু পাথর হয়ে যায় ৷ বডি পুলিশ নিয়ে যায় ৷সে দিন সারাক্ষণ ছেলের কেসের ফাইলে কি সব লিখে চলেছিলো ৷পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় পুলিশ মিডিয়া কারোর সাথে কোন কথা বলেনি৷ পরের দিন সকালে উকিল বাবুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়৷ তার পরে যারা ওই বাড়িতে গেছে কেউ মারা গেছে অথবা উন্মাদ পাগল হয়ে গেছে ৷

লক্ষণের সাহায্যে সে যাত্রায় কাকলি বেঁচে ফিরলেও , দীর্ঘদিন  মানসিক চিকিৎসায় থাকার পর সুস্থ হলেও স্যারের বাড়িতে কাকলি যে গেছিল সেটাই মনে করতে পারেনি আর কোন দিন ৷

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

8 মন্তব্যসমূহ