সাপ্তাহিক সেরা কলম তৃতীয় সপ্তাহ




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


হাজার বছর পর
 সুশান্ত

হাজার বছর পর
 যদি মানুষের মতো কোনো প্রাণী জন্মায় এ পৃথিবীতে-
 আবিষ্কার করে ফেলে আমাদের সভ্যতা!
 ওরা কি সেদিন অবাক হবে?
যদি দেখে ফেলে আমাদের জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি-
 চোরাবালি চোরাস্রোত...
 আমাদের লোভ, আমাদের স্বাধীনতা- শাসন,
 ব্যভিচার, কাম, ক্রোধের আগ্রাসী আগুন
 অপহরণ- ধর্ষণ-খুন....
 ওরা কি লজ্জা পাবে?
হাজার বছর পর
 কেউ যদি চলতে চলতে খুঁজে পায় একটা লাল ডায়রি
 যার পাঁজরে পাঁজরে অভিশাপ অবহেলা আর বিদ্রুপ পরিহাস !
 পদলেহনে তুষ্ট পদের অস্থানিক অবস্থানের ছবিটা যদি কোনও ভাবে দেখে ফ্যালে-
 ওরা কি হাসবে?
যদি শুনে ফ্যালে
 প্রতিবাদী কণ্ঠ রোধ করা বিষাক্ত সাপের হিস্ হিস্ শব্দ
 যদি খুঁজে পায় সেই লোহার রড
 যার গায়ে শুকিয়ে আছে তাজা ফুলের রক্ত
 চোখের জল, চিৎকার অসহায় যন্ত্রণা...
 ওরা কি আতঙ্কিত হবে?
হাজার বছর পর
 কেউ যদি বুঝে ফ্যালে আমাদের ধ্বংসের কারণ!
 যদি জেনে যায় "মানুষ" বলে কোনো এক উন্নত মস্তিষ্কের প্রাণী
 বার বার প্রকৃতির নিজস্ব খেয়ালে বাধার সৃষ্টি করেছে...
 কুটিল আগ্রাসনের ফাঁদে নিজেরাই নিজেদের মৃত্যুকে করেছে বরণ
 মানুষেরই তৈরী ছোট্ট অতি নিরীহ জীবাণু এক নিমেষে দেশ হতে দেশ উজাড় করেছে
 একের পর এক লাশের পাহাড় বানিয়েছে... !
 ওরা কি চলচ্চিত্র বানাবে  ?
.......
হাজার বছর পর
 হয়তো কেউ খুঁজে পাবে সেই মাউথ-অর্গান
 যার সুরের মূর্ছনায় ঝরে ঝরে পড়েছিল জোছনা অথবা, ঈদের আজানে ভেসে আসা সম্প্রীতির সুর
 ঘুম পাহাড়ের কোলে রিমঝিম বৃষ্টি...
 আর ছিল বৃষ্টি ভেজা দুটি চোখের পাতা
 শক্ত মুঠোয় ধরে থাকা পরম বিশ্বাস
 যেন, তাজমহলের গায়ে লেগে থাকা দুটি হাতের ছাপ...
যদি দেখতে পায় অতি যত্নে রাখা দুটি চোখ
 যার ভিতর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে মহব্বতী আশরাফ
 যার কোণে লেগে আছে এখনও কুচি হীরে
 সে ফাগুনের... অথবা কোনো উজান রাতের শেষ স্পর্শ...

---------------------------------------------------------------

একটা ভোর চাই
চৈতি চক্রবর্তী 


আবার একটা ভোর কিনতে যাব
ঠিক যে মুহূর্তে বিচ্ছেদ এসে নিমন্ত্রণ দেবে
ঠিক যে মুহূর্তে সবকিছু টুকরো হতে চাইবে
দুহাত গুছিয়ে এক জায়গায় এনে
বলবো দাও একটু ভোর!

পৃথিবীর খাতা তখন অন্ধকারের গর্তে
মুখ লুকিয়ে ছুটি চাইবে হয়তো কোনো দানে
তবু একটা ভোর চাই আমার যে কোনো শর্তে,
স্বপ্নটা বাঁচানোর কারণে।

একটা দিন হিসেবের খাতা খুলে বসবো
মেঘের জল পাটিতে,
তোমার সৃষ্টি ছোঁয়া বাতাসেরা ফিস ফিস করে
গল্প বলবে অনেকটা সখে
তারপর কতগুলো যন্ত্রণার চাবুক
ভুল এঁকে দিয়ে চলে যাবে নিজের কক্ষে,
আমি ভোর চাইবো তখনও বিনা শর্তে
নিজেকে বাঁচানোর আবেগে,
স্বপ্ন দেখার কারণে।

পৃথিবী জুড়ে অহংকারী ভালোবাসার চাষ
আমিত্বের জ্বরে আক্রান্ত চাদর
কালশিটে দাগ হৃদয়ের কুঠুরিতে
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত বিবেক
হারিয়েছে বিবেচনার সংগ্রাম
তবু একটা ভোর চাই বাঁচার কারণে।

---------------------------------------------------------------

তুমি বরং বিড়াল হও
উৎসর্গ ঃ তসলিমা নাসরিন
মুহাম্মদ আমির হোসেন



তুমি বরং বিড়াল পোষ
বিড়ালের মতো করে , করো মেও মেও
হৃদয়টাকে বাড়িয়ে দিয়ে বুকেতে জড়াও।

আভিধানিক পরিভাষায়
বিড়াল গৃহপালিত প্রাণী
ওম দেয় লেপের ভেতর, বুকে দেয় তা,
মখমলে সুখ দেয়,
অভাবীত সুখের রাখেনা শূন্যতা!

বনবিড়াল আর চিতা দ্যাখো
শা শা করে যাচ্ছে দূরে,
আর তুমি তাকে রাখছো
মায়াজালে বন্দী করে, আবদ্ধ করে,
ছুটা'র বেগ পায়নি সে, গৃহ তাকে দিয়েছে শিকল,
তুমি যেমন দৃঢ়চেতা, স্বাধীনতা ভালোবাসো
বিড়ালের চিতা'র বেগ নেই, রয়েছে আদল।

দ্বেষ বিদ্বেষ কেনো, একপেশে বন্দী
প্রকৃতিকে ধারণ করো, ভালোবাসায় সন্ধি,
সৃষ্টিতে বসবাস, আদম বাড়ায় চাষ
জনন রহিত হবে! প্রাকৃতিক বৈচিত্রে দীর্ঘশ্বাস!
সৃষ্টি'র কৌশল তুমি কী জানো!
পরিযায়ী মন নিয়ে কোথা হতে এলে তুমি?

পুরুষ পোষতে এসো না
পুরুষ তো পোষা প্রাণী নয়,
অহেতুক মননের কীট করছে তোমায় ক্ষয়।

বিদ্বেষ ছড়িয়ো না, ওহে বিদ্বেষী
সমুন্নত প্রাকৃতিক ধারা নয় ভিনদেশী,
পৃথিবী কী থেমে যাবে!
মানুষের থাকবে না ধারা?
জীববৈচিত্র্যের রূপকল্পে এতোটা দিশেহারা!

সব পাখি উড়ে, উটপাখি ধায়
কেহ বুক চাপড়ে বলেনা হায় হায়,
সব মাছ জলে থাকে, জলজ তেমন
হাক ডাক সৌষ্ঠবে তিমি'র মতন?
সব প্রাণী কি বনে থাকে, বনের রাজা?
বিড়াল করে মেও মেও, হয়ে তোমার প্রজা।

তুমি বরং বিড়াল পোষ, বিড়াল হও
মাছের কাঁটার দিকে তাকিয়ো না লোভাতুর
দুধ পেলে খাও চুরি করে, এমন বাহাদুর!

তুমি বরং বিড়াল হও
বিড়ালের মত, করো মেও মেও,
অন্যের ধনে কেন অবিরত মুখটা বাড়াও!

---------------------------------------------------

অপর নাম ভারতবর্ষ 
     দলছুট পাখি

আর একটু পথ মা, আর একটু...
তারপরেই আমাদের সেই চেনা উঠোন, তুলসীতলা-
বাড়ি ফিরেই একটা তুলসী চারা লাগিয়ে দেবো,
তুমি সেখানে সন্ধ্যে প্রদীপ জ্বেলে শাঁখে ফুঁ দেবে।

সেবার লালীর বাচ্চা হতে গিয়ে খুব কষ্ট পাচ্ছিলো,
ধলি উঠে দাঁড়িয়েই সেকি লাফালাফি,
তিন দিন পরে লালী আর চোখ খোলেনি।

দিন চারেক পরেই যখন মাতলার জল ফুলে উঠেছিল,
ধলি ভিটে মাটি জমি ধুয়ে দিয়েছিল নোনা সাদা ফ্যানা,
তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলে-
' আমি বাঁচতে চাই খোকা, আমি বাঁচতে চাই...'

এত সহজে কি আমাদের মৃত্যু হয় মা!
ত্রাণ সেদিনও আসেনি! কিন্তু ট্রেন চলছিল-
তোমাকে নিয়ে চলে এলাম বহুদূরের এক অজানা অচেনা শহরে,
শুধু দুমুঠো ভাত খেয়ে বাঁচবো বলে।
অবশ্য সেদিন যতিন ঘোষ ধোয়া মোছা জমিটার বদলে কিছু টাকা দিয়েছিল।
বেঁচে থাকুন ওনার মতো মহাজনেরা।

এবার কিসের ঢেউ উঠলো রে খোকা?
কোনো ঝড়ও তো এলো না!
ভুমিকম্পও তো নয়!
তবে ঝুপঝাপ দোকানপাট  বন্ধ করে, কল মালিক সব গেটে তালা ঝুলিয়ে দিল কেন?

বেঁচে থাকতে হবে মা, বেঁচে থাকতে হবে।
নিঃশব্দে স্বয়ং যমরাজ সবার দরজায় কড়া নাড়ছে।
তাই ট্রেন বাস, কল কারখানা, রুটি রোজগার সব বন্ধ!

বড় বিশ্বাসঘাতক এই পেট রে খোকা!
এ তো কোনো বারণই শোনে না-
আর একমুঠো চালও নেই কৌটোতে!
আমার একটা শেষ ইচ্ছে রাখবি?
মরতে যদি হয় চল ফিরে যাই নিজের মাটিতে।
যতিন ঘোষের গোয়ালে আমি কাজ করবো, আর তুই ওনার জমিতে চাষ দিবি।
তবুও তো নিজের মাটির গন্ধটুকু পাবো!

একসময় মাটির টানে শহর ছাড়ে খোকা আর খোকার মা...
পথ আরও পথ...
কোথায় শেষ এই পথের!
ক্লান্ত বুড়ি মাকে কোলে তুলে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলে খোকা।
একটা আস্ত ভারতবর্ষকে কোলে তুলে নিয়ে চলে খোকা  অক্লান্ত পায়ে।

এ জন্মে ভিটে মাটির স্বাদ যেন সাত জন্মের আকাঙ্ক্ষা...

কেউ দেখেও দেখে না এই দৃশ্য!

সব মন্দিরের দরজা বন্ধ-
নইলে হয়তো ভগবান নিজেই পুষ্পবৃষ্টি করতেন এই একটুকরো ভারতবর্ষের উপর...

---------------------------------------------------------------

ভোর হবে
   উদয় ভানু চক্রবর্তী

শেষ হয়ে যায়নি বুকের ভেতরের ছায়াযুদ্ধ,
নিরঞ্জন হয়নি সে ছাইটুকু কোনো বাঁধানো ঘাটের জলে।
অথচ চাঁদ ছিল, চকোরী জোছনা ছিল-
অনন্ত মায়াপথ ছিল
আগের মতোই শাল পিয়ালের বনতলে!

জানতাম আমি- এ পথেই
নিঃশব্দে চলে গিয়েছিলেন তিনি, আলোর রেনু মেখে রাতের বুকে- সমাহিত।
শান্ত দৃষ্টিতে এঁকেছিলেন সবুজের ছবি, প্রেমের প্রতিলিপি,চিরশাশ্বত অমৃতের গান গেয়ে-
তিনি তথাগত।

কত যুগের শেষে ছুটে চলা গ্রহ স্থির আজ মহাশূণ্যে,
সূর্যের হারানো রশ্মির আলোয়,ভগ্নস্তুপে-
জেগে থাকে সেই আঁধার অনিশ্চিত আগামীর জন্যে-
নির্বাক, নিঃশ্চুপে!

তাকিয়ে থাকিস তুই,
কুয়াশা মাখা চোখে- আরক্ত গোধূলি আর রূপোলী সাঁঝের শেষে,
আজো জেগে আছে দূর আকাশে একা রোহিনী আর এক নির্বিকার আলো ভবিষ্যত,
জানি তোর চলার পথে ভোর হবেই সেখানে এসে !!



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ