নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতা




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

নবারুণ ভট্টাচার্য (২৩ জুন ১৯৪৮ – ৩১ জুলাই ২০১৪) ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি কবি ও কথাসাহিত্যিক। তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৯৭) ও বঙ্কিম পুরস্কার (১৯৯৬) গ্রহণ করেছেন। হারবার্টকাঙ্গাল মালসাট ইত্যাদি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। তিনি লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী এবং নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের পুত্র।

।।কবিতা।।


আমার খবর 

আমি সেই মানুষ
যার কাঁধের ওপর সূর্য ডুবে যাবে।
বুকের বোতামগুলো নেই বহুরাত
কলারটা তোলা ধুলো ফ্যা ফ্যা আস্তিন
হাওয়াতে চুল উড়িয়ে
পকেট থেকে আধখানা সিগারেট
বার করে বলব
দাদা একটু ম্যাচিসটা দেবেন?
লোকটা যদি বেশি ভদ্র হয়
সিগারেট হাতে রেখে
এগিয়ে দেবে দেশলাই
আর আমি তার হাতঘড়িটার
দিকে তাকাব, চোখে জ্বলে উঠবে রেডিয়াম
ম্যায়নে তুঝসে মহববত করকে সনম—লেন দেন

খবরের কাগজ নয়
পুলিশের খাতায় আমার
দুটো ছবি থাকবে—একটা হাসিমুখ, একটা সাইড ফেস
তার নিচে লেখা ম্যাচ কেস
পেট ভরে পেট্রোল খেয়ে
হল্লা গাড়ি ছুটবে আমার খোঁজে
হেঁটমুণ্ডু শহর আমাকে খুঁজবে
আমি সেই মানুষ
বুকের বোতামগুলো নেই বহু রাত
যার কাঁধের ওপর সূর্য ডুবে যাবে।
             --------

কালবেলা

যুবকেরা গেছে উৎসবে
যুবতীরা গেছে ভোজসভায়
অরণ্য গেছে বনানীর খোঁজে
গরীব জুটেছে শোকসভায়।
গয়নারা গেছে নীরব লকারে
বন্যপ্রাণীরা অভয়ারণ্যে
বিমান উড়েছে আকাশের খোঁজে
গরীবরা শুধু হচ্ছে হন্যে।
পুরুষেরা গেছে নিভৃত মিনারে
গর্ভবতীরা প্রসূতিসদনে
কুমিরেরা গেছে নদীর কিনারে
গরীব জমছে নানা কোণে কোণে।
বিপ্লব গেছে নেতাদের খোঁজে
যুবকেরা গেছে উৎসবে
যুবতীরা গেছে বিশিষ্ট ভোজে
গরীবের হায় কী হবে?

            ------------
আমাকে দেখা যাক বা না যাক 


কে আমার হৃদ্‌পিণ্ডের ওপরে মাথা রেখে ঘুমোয়
কে আমাকে দুধ ও ভাতের গন্ধ দিয়ে আড়াল করে
কে আমার মাটি যেখানে আমি বৃষ্টির মতো শুষে যাই
আমি যখন দূষিত আকাশে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে উড়ি
আমার পালকে ছাই জমে জমে ধূসর হয়ে যায়
তখন আমার সামনে সবুজ গাছ হয়ে ওঠে কে
কে আমাকে চোখের পাতা বন্ধ করে আড়াল করে
কে আমাকে আগুন দিয়ে মশালের মতো জ্বালায়
কে আমার পৃথিবী যার ভেতরে আমি লাভার মতো
ফুটতে থাকি
আমি যখন পথ থেকে গলিতে তাড়া খেতে খেতে দৌড়ই
আমার পায়ের তলায় হাইওয়ে, আলপথ সব ফুরিয়ে যায়
তখন আমার সামনে আশ্রয় হয়ে ওঠে কে
এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে
আমার ওপরে অনেক অত্যাচার করতে হবে
এত অত্যাচার করার ক্ষমতা, দুর্ভাগ্যবশত,
কোনো শোষক, নিপীড়ক বা রাষ্ট্রমেশিন এখনও জানে না
যখন জানবে
তখন আমার প্রশ্নের সংখ্যাও অনেক বেড়ে যাবে
আমি প্রশ্নগুলোকে ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগোতেই থাকব
আমাকে দেখা যাক বা না যাক
প্রশ্নগুলো ফেটে অনেক সপ্তর্ষিমণ্ডল আকাশে দেখা যাবে।

            --------------------

একটা ফুলকির জন্যে 


একটা কথায় ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে
সারা শহর উথাল পাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে
কাটবে চিবুক                     চিড় খাবে বুক
লাগাম কেড়ে ছুটবে নাটক
শুকনো কুয়োয়                 ঝাঁপ দেবে সুখ
জেলখানাতে স্বপ্ন আটক
একটা ব্যথা বর্শা হয়ে মৌচাকেতে বিঁধবে কবে
ছিঁড়বে মুখোশ         আগ্নেয় রোষ
জুলবে আগুন           পুতুল নাচে
ভাঙবে গরাদ              তীব্র সাহস
অনেক ছবি             টুকরো কাচে
একটা কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে
সারা শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে।

                ----------------

খারাপ সময় 


খারাপ সময় কখনও একলা আসে না
তার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ আসে
তাদের বুটের রঙ কালো
খারাপ সময় এলে
রুমাল দিয়ে হাসি মুছে ফেলতে হয়
ফুসফুস গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়
জুয়ার বাজার মরা জন্তুর মতো ফুলতে থাকে
ভালোবাসার গলা কামড়ে ধরে
ঝুলতে থাকে ভয়
ল্যাম্পপোস্টের ওপর থেকে
হতভাগ্যরা গলায় দড়ি
দিয়ে ঝোলে
তাদের ছায়ায় কালোবাজারীরা
লুকোচুরি খেলে
ভি. ডি. বেশ্যার দালাল আর
জেমস বণ্ডরা রাস্তায়
কিলবিল করে
ভিড় ঠেলে সাইরেন বাজিয়ে
পুলিশভ্যান চলে যায়
তার মধ্যে পুলিশ বসে থাকে
তাদের বুটের রঙ তাদের
ঠোঁটের মতো কালো
তাদের ঘড়িতে খারাপ সময়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

5 মন্তব্যসমূহ

  1. সমৃদ্ধ পোস্ট .... এমন ক্ষুরধার লেখনী আমাদের প্রতিদিন সমৃদ্ধ করুক 🙏

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ কয়েকটি কবিতা পড়লাম। নিয়মিত পোষ্ট করার অনুরোধ রইল। ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন
  3. সুন্দর প্রকাশ ও অভিব্যক্তি

    উত্তরমুছুন