আমার চেতনায় নজরুল সঙ্গীত - দেবলীনা




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


 আমার চেতনায় নজরুল সঙ্গীত 
    


এক মাথা ঝাঁকড়া ঘন চুল ও তার সাথে গভীর দৃপ্ত বিস্ফোরিত দুটি চোখ  - এটুকুই ছিল আমার প্রাথমিক পরিচয় একটি অপরিচিত সাদা - কালো ছবির সাথে। তারপর মায়ের মুখে তার লেখা দু একটি ছড়া শুনে ধীরে ধীরে অপরিচিত মানুষটি হয়ে উঠলো আমার কাছে এক আপার বিস্ময়! প্রায়শই মা শোনাতেন কিছু ছড়া আর আমিও তালে তালে আনন্দে আওড়াতাম সেই ছড়া গুলি -
 " বাবুদের তাল-পুকুরে হাবুদের ডাল-কুকুরে
  সে কি বাস করলে তাড়া, বলি থাম একটু দাড়া।"
                       বা                   
"কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও? গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি নেবু? লাউ? বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও?-"
                     বা
"ঝাঁকরা চুলো তালগাছ, তুই দাঁড়িয়ে কেন ভাই
আমার মতো পড়া কি তোর মুখস্থ হয় নাই
আমার মতো এক পায়ে ভাই
দাঁড়িয়ে আছিস্ কান ধরে ঠায়
একটুখানি ঘুমোয় না তোর পন্ডিত মশাই"

বেশ কিছু বছর পর এই ছড়াগুলো অর্থ ও অন্তর্নিহিত  দর্শন বুঝতে পেরেছি , কত সহজে কত অবলীলায় আমাদের চারপাশের ঘটনা ও বিষয়গুলিকে শিশুমনে অব্যর্থ নিশানায় গেঁথে দিতে পেরেছিলেন। তারপর পাঠ্য বইতে তার লেখার সাথে পরিচয় হয়েছে - "  থাকবো না আর বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগতটাকে ", " বলো বীর , বলো উন্নত মম শির " বা " চল চল চল " সেই সময় কিশোরী মনে এই সমস্ত কবিতা পাঠ করে অর্থ অনুধাবন করে তাজা রক্ত শিরা উপশিরায় নাচন জাগাত।

নজরুল ইসলাম শুধু আমার কাছে কবি নন আমি তাকে পেয়েছি আরো গভীরভাবে , আমার অন্তরের বোধে , প্রতিদিনের চর্চায় ও যাপনে । নজরুল গীতি শিক্ষা আমাকে তার প্রতি আরো আকৃষ্ট করে , তার গানের সম্ভার এর সাথে যত পরিচিত হতে শুরু করি ততই আমি তার সুর সমুদ্রের মধ্যে ডুবে গেছি । কতরকম সুরের বৈচিত্র , তালের ভিন্ন ব্যাবহার , রাগ - রাগিণীর গুরু গম্ভীর প্রয়োগ আমাকে ক্রমশ নজরুল গীতি মোহে আবিষ্ট করেছে আর নজরুল প্রেমে মথিত করেছে।

ছোট থেকেই শুনে আসছি যে নজরুল নাকি বিদ্রোহী কবি ! কিন্তু তিনি কি সত্যিই শুধু বিদ্রোহের বা বিপ্লবের জন্যই নিজেকে ও তার সৃষ্টিকে উৎসর্গ করেছেন ! ঠিক এইখানেই আমি নজরুল সত্তা ও সৃষ্টিকে দুটি ধারায় বর্ণনা করতে চাই --

এক ধারার নজরুল অন্য ধারার নজরুল থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। প্রথম ধারায় কাব্যের নজরুল ছিলেন মানবতাবাদী নজরুল, বিদ্রোহী নজরুল, সমাজ সংস্কারক নজরুল, রাজনৈতিক নজরুল, ব্রিটিশবিরোধী নজরুল।অবিভক্ত ভারতবর্ষের সব জাতিসত্তার ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তথা সামগ্রিক মুক্তির লক্ষ্যে শুধু কাব্য নয়, তার সমগ্র জীবনকেই উৎসর্গ করেন তিনি। ‘এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি আর হাতে রণতূর্য’ নিয়ে আবির্ভূত হন তিনি।মন-প্রাণ উজাড় করে তিনি গেয়েছেন তরুণের জয়গান। শত বাধাকে অতিক্রম করার সাহস ও সামর্থ্য তিনি দেখিয়েছেন তার প্রতিবাদী চেতনায়।

এর পরবর্তী ধারায় আমরা ভিন্ন রূপে দেখতে পাই সুরের নজরুলকে। সংগীতের নজরুল-যা নজরুল জীবনের দ্বিতীয় ভাগ অথবা দ্বিতীয় সত্তার নজরুল বলা যায়। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে নির্বিঘ্নে রচনা করে গেছেন হাজার হাজার গান। ভিন্ন পর্যায় ভুক্ত গান রচনা করেছেন।পর্যায়গুলো যথাক্রমে -
ভক্তিমূলক গান ( শ্যামা সংগীত , কীর্তন) - আমার দেখা একটি অপূর্ব শ্যামা সংগীত "কালো  মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন " আর অসাধারণ একটি কীর্তন অঙ্গের গান উল্লেখ করলাম
 " হৃদি পদ্মে চরণ রাখো বাঁকা ঘন শ্যাম "।

 তার রচিত অসংখ্য কাব্য গীতি  বা প্রেম সংগীত যা প্রেমিক নজরুলকে আমাদের কাছে উন্মোচিত করে , এখানে একটি দুটি গানের উল্লেখ করলাম - " আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন খুঁজি তারে আমি আপনায় " বা " তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সেকি মোর অপরাধ " বা "তোমারেই আমি চাহিয়াছি প্রিয় শত রূপে শত বার " , " তোমারই আঁখির মত আকাশের দুটি তারা " - আরো যে কত কাব্য গীতি রচনা করেছেন তার সম্ভার অগণিত।

 রাগপ্রধান গান - " পিউ পিউ বিরহী পাপিয়া বনে " বা  "শ্যামা তন্বী আমি মেঘ বরণা " বা " আজও কাঁদে কাননে "

রণ সঙ্গীত- "চল চল চল উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল "।

 বিদেশীসুরাশ্রিত গান - ছোটবেলায় প্রায় সকলের শেখা গানগুলো যেমন - "রুমঝুম ঝুমঝুম", " মোমের পুতুল মোমের দেশের মেয়ে নেচে যায় " ," দূর দীপ বাসিনী " এক্ষণ এই সুরগুলো অমোঘ ভালোবাসায় জড়িয়ে আছে ।

  গজল , ইসলামী সংগীত - "সই ভালো করে বিনোদ বেণী বাঁধিয়া দে " , " পথ চলিতে যদি চকিতে ",
  "এ কোন মধুর শরাব দিলে " , " কাবারজিয়ার রাতে তুমি যাও মদিনায় " অসাধারণ সব আসর জমানো গজল গান ও ইসলামী গানের সম্ভার তার সৃষ্ট সঙ্গীতের ঝুলিতে ।

 দেশাত্মবোধক গান, হাসির গান , ভাটিয়ালি , লোকসঙ্গীত
(ঝুমুর , কাজরী , লাউনি , ভাওয়াইয়া ) আরো কত ভিন্ন স্বাদের গান তাকে আরো আরো জানতে ও চিনতে শিখিয়েছে। তিনি প্রায় ৪,০০০-এরও বেশি গান রচনা করেছেন। পৃথিবীর কোনো ভাষায় এত বেশি সংখ্যক গান রচনার উদাহরণ নেই। আর  দুঃখের বিষয় তার অসংখ্য গান সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে।

এক্ষেত্রে মনে করি সঠিকভাবে শাস্ত্রীয় সংগীত শিক্ষা ও চর্চা না করলে নজরুল গীতি শেখা ও পরিবেশন করা অসম্ভব। অত সুক্ষ্ম তান বিস্তার গমক ও মীরের প্রয়োগ তার প্রতিটি গানে যা প্রকৃত শিক্ষার মাধ্যমেই সম্পূর্ণ হয়।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ছয়টি রাগ ও প্রতিটি রাগের ছয়টি করে অর্থাৎ ছত্রিশ টি রাগিণী আছে যেগুলো দশটি ঠাট থেকে উৎপন্ন । ঠাট হলো রাগ - রাগিণীর জনক ( চলতি ভাষায় বলতে পারি ঠাট হলো একটি কাঠামো), এই ঠাট ছাড়া কোন রাগ - রাগিণী অস্তিত্ব সম্ভব নয়। নজরুল তার সংগীতকে আরো সমৃদ্ধ ও উৎকৃষ্ট করার জন্য আরো উনিশ টি রাগ সৃষ্টি করেছিলেন এবং এই সমস্ত রাগের অবলম্বনে অসামান্য কিছু গান রচনা করেছিলেন। আমি ১৯ টি রাগ ও তাদের পরিচয়  সেই সঙ্গে সেই রাগাশ্রিত একটি করে গানের উল্লেখ করছি এবং আর একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করছি তা হলো - রাগের নামকরণ তার সেই আশ্রিত গানটির মধ্যে  তিনি অপূর্ব ভাবে ব্যাবহার করেছেন । যেমন -

১) রাগ অরুণ ভৈরব। ১লা নভেম্বর, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'উদাসী ভৈরব' নাটিকা'র প্রথম গান:
     গান- জাগো অরুণ-ভৈরব জাগো হে।
২) রাগ আশা ভৈরবী। ১লা নভেম্বর, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'উদাসী ভৈরব' নাটিকা'র দ্বিতীয় গান:
    গান - মৃত্যু নাই, নাই দুঃখ আছে শুধু প্রাণ
৩) রাগ শিবানী ভৈরবী। ১লা নভেম্বর, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'উদাসী ভৈরব' নাটিকা'র তৃতীয় গান :
    গান - ভগবান শিব জাগো জাগো
৪) রাগ রুদ্র ভৈরব। ১লা নভেম্বর, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'উদাসী ভৈরব' নাটিকা'র চতুর্থ গান:
    গান - এস শংকর ক্রোধাগ্নি
৫) রাগ যোগিনী। ১লা নভেম্বর, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'উদাসী ভৈরব' নাটিকা'র পঞ্চম গান:
    গান - শান্ত হও শিব বিরহ বিহ্বল
৬) রাগ উদাসী ভৈরব। ১লা নভেম্বর, ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র।
'উদাসী ভৈরব' নাটিকা'র ষষ্ঠ গান:
    গান - 'সতী হারা উদাসী ভৈরব কাঁদে।
৭) রাগ নির্ঝরিণী। ১৩ জানুয়ারি, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' প্রথম অনুষ্ঠানের প্রথম গান।
    গান- রুম্ ঝুম্ ঝুম্ ঝুম্ রুম্ ঝুম্ কে বাজায়
৮) রাগ বেণুকা। ১৩ জানুয়ারি, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' প্রথম অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় গান।
    গান - বেণুকা ও-কে বাজায় মহুয়া বনে
৯) রাগ মীনাক্ষী। ১৩ জানুয়ারি, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' প্রথম অনুষ্ঠানের তৃতীয় গান।
     গান - চপল আঁখির ভাষায়, হে মীনাক্ষী
১০) রাগ সন্ধ্যামালতী। ১৩ জানুয়ারি, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' প্রথম অনুষ্ঠানের চতুর্থ গান।
 গান -শোনো, ও সন্ধ্যামালতী বালিকা তপতী
১১) রাগ বনকুন্তলা। ১৩ জানুয়ারি, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' প্রথম অনুষ্ঠানের পঞ্চম গান।
      গান- বনকুন্তলা এলায়ে বন-শবরী ঝুরে
১২) রাগ দোলন-চাঁপা। ১৩ জানুয়ারি, ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' প্রথম অনুষ্ঠানের ষষ্ঠ গান।
    গান-  দোলন-চাঁপা বনে দোলে
১৩) রাগ দেবযানী: ১১ মে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' দ্বিতীয় অনুষ্ঠানের প্রথম গান।
 গান -দেবযানীর মনে প্রথম প্রীতির কলি জাগে
১৪) রাগ অরুণরঞ্জনী: ১১ মে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' দ্বিতীয় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় গান।
     গান- হাসে আকাশে শুকতারা হাসে।
১৫) রাগ রূপমঞ্জরী:  ১১ মে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' দ্বিতীয় অনুষ্ঠানের তৃতীয় গান।
     গান- পায়েলা বোলে রিনিঝিনি
১৬) রাগ রমলা:  ১১ মে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' দ্বিতীয় অনুষ্ঠানের  চতুর্থ গান।
    গান-  ফিরিয়া যদি সে আসে
১৭) রাগ শঙ্কর:  ১১ মে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা বেতারকেন্দ্র। 'নব রাগ-মালিকা' দ্বিতীয় অনুষ্ঠানের পঞ্চম গান।
    গান- শঙ্কর অঙ্গলীনা যোগমায়া
১৮) রাগ শিব-সরস্বতী: এই রাগের পরিচিতি পাওয়া যায়, জগৎ ঘটক প্রণীত 'বেণুকা' নামক গ্রন্থে। এই রাগে নিবদ্ধ গানটি হলো 'জয় ব্রহ্ম বিদ্যা শিব-সরস্বতী'। গানটি পাঠশালা পত্রিকার মাঘ ১৩৪৬ (জানুয়ারি ১৯৪০) সংখ্যায় স্বরলিপিসহ প্রকাশিত হয়।
১৯) রাগ তিলংড়া



এই একইরকমভাবে তিনি তার গানের বৈচিত্রের জন্য ছয়টি তাল সৃষ্ট করেন । যেমন -

১/ প্রিয়াছন্দ : এটি ৭মাত্রা বিশিষ্ট বিসমপদী তাল। (২।৩।২) ছন্দে বিভক্ত।
২/মণিমালাছন্দ : এটি ২০মাত্রা বিশিষ্ট বিসমপদী তাল। (২।৪।২।২।২।৪।২।২) ছন্দে বিভক্ত।
৩/মঞ্জুভাষিণীছন্দ : এটি ১৮মাত্রা বিশিষ্ট বিসমপদী তাল। (২।৩।৫।৩।৩।২) ছন্দে বিভক্ত।
৪/ স্বগতাছন্দ : এটি ১৬মাত্রা বিশিষ্ট বিসমপদী তাল। (৩।৫।৪।২।২) ছন্দে বিভক্ত।
৫/মন্দাকিনীছন্দ : এটি ১৬মাত্রা বিশিষ্ট একটি বিসমপদী তাল। (৬।৩।২।৩।২) ছন্দে বিভক্ত।
৬/নবনন্দন : এটি ২০ মাত্রা বিশিষ্ট সমপদী তাল।
(৪।৪।৪।৪।৪) ছন্দে বিভক্ত।

তার এই সঙ্গীতময় দ্বিতীয় ধারায় তিনি যেন নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন এক সাধন ব্রতের , নিজেকে উন্নীত করেছিলেন এক অনন্য উচ্চতায় এবং সুরের টানে চলে গেলেন প্রিয়ার হৃদয়ে, প্রকৃতির কোলে কিংবা পরমেশ্বরের শক্তির ছায়াতলে। তিনি গেয়ে উঠলেন : ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ!’ কিংবা ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী’ কিংবা ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে’।

একসময় তিনি নিজেই নিজের অবদানের স্বীকৃতি  জ্ঞাতসারেই দিয়েছিলেন কিছুটা। ১৯৩৮ সালে ‘কৃষক’ পত্রিকার অফিসে জন-সাহিত্য সংসদের উদ্বোধনে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেন : ‘কাব্যে ও সাহিত্যে আমি কি দিয়েছি, জানি না। আমার আবেগে যা এসেছিল, তাই আমি সহজভাবে বলেছি, আমি যা অনুভব করেছি, তাই আমি বলেছি। ওতে আমার কৃত্রিমতা ছিল না। কিন্তু সংগীতে যা দিয়েছি, সে সম্বন্ধে আজ কোনো আলোচনা না হলেও ভবিষ্যতে যখন আলোচনা হবে, ইতিহাস লেখা হবে, তখন আমার কথা সবাই স্মরণ করবেন, এ বিশ্বাস আমার আছে। সাহিত্যে দান আমার কতটুকু তা আমার জানা নেই। তবে এইটুকু মনে আছে সংগীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি।’

এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ-কথা বলা যায় যে, নজরুল তার সংগীত জীবনকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে কবিতার নজরুলও সংগীতের নজরুলের চেয়ে কম মহিমান্বিত নন। প্রকৃতপক্ষে নজরুল জীবনের এই দুই সত্তার সম্মিলনে আমরা পাই আমাদের কাঙ্খিত সমগ্র নজরুলকে।
 আর আমি পাই আমার একান্ত অনুভবের, চেতনার ও অগাধ বিস্ময়ের নায়ক নজরুলকে ।

তবে শেষে বলি , সকলে প্রায়শই বলেন যে নজরুল নাকি উপেক্ষিত ! আমি মনে করি সমগ্র নজরুল সত্তা ও সৃষ্টিকে অনুধাবনের জন্য তাকে নিয়মিত চর্চা ও পর্যাপ্ত জ্ঞানের প্রয়োজন আর প্রয়োজন তার সৃষ্টিকে আরো বেশি প্রচার ও সংরক্ষণ করা। তার সমৃদ্ধ ভান্ডারকে চেতনার রঙে রাঙিয়ে তুলতে আগামী প্রজন্মকে উৎসাহিত করার প্রয়োজন আছে আরো অনেক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ