পোস্ট বার দেখা হয়েছে
কবি নজরুলের রসবোধ কলমে দেবলীনা চক্রবর্তী
বাংলা সাহিত্যে দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতা ও শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। মূলত তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর রসিক রূপটিও তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাই নজরুলের লেখনীতে অনায়াসেই উঠে আসে, ‘আমি খেলিব খেলাব, হাসিব-হাসাব, কাঁদিব কিন্তু কাঁদাব না।’
ব্যাক্তিগত জীবনে কবি অত্যন্ত দুঃখ দুর্দশার মধ্যে জীবন কাটালেও প্রতি মুহূর্তে জীবনকে তিনি উচ্ছ্বাস , আনন্দ ও কৌতুকের সাহারায় উজ্জীবিত করতেন । তার ওই বিদ্রোহী রূপের আড়ালে ছিল এক অত্যন্ত শিশু সুলভ মন যা অনাবিল আনন্দে নিজে হেসে অন্যকেও হাসাতে পারতো। তার অট্টহাসির বিষয়ে গল্প আছে যে তার অট্টহাসি শুনে খোঁজ পাওয়া যেত যে তিনি তখন ঠিক কোথায় আছেন!
হাসির এ উপস্থাপনায় নজরুল নিজেই নিজেকে তুলে ধরেছেন একটি হাসির গানে-
‘আমি দেখব হাসি
আমায় দেখলে পরে হাসতে হাসতে পেয়ে যাবে কাশি।
আমি হাসির হাঁসলী ফেরি করি এলে আমার হাসির দেশে
বুড়োরা সব ছোঁড়া হয়, আর ছোঁড়ারা যায় টেঁসে
আমার হাস-খালিতে বাড়ি, আমি হাসু-হানার মাসি।’
দিলখোলা হাসির সাথে প্রাণ মাতানো উচ্ছ্বাস নিয়ে নজরুল চলতেন। হয়তো আড়াল করতেন তাঁর বয়ে বেড়ানো নিত্যদিনের গরিবীআনাকে। নজরুল নিজে দরিদ্র ছিলেন এবং বুঝতেন দারিদ্রের কষ্ট বা লড়াই!
নজরুল যখন লেটো গানের দলে ছিলেন, তখনো তাঁর সুখ্যাতি ছিল ‘রসিক’ এবং ‘মজার গান রচয়িতা’ হিসেবে। সহজ কথায় মানুষকে আনন্দ দেওয়াই ছিল লেটো গানের মূল উপজীব্য। সে সময়ে নজরুলের রচনা করা ‘দেওরা-ভাবীর গীত’ , ‘ঘরজামাই’ গান খুব প্রচলিত ছিল।
তিনি অতি সহজ সরল আনন্দের মেজাজে কত কবিতা - ছড়া - গান লিখে ফেলেছেন । "লিচু চোর "কবিতাটি নাকি তিনি মুখে দু খিলি পান পুরে নিমেষে লিখে দিয়েছিলেন , আবার তেমনি " খুকু আর কাঠবেড়ালি " কবিতাটি তিনি লিখলেন কোন এক দুপুরবেলায় যখন দেখলেন তার ভাইজি অঞ্জলী
একটা পেয়ারা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে চোখ-ঠোঁট উল্টিয়ে, হাত-পা নেড়ে যেন কার সঙ্গে কথা বলছে আর তার কাছে কাকুতি-মিনতি করে অঞ্জলি পেয়ারা চাইছে। সেই দেখে তিনি অঞ্জলীর কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কার সাথে কথা বলছিলে?’ অঞ্জলি বললো, ‘কাকাবাবু! ওই দেখো দুষ্টু কাঠবেড়ালী। রোজ রোজ দুষ্টুটা পেয়ারা খেয়ে পালিয়ে যায়। আমাকে একটাও দেয় না।’ এ ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে তিনি লিখলেন ‘খুকী ও কাঠবেড়ালী’ নামের সেই কবিতা।
কবি নজরুল আসানসোলে রুটির দোকানে কাজ করতেন। তিনি রুটি বানাতে বানাতে ছড়া কাটতেন। আটা মাখছেন আর কিশোর নজরুলের গা বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। আর মুখে ছড়া-
‘মাখতে মাখতে গমের আটাকাজী নজরুল ইসলাম ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ধূমকেতু অফিসে সবসময় চলতো হাসি-আনন্দের বন্যা। মাটির ভাঁড়ে চা চলতো কিছুক্ষণ পর পর। কবি যখন চায়ে চুমুক দিতেন কিংবা কোনো হাসির কথা মনে পড়ত কিংবা কোনো রসিক বন্ধু অফিসে ঢুকত, অমনি কবি অট্টহাসি দিতেন। মাটির পেয়ালা ছুঁড়ে মারতেন। আর মুখে বলতেন, ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’।
ঘামে ভিজল আমার গা-টা।’
এমন রসিক মানুষ যিনি তিনি আমাদের পরিচিত বিদ্রোহী কবি এই কথা ভাবতেই অবাক হতে হয় বৈকি । কবি নজরুল অনেক প্যারডি কবিতাও লিখেছিলেন অর্থাৎ প্রচলিত আছে সেগুলি তার ব্যাঙ্গাত্মক ও রসবোধের প্রমাণ হিসেবে।
প্যারডি বলতে সাধারণত কোনো জনপ্রিয় রচনার অনুকৃতি বোঝায়; আর এই রচনা হয় সাধারণত ব্যাঙ্গাত্মক। কবি ঈশ্বর গুপ্ত থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কালের কবিদের কবিতারও প্যারডি হয়েছে। তবে রবীন্দ্র-নজরুল যুগে প্যারডি রচনা হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
যেমন তিনি পদাবলীর কবি জ্ঞানদাসের
‘সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু অনলে পুড়িয়া গেল’
এইজনপ্রিয় এ কবিতাটির প্যারডি করেছিলেন -
"আমি তুরগ ভাবিয়া মোরগে চড়িনু
(সে) লইল মিয়ার ঘরে।
আমার কালিমা ছাড়ায়ে কলেমা পড়ায়ে
বুঝি মুসলিম করে।।"
এ ছাড়া তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
‘তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে , তুমিই ধন্য ধন্য হে’
গানের ‘‘সুপার (জেলের) বন্দনা’’ শিরোনামে প্যারডি করেছিলেন -
"তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে
ধন্য তুমি ধন্য হে।
আমার এ গান তোমারি ধ্যান
তুমিই ধন্য ধন্য হে।।"
নজরুলের প্যারডি রচনার মধ্যে অনাবিল হাস্যরস ছিল; তিনি কখনো ঈর্ষান্বিত হয়ে প্যারডি রচনা করেন নি। কিন্তু নজরুলের অনেক জনপ্রিয় কবিতা ও গানের যারা প্যারডি করেছিলেন তারমধ্যে অনেকেই ছিলেন নজরুলের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিলেন এবং
তাদের রচনায় এই মনোভাবই ধরা পড়েছে ।
যে সব প্যারডিতে ব্যক্তিগত ঈর্ষা কিংবা আক্রমন নেই সেগুরোই নির্দোষ প্যারডি বলে বিবেচিত হতে পারে। আবার হাসি ব্যঙ্গরসের বাইরেও প্যারডি হতে পারে। এর সুন্দর একটি দৃষ্টান্ত হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘‘১৪০০ সাল ’’ কবিতার জবাবে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন ‘‘১৪০০ সাল’’ (একই শিরোনামে) কবিতাটি। দু’টি কবিতার প্রথম স্তবক যথাক্রমে -
রবীন্দ্রনাথের ‘‘১৪০০ সাল’’
" আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়েছ বসি আমার কবিতাখানি
কৌতুহল ভরে
আজি হতে শতবর্ষ পরে।"
নজরুলের ‘‘১৪০০ সাল’’
"আজি হতে শতবর্ষ আগে
কে কবি স্মারণ তুমি করেছিলে
আমাদেরে শত অনুরাগে
আজি হতে শতবর্ষ আগে।"
পরিশেষে বলি যে কবি নজরুল ইসলামের সামগ্রিক ব্যাক্তি সত্তা ও কবি সত্তাকে চেনা ও জানার জন্য তার এই রসিক মনের সাথে পরিচিত হওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে রসবোধ তাঁর এক চারিত্রিক ঔদার্যের পরিচায়ক।


2 মন্তব্যসমূহ
খুব ভালো লিখেছ
উত্তরমুছুনদেবলীনা
খুব সুন্দর আলোচনা একটি দিক আমাদের কাছে উন্মোচিত হল
উত্তরমুছুন